পাকিস্তানি নেহারির অরিজিনাল রেসিপি এবার হাতের নাগালে-জেনে নিন ধীর আঁচের আসল রহস্য

- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
দক্ষিণ এশিয়ার খাবারের ইতিহাস বললেই নেহারির নাম না আসা প্রায় অসম্ভব। পাকিস্তানে এটি শুধু একটি পদ নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। বিশেষ করে শীতের সকালে করাচি, লাহোর কিংবা ইসলামাবাদের অলিগলিতে ভোরের আলো ফোটার আগেই দোকান খুলে বসে যায় নেহারির হাঁড়ি। ধীরে ধীরে আঁচে সেদ্ধ হওয়া মাংসের ঘ্রাণ ভেসে বেড়ায়, আর সেই সুবাসই মানুষকে টেনে নিয়ে যায় দোকানের সামনে।
"নেহারি" শব্দের মূল আরবি, যার অর্থ সকাল। তাই মুঘল আমল থেকেই নেহারি ছিল একেবারেই সকালের খাবার। সম্রাটদের দরবারে ভোরে শিকারের মাংস, নানা মশলা আর ঘি দিয়ে সারা রাত ধরে রান্না হতো। পরদিন সকালের নাশতায় সেটিই পরিবেশন করা হতো। ধীরে ধীরে এটি সাধারণ মানুষের মাঝেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, আর পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে নেহারি দোকানের আলাদা কদর গড়ে ওঠে।
নেহারির বিশেষত্ব হচ্ছে ধৈর্য। এটি এমন কোনো পদ নয় যা তাড়াহুড়ো করে রান্না করা যায়। একে বলে "স্লো কুকড ডিলাইট"—যেখানে মাংস আর মসলা একসঙ্গে মিশে তৈরি করে অপূর্ব ঝোল।
প্রথাগতভাবে নেহারি রান্না করা হয় রাতে, ছোট ছোট আঁচে হাঁড়ি বসিয়ে রাখা হয় ৬–৮ ঘণ্টা। এত দীর্ঘ সময় ধরে রান্না হওয়ার কারণেই মাংস একেবারে নরম হয়ে হাড় থেকে খুলে আসে, আর ঝোলে জমে ওঠে মসলার ঘন স্বাদ।
বিস্তারিত রেসিপি
যা লাগবে:
১। গরু বা খাসির মাংস (হাড়সহ, বড় টুকরা) – ১ কেজি
২। পেঁয়াজ – ২টি (পাতলা কুঁচি)
৩। আদা-রসুন বাটা – ২ টেবিল চামচ
৪। লাল মরিচ গুঁড়া – ২ চা চামচ
৫। ধনে গুঁড়া – ১ টেবিল চামচ
৬। জিরা গুঁড়া – ১ চা চামচ
৭। হলুদ – ½ চা চামচ
৮। গোলমরিচ গুঁড়া – ½ চা চামচ
৯। দারুচিনি – ১ টুকরো
১০। এলাচ – ৩–৪টি
১১। লবঙ্গ – ৪–৫টি
১২। গমের আটা – ২ টেবিল চামচ (ঝোল ঘন করার জন্য)
১৩। ঘি – আধা কাপ (চাইলে তেল মিশিয়ে নিতে পারেন)
১৪। লবণ – স্বাদমতো
১৫। পানি – প্রয়োজনমতো
যেভাবে রান্না করবেন:
১. প্রথমে ভারী তলার হাঁড়ি গরম করে তাতে ঘি দিন। ঘি গরম হলে গোটা গরম মসলা (দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ) দিয়ে সুবাস বের করুন।
২. এরপর পেঁয়াজ কুঁচি দিয়ে আস্তে আস্তে বাদামি করে ভেজে নিন।
৩. পেঁয়াজের সঙ্গে আদা-রসুন বাটা দিয়ে ভালোভাবে কষান।
৪. এবার মাংস দিয়ে মাঝারি আঁচে নাড়তে থাকুন, যতক্ষণ না মাংস থেকে পানি ছাড়ে।
৫. এরপর লাল মরিচ, ধনে, জিরা, হলুদ ও গোলমরিচ গুঁড়া মিশিয়ে আরও কিছুক্ষণ কষান।
৬. প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে ঢেকে দিন, আঁচ একেবারে কমিয়ে দিন এবং হাঁড়ির ঢাকনা বন্ধ করে দিন। এইভাবে অন্তত ৫–৬ ঘণ্টা রান্না করুন।
৭. আলাদা করে আটা সামান্য পানিতে গুলে নিয়ে রান্নার ঝোলে ঢেলে দিন। এতে ঝোল হবে মসৃণ ও ঘন।
৮. ঝোল ঘন হয়ে এলে ওপরে সামান্য ঘি ও গরম মসলা ছিটিয়ে হাঁড়ি ঢেকে রাখুন আরও ১৫ মিনিট।
পরিবেশন টিপস:
গরম গরম নেহারি সবচেয়ে ভালো লাগে নান, কুলচা বা পরোটার সঙ্গে। ওপরে পাতলা কাটা আদা, কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলে স্বাদ হবে আরও বাড়তি। কেউ কেউ লেবুর রস দিয়েও খান, এতে ঝোলের ঝাঁঝ আরও উজ্জ্বল হয়।
আজ শুধু পাকিস্তানেই নয়, বরং ভারত, বাংলাদেশ, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী সমাজেও নেহারির আলাদা কদর আছে। ঢাকার পুরান ঢাকাতেও নেহারির দোকান পাওয়া যায়, বিশেষ করে শীতের সকালে মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়ায়। শুধু খাবার নয়, এটি হয়ে উঠেছে আড্ডারও মাধ্যম। বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবারের সঙ্গে শীতের সকালে নেহারি খাওয়ার আনন্দ একেবারেই অন্যরকম।
নেহারি তাই শুধু একটি খাবারের নাম নয়-এটি একসঙ্গে ঐতিহ্য, ধৈর্য, আর স্বাদের গল্প।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।