ত্বক ফর্সা করার গোপন ভেষজ: গাঁদার নির্যাস কি সত্যিই কাজ করছে!!

ত্বক ফর্সা করার গোপন ভেষজ: গাঁদার নির্যাস কি সত্যিই কাজ করছে!!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বাঙালির ঘরে-আঙিনায় চেনা এক ফুল হলো গাঁদা। রঙের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই ফুলের নির্যাস দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন ভেষজ চিকিৎসায়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গাঁদা ফুলের নির্যাস (Calendula officinalis extract) ত্বকের উজ্জ্বলতা ও স্বাভাবিক ফর্সাভাব ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

গাঁদা নির্যাস কী? 

গাঁদা নির্যাস মূলত গাঁদা ফুলের পাপড়ি থেকে প্রস্তুত করা হয়। এতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সক্রিয় যৌগ যেমন ফ্ল্যাভোনয়েড, ট্রাইটারপেনয়েড, ক্যারোটিনয়েড (যেমন লুটেইন ও জেক্সানথিন), স্যাপোনিন এবং প্রয়োজনীয় তেল। এই যৌগগুলো একত্রিত হয়ে ত্বকের জন্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহ-বিরোধী, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং শান্তিকর প্রভাব প্রদান করে। যদিও প্রাচীনকাল থেকে ক্ষত নিরাময় এবং ত্বক মেরামতের জন্য ব্যবহৃত, সম্প্রতি গাঁদা নির্যাস ত্বক ফর্সা করার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক গবেষণার মাধ্যমে অনেক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। 
 

গাঁদা ফুলে রয়েছে-

⇨ Flavonoids: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বককে ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

⇨ Carotenoids (lutein, zeaxanthin): ত্বকের প্রাকৃতিক রঙ উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে।

⇨ Triterpenoids: প্রদাহ কমায়, লালচে ভাব বা ব্রণের জ্বালা হ্রাস করে।
 

ত্বক সাদা করার পদ্ধতি -

ত্বকের রঙ নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করে মেলানিন। মেলানোসাইট নামক কোষ এই রঞ্জক উত্পাদন করে। মেলানিন উৎপাদনে জড়িত প্রধান এনজাইম হল টাইরোসিনেজ। যখন এই এনজাইম অতিরিক্ত সক্রিয় হয়, তখন কালো দাগ, হাইপারপিগমেন্টেশন এবং অসম ত্বকের রঙ দেখা দিতে পারে। অনেক ফর্সাকারী পণ্য এই এনজাইমকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য রাখে। তবে কৃত্রিম যৌগ যেমন হাইড্রোকুইনন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে গাঁদা নির্যাস ত্বক ফর্সা করার জন্য একটি কোমল ও নিরাপদ পদ্ধতি প্রদান করে।
 

ত্বকের জন্য গাঁদা ফুলের নির্যাসের শীর্ষ ৭টি উপকারিতা-

⇨অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য:
গাঁদা নির্যাস প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যা জ্বালাপোড়া, লালভাব এবং ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে। এটি ব্রণ ও অন্যান্য প্রদাহজনক ত্বকের সমস্যা প্রশমিত করতে কার্যকর।

⇨অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রভাব:
গাঁদা নির্যাসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে পরিবেশগত চাপ যেমন দূষণ ও অতিবেগুনী রশ্মির ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এটি ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং অকাল বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে।
Journal of Clinical Biochemistry and Nutrition-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালেন্ডুলা নির্যাসে থাকা লুটেইন ত্বককে UV রশ্মির ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং রঙ সমান করতে সহায়ক।

⇨ক্ষত নিরাময়:
গাঁদা নির্যাস শতাব্দী ধরে ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর, এবং রক্ত প্রবাহ উদ্দীপিত করে দ্রুত নিরাময় নিশ্চিত করে।
 

⇨ জলয়োজন:
গাঁদা নির্যাস ত্বককে আর্দ্র রাখে এবং এর গঠন ও স্থিতিস্থাপকতা উন্নত করতে সাহায্য করে। শুষ্ক বা পরিণত ত্বকের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী।
International Journal of Molecular Sciences (2020)–এ উল্লেখ আছে, ক্যালেন্ডুলা ফুলের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান ত্বকের লালচে ভাব ও রুক্ষতা কমায়।
 

⇨ উদ্ভাসন:
ত্বকের রঙ হালকা করতে এবং হাইপারপিগমেন্টেশন, কালো দাগের দৃশ্যমানতা কমাতে গাঁদা নির্যাস সাহায্য করে। এটি ত্বককে সমান রঙের এবং উজ্জ্বল দেখাতে সহায়ক।
 

⇨ বিরোধী পক্বতা:
গাঁদা নির্যাস কোলাজেন উৎপাদন বাড়াতে পারে, যা বলিরেখা ও সূক্ষ্ম রেখার দৃশ্যমানতা কমাতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ও দৃঢ়তা উন্নত করে এবং ত্বককে তরুণ দেখায়।
 

⇨শীতল:
গাঁদা নির্যাস ত্বকের জন্য প্রশান্তিদায়ক প্রভাব ফেলে। এটি সংবেদনশীল ত্বকের জ্বালা ও লালভাব কমাতে সাহায্য করে এবং সামগ্রিক ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

 

ত্বকের যত্নে গাঁদা নির্যাস যেভাবে ব্যবহার করবেন-

গাঁদা নির্যাস বিভিন্ন ত্বকের যত্নের পণ্য যেমন সিরাম, টোনার, মাস্ক এবং ময়েশ্চারাইজারে পাওয়া যায়।

⇨গাঁদা ফুল মিশিয়ে ময়েশ্চারাইজার বা সিরাম ব্যবহার করুন:
পরিষ্কার ত্বকে গাঁদা নির্যাসযুক্ত সিরাম বা ময়েশ্চারাইজার লাগান।
 

⇨ গাঁদা ফুলের চা টোনার তৈরি করুন:
গরম পানি দিয়ে গাঁদা ফুলের চা তৈরি করে ঠান্ডা করুন এবং স্প্রে বা তুলোর মাধ্যমে ত্বকে ব্যবহার করুন।
 

⇨ DIY গাঁদা ফুলের ফেস মাস্ক তৈরি করুন:
মধু, দই বা ওটমিলের সঙ্গে গাঁদা নির্যাস মিশিয়ে পুষ্টিকর ফেস মাস্ক বানান।
 

⇨ স্নানের জলে গাঁদা নির্যাস যোগ করুন:
স্নানের জলে কয়েক ফোঁটা গাঁদা নির্যাস মিশিয়ে ত্বককে প্রশমিত করুন।
 

⇨ গাঁদা ফুলের তেল লাগান:
গাঁদা তেল শরীরের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
 

⇨স্পট ট্রিটমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করুন:
ব্রণ, কালো দাগ বা হাইপারপিগমেন্টেশনের স্থানে সরাসরি অল্প পরিমাণে লাগান।
 

গাঁদা নির্যাস কি সব ধরণের ত্বকের জন্য নিরাপদ?

গাঁদা নির্যাস প্রায় সকল ধরনের ত্বকের জন্য নিরাপদ। সংবেদনশীল ও ব্রণ-প্রবণ ত্বকেও এটি ভালো। এটি বিশেষভাবে কার্যকর যারা নিম্নলিখিত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন:

⇨অসম ত্বকের স্বর

⇨ কালো দাগ

⇨ ব্রণ-পরবর্তী দাগ

⇨ সূর্যের দাগ

⇨ নিস্তেজতা ও পানিশূন্যতা
 

তবে নতুন পণ্য ব্যবহারের আগে প্যাচ-পরীক্ষা করা জরুরি, যাতে অ্যালার্জি বা প্রতিক্রিয়া এড়ানো যায়।
 

ত্বক ফর্সা বা উজ্জ্বল করার নামে অনেক কেমিক্যালভিত্তিক ক্রিম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। সেখানে গাঁদা ফুলের নির্যাস একটি প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। তবে নিয়মিত ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা পাওয়া সম্ভব।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ