একটা গাছ বদলে দিয়েছিল মুসলিম শিক্ষার ইতিহাস-জানুন সেই বিস্ময়!

একটা গাছ বদলে দিয়েছিল মুসলিম শিক্ষার ইতিহাস-জানুন সেই বিস্ময়!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

একটি কলম, একটুকরো কাগজ, আর একটি কলমদানি-ইতিহাসের বহু বিপ্লব, দর্শন, বিজ্ঞানের ভিত্তি দাঁড়িয়েছে এই সরল উপকরণের ওপর। বিশেষ করে ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে (৮ম-১৩শ শতাব্দী), যেখানে জ্ঞান ছিল ইবাদতের অংশ, সেখানকার প্রতিটি ছাত্র, শিক্ষক ও আলেমের এক অপরিহার্য সহচর ছিল কলমদানি। তবে প্রশ্ন হলো-সে যুগে কলমদানি তৈরি হতো কোন উপকরণে? উত্তর-বাঁশ। বাঁশ গাছ ছিল সেই সময়কার অন্যতম বহুমুখী ও প্রাকৃতিক সম্পদ, যা শুধুমাত্র নির্মাণ বা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নয়, বরং জ্ঞান চর্চার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

কেন বাঁশ গাছ?

১. পরিবেশগত প্রাচুর্য ও সহজলভ্যতা:
ইসলামি সভ্যতার বিস্তার ছিল মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে। এই অঞ্চলের বহু অংশেই বাঁশ গাছ ছিল প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর। তা সহজে কাটা যেত, রূপ দেওয়া যেত, আবার দীর্ঘস্থায়ীও ছিল।
 

২. কাঠামোগত উপযোগিতা:
বাঁশের গঠন ফাঁপা ও নলাকৃতি হওয়ায় এটি ছিল কলম রাখার জন্য প্রকৃতির তৈরি 'পেন স্ট্যান্ড'। কোন কাঠ কেটে ফাঁপা করার দরকার ছিল না-শুধু একটি অংশ কেটে তার মুখ বন্ধ করে দিলেই হয়ে যেত প্রস্তুত একটি টেকসই ও প্রাকৃতিক কলমদানি।
 

৩. শিল্প ও অলংকরণের সম্ভাবনা:
বাঁশের গায়ে খোদাই করা যেত সহজে, তাই শিক্ষার্থীরা বা কারিগররা এতে খোদাই করতেন কোরআনের আয়াত, দোয়া, নকশা কিংবা নাম। অনেক সময় এসব কলমদানি একটি ব্যক্তিগত সত্ত্বার অংশ হয়ে উঠত।

 

কলমদানি শুধু ব্যবহারের বস্তু নয়, ছিল ব্যক্তিত্বেরও প্রকাশ!!

ইসলামি ঐতিহ্যে, বিশেষত মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে লেখার উপকরণকে শুধু পেশাগত নয়, বরং ধর্মীয় ও জ্ঞানচর্চার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। 

কলমদানি ছিল শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ-যেমন আজ মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ। ধনী পরিবারের ছাত্ররা ধাতব, খোদাই করা দামী কলমদানি ব্যবহার করলেও সাধারণ ছাত্রদের হাতে থাকত বাঁশের তৈরি সহজ ও ব্যবহারযোগ্য কলমদানি।

 

মাদ্রাসা ও জ্ঞান কেন্দ্রগুলোতে বাঁশের ব্যবহার :

বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে বাঁশের কলমদানি ছিল সর্বজনীন। ছাত্ররা নিজেদের বানানো বা স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিদের কাছ থেকে তৈরি করে নেওয়া কলমদানি ব্যবহার করত। 
 

এই কলমদানিগুলোতে সাধারণত থাকত-

১। কলম (যা বাঁশ দিয়েই তৈরি হতো)

২। কালির পাত্র

৩। সূঁচ বা ছুরি (কলম কাটার জন্য)

৪। কাপড় (কলম মুছার জন্য)
 

এই পুরো সেট-আপ একটি ছোট বাঁশের টিউব বা খাপে ঢুকিয়ে রাখা হতো। শিক্ষার্থী বা আলেমরা এটি কোমরে বেঁধে বা বগলে করে মসজিদে বা পাঠশালায় নিয়ে যেত।

কলমদানি ছিল না শুধুই লিখন উপকরণ রাখার বাক্স, বরং এটি প্রতিফলন করত এক সভ্যতার অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি-'জ্ঞান অর্জন ফরজ' (আবশ্যিক)।

বাঁশের কলমদানি সেই সময়কার দরিদ্র কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্রদের জন্য একমাত্র ভরসা হলেও, এটি হয়ে উঠেছিল ঐ সময়ের "ডিজিটাল ব্যাগ", যার ভিতরেই লুকানো থাকত ভাবনার খোরাক।

তুর্কি, ফারসি ও আরবি সাহিত্যে বহু কবি ও লেখক কলমদানিকে তাদের সঙ্গী ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

অন্যান্য উপাদানে তৈরি কলমদানি-

যদিও বাঁশ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজলভ্য উপকরণ, তবে সময়ের প্রয়োজনে ও শ্রেণিভেদে অন্যান্য উপকরণও ব্যবহৃত হতো, 

যেমন:

১। কাঠ (শাল, নিম)

২। তামা বা পিতল

৩। চামড়া বা কাপড় দিয়ে মোড়া কাঠামো

৪। হাড় বা হাতির দাঁত (শিল্পকর্ম হিসেবে)
 

তবে প্রতিদিনের ব্যবহারিকতার ক্ষেত্রে বাঁশ ছিল তুলনাহীন।

আজকের দিনে কলমদানি হয়তো আর তেমন প্রয়োজন নেই-সব ডিজিটাল। কিন্তু মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে বাঁশের তৈরি কলমদানি ছিল জ্ঞানের ধারক ও বাহক। এটি ছিল ছাত্রের পরিচয়, লেখকের গর্ব, আর এক সভ্যতার শিক্ষা-মনস্ক চেতনাকে দৃশ্যমান করে তোলা এক মৌন প্রতীক।একটি বাঁশের টুকরো যে কেবল গাছের অংশ নয়, তা ছিল একটি জাতির মানসিক বিবর্তনের সঙ্গী-জ্ঞানচর্চার নিঃশব্দ সাক্ষী।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ