শীতের নীরব ঘাতক হাইপোথার্মিয়া থেকে বাঁচতে যা জানতেই হবে!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
শীতকে আমরা সাধারণত কুয়াশা, পরম কাপড় আর গরম খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে চিন্তা করে থাকি। ঠান্ডা মানেই কিছুটা স্বস্তি এই ধারণা প্রায় আমাদের অনেকের মাঝেই রয়েছে,যা আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ শীতের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কিছু নীরব ঘাতক, যার আগমন হয় শব্দহীন, ক্ষতি হয় ধীরে ধীরে, কিন্তু ফলাফল হতে পারে ভয়ংকর ভাবে। তেমনি এক ঘাতকের নাম হাইপোথার্মিয়া। এটি কোনো দূরের দেশের গল্প নয়, কোনো পাহাড়ি অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয়ও নয়। শীতপ্রধান রাত, ভেজা কাপড়, দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা বাতাসে থাকা, এমনকি ঘরের ভেতরেও যথেষ্ট তাপ না থাকলে এই সমস্যা খুন সহজেই দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য এটি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
হাইপোথার্মিয়া আসলে কী?
মানুষের শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় প্রায় নির্দিষ্ট একটি তাপমাত্রা ধরে রাখে। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় 37 ডিগ্রি সেলসিয়াস (98.6 ফারেনহাইট)। এই তাপমাত্রাই শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন শরীর নিজের তৈরি তাপ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে নেমে যেতে থাকে, তখনই শুরু হয় হাইপোথার্মিয়া। হাইপোথার্মিয়া, সাধারণত নিম্ন শরীরের তাপমাত্রা হিসাবেই পরিচিত। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা 35 ডিগ্রি সেলসিয়াস (96 ফারেনহাইট) এর নিচে নেমে যায়। তবে এই অবস্থা হঠাৎ করেই হয় না। ধীরে ধীরে শরীর ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তারপর একসময় শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের নির্দেশনা এলোমেলো হতে থাকে, আর তখন মানুষ নিজের অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পারে না। এ কারণেই একে নীরব ঘাতক বলা হয়।
হাইপোথার্মিয়ার প্রকারভেদ:
হাইপোথার্মিয়ার বিভিন্ন প্রকার বা শ্রেণীবিভাগ রয়েছে:
☞ প্রাথমিক হাইপোথার্মিয়া বলতে ঠান্ডা তাপমাত্রার সংস্পর্শে আসার ফলে হওয়া হাইপোথার্মিয়াকে বোঝায়। যেমন: পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা পোশাক ছাড়াই দীর্ঘ সময়ের জন্য ঠান্ডা আবহাওয়ায় বাইরে থাকা।
☞ সেকেন্ডারি হাইপোথার্মিয়া, অন্তর্নিহিত চিকিৎসা অবস্থার কারণে বা এমন পরিস্থিতির কারণে ঘটতে পারে যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে।যেমন: নির্দিষ্ট ওষুধ, অ্যালকোহল বা মাদকের নেশা, থাইরয়েড রোগ বা স্নায়বিক অবস্থা ইত্যাদি।
শীতে কেন ঝুঁকি বেশি?
শীতকালে পরিবেশগত তাপমাত্রা কমে যাওয়াই হাইপোথার্মিয়ার প্রধান কারণ। তবে শুধু ঠান্ডা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাতাস, আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ সময় একই পরিবেশে থাকার বিষয়টি। শীতে শরীর তাপ ধরে রাখতে বেশি শক্তি ব্যয় করে। যদি সেই শক্তির জোগান না মেলে অর্থাৎ পর্যাপ্ত খাবার না খেলে, শরীর ভেজা থাকলে বা অতিরিক্ত ক্লান্তি ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। গ্রামাঞ্চলে ভোরের কুয়াশা, খোলা জায়গায় রাত কাটানো, কিংবা ভেজা কাপড় শুকাতে না পারার মতো পরিস্থিতি হাইপোথার্মিয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়। শহরেও শীতের রাতে রাস্তায় থাকা মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি কম নয়।
হাইপোথার্মিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর শুরুটা খুব সাধারণ মনে হয়। প্রথম দিকে শরীর ঠান্ডা লাগা ছাড়া তেমন কিছু অনুভূত হয় না। ফলে অনুভূতি মনে হয়। কিন্তু এই স্বাভাবিক ভাবনাটিই ধীরে ধীরে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। শরীর প্রথমে কাঁপতে শুরু করে। এটি আসলে শরীরের একটি প্রতিরক্ষার কৌশল, কাঁপুনির মাধ্যমে তাপ তৈরি করার চেষ্টা। কিন্তু দীর্ঘ সময় কাঁপুনি চললে বুঝতে হবে, শরীরের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
কখন বুঝবেন বিপদ আসন্ন?
হাইপোথার্মিয়ার কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলো দেখা দিলেই সতর্ক হওয়া জরুরি। এগুলো উপেক্ষা করা মানেই ঝুঁকির দরজা খুলে দেওয়া।
প্রথম লক্ষণ হলো অস্বাভাবিক কাঁপুনি। শীত লাগলে কাঁপা স্বাভাবিক, কিন্তু যদি কাঁপুনি থামার নাম না নেয় বা হঠাৎ করে কাঁপুনি কমে যায়, দুটোই বিপদের ইঙ্গিত। অনেকেই জানেন না, কাঁপুনি হঠাৎ কমে যাওয়া মানে শরীর আর তাপ তৈরি করতে পারছে না।
এরপর আসে অবসন্নতা ও ঝিমুনি। হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত মানুষ অস্বাভাবিকভাবে ক্লান্ত বোধ করে। চোখ ভারী লাগে, কথা বলতে ইচ্ছে করে না। এই ঝিমুনি আসলে শরীরের সতর্ক সংকেত।
বিভ্রান্তি ও অসংলগ্ন আচরণ আরেকটি গুরুতর লক্ষণ। মানুষ ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, সহজ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে, কখনো অযথা হাসে বা অস্বাভাবিক আচরণ করে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারে না যে সে বিপদে আছে।
আরও একটি লক্ষণ হলো হাত-পা অবশ হয়ে আসা। রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ায় আঙুল, পা বা মুখে অনুভূতি কমে যায়। এই অবস্থায় মানুষ ঠান্ডা অনুভব করাও বন্ধ করে দিতে পারে, যা সবচেয়ে ভয়ংকর পর্যায়।
শিশু ও বৃদ্ধদের ঝুঁকি কেন বেশি?
শিশুদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি শক্তিশালী নয়। তারা দ্রুত তাপ হারায় এবং নিজের সমস্যার কথা ঠিকমতো জানাতেও পারে না। অন্যদিকে বৃদ্ধদের শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, ফলে ঠান্ডার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের রোগ, অপুষ্টি বা শারীরিক দুর্বলতা থাকলে হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। একা থাকা বৃদ্ধ মানুষদের ক্ষেত্রে এই বিপদ অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে।
অনেকে মনে করেন, হাইপোথার্মিয়া মানে বাইরে ঠান্ডায় পড়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘরের ভেতরেও এটি হতে পারে। বিশেষ করে শীতে যদি ঘর যথেষ্ট উষ্ণ না থাকে, জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে, কিংবা মানুষ দীর্ঘ সময় বিছানায় নড়াচড়া না করে থাকে তাহলে ঝুঁকি থেকে যায় । রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে শরীরের তাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। ঠান্ডা ঘরে অপর্যাপ্ত কম্বল থাকলে এই কমে যাওয়া তাপ বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছাতে পারে।
হাইপোথার্মিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই আর ঠান্ডা অনুভব করে না। এই পর্যায়ে শরীরের স্নায়বিক সংকেত দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ শান্ত হয়ে যায়, কখনো ঘুমিয়ে পড়তে চায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সে স্বস্তিতে আছে, কিন্তু শরীর তখন মারাত্মক বিপদের মধ্যে থাকে । এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী পর্যন্ত হতে পারে।
কী করলে ঝুঁকি কমানো যায়?
শীতকালে হাইপোথার্মিয়া এড়ানোর প্রথম শর্ত হলো শরীর শুকনো রাখা। ভেজা কাপড় যত দ্রুত সম্ভব বদলাতে হবে। ঠান্ডায় ভেজা শরীর তাপ দ্রুত হারায়। স্তরভিত্তিক পোশাক শীত মোকাবিলার কার্যকর উপায়। একাধিক স্তরের কাপড় শরীরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। শুধু মোটা কাপড় নয়, বাতাস আটকাতে পারে এমন পোশাক গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত গরম খাবার ও পানীয় শরীরকে ভেতর থেকে উষ্ণ রাখে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা ঠান্ডায় ঝুঁকি বাড়ায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, লক্ষণ চিনতে শেখা। নিজের বা আশপাশের কারও মধ্যে অস্বাভাবিক কাঁপুনি, বিভ্রান্তি বা অবসন্নতা দেখলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।
হাইপোথার্মিয়া কোনো নাটকীয় বিপদ নয়। এটি আসে চুপিসারে এবং ধীরে ধীরে। শীতের স্বাভাবিক অসুবিধা ভেবে আমরা যখন লক্ষণগুলো উপেক্ষা করি, তখনই এই নীরব ঘাতক তার কাজ শুরু করে। শীত মানেই শুধু উৎসব আর আরাম নয়, এটি সতর্ক থাকারও সময়।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।