মানবজাতির জন্য নতুন আতঙ্ক: অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে ভয়ানকভাবে!

- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার। ফুসফুসের সংক্রমণ, টিউবারকুলোসিস, সেপসিস কিংবা সাধারণ ক্ষত যা একসময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠত, অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে সেগুলোকে জয় করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই অমূল্য ওষুধের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানবজাতির জন্য তৈরি করেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ ক্ষমতা।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী?
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যখন জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া) ধীরে ধীরে ওষুধের প্রভাব এড়িয়ে বেঁচে থাকার কৌশল শিখে নেয়। সহজভাবে বললে একসময় যে ব্যাকটেরিয়াকে অল্প অ্যান্টিবায়োটিকেই ধ্বংস করা যেত, এখন সেটি আগের ওষুধে আর মারা যাচ্ছে না।
ফলাফল দাঁড়ায় একই সংক্রমণ সারাতে লাগে শক্তিশালী ওষুধ, বেশি ডোজ, দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা, আর কখনো কখনো কোনো ওষুধই কাজ করে না।
কেন বাড়ছে প্রতিরোধ ক্ষমতা?
১. অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার – সর্দি-কাশি বা ভাইরাসজনিত অসুখেও অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, অথচ এসব ক্ষেত্রে এগুলো কোনো কাজই করে না।
২. অসম্পূর্ণ কোর্স – অনেক রোগী কয়েকদিন ওষুধ খেয়ে ভালো বোধ করলে পুরো কোর্স শেষ করেন না। এতে জীবাণু পুরোপুরি না মরে বরং প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
৩. পশুখাদ্যে ব্যবহার – মুরগি, মাছ বা গবাদি পশুর দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ ঠেকাতে পশুখাদ্যে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের শরীরেও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
৪. অপ্রশিক্ষিত ব্যবস্থাপত্র – অনেক দেশে সহজেই ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়। এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সমস্যা আরও বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত সংক্রমণে মারা যায়। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি এভাবে চলতে থাকে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে এক কোটি মৃত্যুতে, যা ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের থেকেও ভয়াবহ হবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামনে বিপদ:
⇨ সাধারণ অস্ত্রোপচার: সিজারিয়ান সেকশন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা হাঁটুর অপারেশনের মতো সাধারণ অস্ত্রোপচারও ভয়ংকর হয়ে উঠবে যদি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ কাজ না করে।
⇨ গুরুতর সংক্রমণ: নিউমোনিয়া, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা রক্তে সংক্রমণের চিকিৎসা জটিল হয়ে উঠছে।
⇨খরচ ও সময়: শক্তিশালী ওষুধ, দীর্ঘ হাসপাতালে ভর্তি আর চিকিৎসার ব্যয়—সবকিছুই বেড়ে যাচ্ছে।
সমাধানের পথ:
১. সঠিক ব্যবহার – চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা।
২. সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা – মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ না করা
৩. পশুখাদ্যে নিয়ন্ত্রণ – গবাদি পশুর খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করা।
৪. নতুন ওষুধ আবিষ্কার – গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে যাতে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা যায়।
৫. জনসচেতনতা – জনগণকে বুঝতে হবে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো "ম্যাজিক ওষুধ" নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার না করলে এটি কাজ করা বন্ধ করে দেবে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশব্দে এগিয়ে আসা এক বৈশ্বিক মহামারি। যদি এখনই সচেতনতা, নীতি ও গবেষণায় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী প্রজন্মকে এমন এক বিশ্বে বাঁচতে হবে যেখানে একটি সাধারণ ক্ষত বা নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণও জীবন কেড়ে নিতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।