নিজেকে মৃত মনে হয়! কোটার্ড ডিল্যুসন নামের ভয়ংকর মানসিক বিভ্রম

নিজেকে মৃত মনে হয়! কোটার্ড ডিল্যুসন নামের ভয়ংকর মানসিক বিভ্রম
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় দেহ, পরিবেশ ও বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের সংযোগ রক্ষা করে। কিন্তু মস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রণালীর সামান্য অস্বাভাবিকতাই কখনও মানুষের চেতনায় ভয়াবহ বিকৃতি আনতে পারে। কোটার্ড ডিল্যুসন (Cotard Delusion) এমনই এক বিরল মানসিক ব্যাধি, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন তিনি মৃত, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পচে গেছে কিংবা তার রক্ত শরীরে আর প্রবাহিত হচ্ছে না।

১৮৮০ সালে ফরাসি চিকিৎসক জুল কোটার্ড প্রথম এ বিভ্রমের বিবরণ দেন। তিনি এক নারী রোগীর পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যিনি মনে করতেন, তার কোনো মস্তিষ্ক নেই, রক্ত শুকিয়ে গেছে এবং তিনি চিরকাল জীবিত থাকার অভিশাপে আক্রান্ত। সেখান থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ ব্যাধির নাম হয় Cotard's Syndrome।
 

উপসর্গ ও আচরণ:

কোটার্ড ডিল্যুসনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকটি সাধারণ উপসর্গ দেখা যায়-

⇨ নিজেকে মৃত ভাবা: "আমি বেঁচে নেই", "আমার শরীর নেই" এমন বিশ্বাস গেঁথে যায়।

⇨ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা রক্ত নেই বলে মনে করা: অনেকে বলেন তাদের হৃদয় বন্ধ হয়ে গেছে, পাকস্থলী নেই, বা রক্ত শুকিয়ে গেছে।

⇨ অতিরিক্ত অপরাধবোধ: অনেক রোগী মনে করেন তাদের পাপের কারণে তারা শাস্তি পাচ্ছেন।

⇨ আত্মহননের প্রবণতা: যেহেতু তারা মনে করেন ইতোমধ্যেই মৃত, তাই মৃত্যুভয় দূর হয়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

⇨ খাদ্যগ্রহণ বন্ধ করা: "মৃত মানুষের খাবারের প্রয়োজন নেই"-এই ধারণায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেন অনেকে।
 

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ রোগটি মূলত মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিভ্রান্তি ও মানসিক ব্যাধির সমন্বয়।

☞ স্নায়বিক কারণ: গবেষণায় দেখা গেছে, টেম্পোরাল লোব, প্যারিয়েটাল লোব ও ফ্রন্টাল লোবের কার্যকারিতায় সমস্যা হলে বাস্তবতার বোধ বিকৃত হতে পারে। এগুলো আমাদের অনুভূতি, দেহ সম্পর্কে সচেতনতা ও যুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে।
 

☞ মানসিক কারণ: গুরুতর বিষণ্নতা (Major Depression), সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার—এসব মানসিক রোগে কোটার্ড ডিল্যুসনের ঝুঁকি বেশি।
 

☞ স্নায়বিক আঘাত: মৃগী, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতও এ বিভ্রম তৈরি করতে পারে।
 

☞ চোখ ও মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল সংযোগের সমস্যা: কিছু গবেষণা বলছে, নিজের শরীরের সঙ্গে মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল ইনফরমেশন প্রসেসিং-এ সমস্যা হলে রোগী মনে করতে পারেন তিনি অস্তিত্ব হারিয়েছেন।
 

চিকিৎসা পদ্ধতি: চিকিৎসা সাধারণত ধাপে ধাপে করা হয়:

⇨ ওষুধ: অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, অ্যান্টিসাইকোটিক ও মুড-স্ট্যাবিলাইজার ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

⇨ সাইকোথেরাপি: রোগীর চিন্তা-ভাবনা ও বাস্তবতা উপলব্ধি সংশোধনে সাহায্য করে।

⇨ ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ECT): গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্নায়বিক কার্যক্রমকে পুনর্গঠিত করতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোটার্ড ডিল্যুসন কেবল মানসিক বিভ্রম নয়—বরং জীবনহানির উচ্চঝুঁকি। রোগীরা যখন খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেন বা আত্মহত্যা করতে চান, তখন তা সরাসরি শারীরিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য পরিবার ও আশেপাশের মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।


মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার শিক্ষা- কোটার্ড ডিল্যুসন আমাদের শেখায়-মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলে তার প্রভাব শুধু মানসিকতায় নয়, অস্তিত্ববোধেও পড়তে পারে। মস্তিষ্ক যখন ভুল বার্তা দেয়, তখন মানুষ নিজের জীবন সম্পর্কেই ভুল বিশ্বাস তৈরি করে। তাই মানসিক রোগকে 'সামান্য দুঃখ' বা 'অস্থায়ী চাপ' ভেবে উপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ