সবাইকে একই বই পড়ানো কি ভুল? শিশুদের শেখার ধরনে বিস্ময়কর পার্থক্য

সবাইকে একই বই পড়ানো কি ভুল? শিশুদের শেখার ধরনে বিস্ময়কর পার্থক্য
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মানব মস্তিষ্ক শেখার প্রক্রিয়ায় একরকম নয়। কোনো শিশু বই দেখে তথ্য মুখস্থ করতে পারে, আবার অন্য শিশু একই তথ্য গল্প শুনে বা ছবি দেখে সহজে শিখে ফেলে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় লার্নিং স্টাইলস (Learning Styles)।

গবেষণায় দেখা গেছে-

প্রায় ৬৫% শিশু ভিজ্যুয়াল লার্নার (তারা ছবি, চার্ট, গ্রাফ ইত্যাদি দেখে দ্রুত শেখে)।
প্রায় ৩০% শিশু অডিটরি লার্নার (তারা শোনা বা আলোচনা থেকে বেশি শিখে)। প্রায় ৫% শিশু কাইনেসথেটিক লার্নার (তারা হাতে-কলমে কাজ করে বুঝতে পারে)। তবে বাস্তবে শিশুদের শেখা সাধারণত মিশ্র ধরনের। কারও ভিজ্যুয়াল ঝোঁক বেশি, আবার কারও অডিটরি বা কাইনেসথেটিক ঝোঁক প্রবল।
 

শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণত একটি বই বা নির্দিষ্ট সিলেবাসের ওপর নির্ভরশীল। সমস্যা হলো-

ভিজ্যুয়াল লার্নাররা যদি পর্যাপ্ত ছবি, ডায়াগ্রাম বা রঙিন উপস্থাপন না পায়, তবে বিষয়কে নিরস মনে করে।

অডিটরি লার্নাররা শুধু লিখিত তথ্য পড়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, তাদের আলোচনা বা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

কাইনেসথেটিক লার্নাররা কেবল পড়ে কিছু শিখতে পারে না; তাদের জন্য হাতে-কলমে কাজ, এক্সপেরিমেন্ট ও রোল-প্লে দরকার।

ফলে একই পাঠ্যবই সবার জন্য সমান কার্যকর হয় না। অনেক শিশু পিছিয়ে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারায় এবং শিক্ষা তাদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

নিউরোসায়েন্স বলছে, মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাস (স্মৃতির অংশ), অ্যামিগডালা (অনুভূতি) এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ) একসঙ্গে কাজ করে শেখার প্রক্রিয়াকে কার্যকর করে। ভিজ্যুয়াল তথ্য চোখ দিয়ে দ্রুত ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে পৌঁছে স্মৃতিতে রূপ নেয়। অডিটরি তথ্য কানে শোনা হয়ে অডিটরি কর্টেক্সে জমা হয় এবং সংলাপ বা ছন্দের মাধ্যমে বেশি মনে থাকে।
 

কাইনেসথেটিক শিক্ষার্থীরা শারীরিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে মোটর কর্টেক্স ও সেন্সরি নিউরন সক্রিয় করে শেখে।
 

অতএব শেখার ধরণ শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতির ভিন্নতা।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন-একটি বই যথেষ্ট হতে পারে, যদি শিক্ষণপদ্ধতি বহুমাত্রিক হয়।যেমন -

⇨ মাল্টিমোডাল টিচিং: একই পাঠ্যবস্তু ছবি, ভিডিও, অডিও ও কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখানো।

উদাহরণ: সৌরজগত শেখাতে শুধু বই নয়, চিত্র, ভিডিও, মডেল, এমনকি শিশুদের দিয়ে গ্রহ সাজাতে দেওয়া।
 

⇨ ডিফারেনশিয়েটেড টিচিং: শিক্ষক এক ক্লাসে বিভিন্ন ধরণের শিশু অনুযায়ী পদ্ধতি পরিবর্তন করেন।

ভিজ্যুয়াল লার্নারের জন্য ডায়াগ্রাম, অডিটরির জন্য আলোচনা, কাইনেসথেটিকের জন্য গ্রুপ অ্যাক্টিভিটি।
 

⇨ টেকনোলজি ইন্টিগ্রেশন: ইন্টার‌্যাকটিভ ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন ও এডুকেশনাল গেমস শিশুদের শেখাকে আনন্দদায়ক করে তোলে।
 

⇨ অ্যাক্টিভ লার্নিং: শুধু মুখস্থ নয়, শিশু যেন প্রশ্ন করে, অংশগ্রহণ করে ও প্রয়োগ করতে পারে।
 

নীতিনির্ধারকরা যদি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া রিসোর্স অন্তর্ভুক্ত করেন, তবে শিশুর শেখা হবে আরও সমানতালে। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে যদি সন্তান বই মুখস্থ করতে না পারে, তার মানে সে অক্ষম নয়; বরং সে হয়তো ভিন্নভাবে শিখতে চায়। শিশুর শেখার ধরন চিনে নিয়ে তাকে সঠিক পরিবেশ দেওয়াই আসল শিক্ষা।
 

শেষকথা, শিক্ষা কেবল একটি বই পড়া নয়, বরং শেখার অভিজ্ঞতা তৈরি করা। প্রতিটি শিশু ভিন্নভাবে শেখে, ভিন্নভাবে বোঝে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক ছাঁচে নয়, বরং বহুমাত্রিকভাবে সাজাতে হবে। একই পাঠ্যবই যথেষ্ট হতে পারে, যদি শেখানোর ধরণে থাকে বৈচিত্র্য।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ