মনের ভেতরের রহস্যময় জগৎ: স্কিজোফ্রেনিয়ার অজানা প্রভাব

- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
স্কিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং রোগগুলির একটি। এ রোগে আক্রান্ত মানুষ বাস্তব জগৎকে অনেক সময় বিকৃতভাবে উপলব্ধি করেন। তারা ভ্রম (hallucination), বিভ্রম (delusion), অস্বাভাবিক আচরণ, এবং বিশৃঙ্খল চিন্তার মধ্যে ভোগেন। বিজ্ঞানীরা একে "thought disorder" বা চিন্তার ব্যাধি হিসেবেও আখ্যা দেন। বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১ জন স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন বলে অনুমান করা হয়। সাধারণত কৈশোরের শেষভাগ থেকে তরুণ বয়সে এর উপসর্গ প্রকাশ পায়।
মস্তিষ্কে কী ঘটে?
স্কিজোফ্রেনিয়ার মূল শিকড় লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের জটিল রাসায়নিক ও স্নায়বিক কার্যকলাপে।
⇨ ডোপামিন তত্ত্ব (Dopamine hypothesis): দীর্ঘদিন ধরে ধারণা রয়েছে, মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের অস্বাভাবিক কার্যকারিতা এ রোগের অন্যতম কারণ। অতিরিক্ত ডোপামিন নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে তথ্য বিকৃত করে, যা বিভ্রম ও ভ্রম সৃষ্টি করে।
⇨ গ্লুটামেট তত্ত্ব: সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গ্লুটামেট নামক আরেকটি নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতাও স্কিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে জড়িত।
⇨ মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন: এমআরআই ও ব্রেইন স্ক্যান গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু রোগীর মস্তিষ্কে গ্রে ম্যাটার কমে যায়, হিপোক্যাম্পাস ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে আকারগত পরিবর্তন দেখা যায়—যা চিন্তা, স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুতর প্রভাব ফেলে।
স্কিজোফ্রেনিয়া এককভাবে কোনো কারণে হয় না; বরং এটি জেনেটিক ঝুঁকি ও পরিবেশের মিলিত প্রভাব। যাদের পরিবারে স্কিজোফ্রেনিয়ার ইতিহাস আছে, তাদের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সংক্রমণ, অপুষ্টি বা জন্মের সময় জটিলতা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় শৈশব বা কৈশোরে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, নির্যাতন কিংবা মাদকের (বিশেষত ক্যানাবিস) অপব্যবহার রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়াতে পারে।
লক্ষণসমূহ তিন ভাগে বিভক্ত:
⇨ পজিটিভ লক্ষণ (Positive symptoms): ভ্রম (কোনো কণ্ঠস্বর শোনা, অবাস্তব দৃশ্য দেখা), বিভ্রম (অবাস্তব বিশ্বাস—যেমন, কেউ তাকে অনুসরণ করছে বা ক্ষতি করবে), অস্বাভাবিক বা অগোছালো আচরণ।
⇨ নেগেটিভ লক্ষণ (Negative symptoms): আবেগহীনতা বা অনুভূতির ঘাটতি, সামাজিকতা হারানো, একাকিত্ব পছন্দ করা, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারানো।
⇨ কগনিটিভ লক্ষণ (Cognitive symptoms): মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা, দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করতে অক্ষমতা।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা: বর্তমানে স্কিজোফ্রেনিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা নেই, তবে নিয়মিত চিকিৎসা রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়ক।
⇨ ওষুধ: অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার মূল ভরসা। এগুলো মূলত ডোপামিন কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
⇨ সাইকোথেরাপি: নিয়মিত কাউন্সেলিং ও থেরাপি রোগীর বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা বাড়ায়।
⇨ সামাজিক সহায়তা: পরিবার ও সমাজের সহানুভূতি, নিরাপদ পরিবেশ এবং নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
⇨ জীবনধারা: পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও ধূমপান/মাদক পরিহার স্কিজোফ্রেনিয়ার উন্নত ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আধুনিক গবেষণা এখন জিনোম সিকোয়েন্সিং, নিউরোইমেজিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্কিজোফ্রেনিয়ার রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নিকট ভবিষ্যতে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা (personalized medicine) চালু হতে পারে—যেখানে রোগীর জেনেটিক প্রোফাইল দেখে নির্দিষ্ট ওষুধ ও থেরাপি নির্ধারণ করা যাবে।
এভাবে দেখলে, স্কিজোফ্রেনিয়া কেবল একটি মানসিক ব্যাধি নয়—এটি মানব মস্তিষ্কের জটিলতা, জেনেটিক উত্তরাধিকার ও পরিবেশের আন্তঃসম্পর্কের একটি জীবন্ত উদাহরণ।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।