বই পড়া এখন আর শখ নয়, মানসিক রক্ষাকবচ!- গবেষণা

বই পড়া এখন আর শখ নয়, মানসিক রক্ষাকবচ!- গবেষণা
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শেষ কবে একনাগাড়ে একটা বই শেষ করেছিলেন,মনে আছে কি? যদি উত্তর দিতে গিয়ে একটু থমকে যেতে হয়, তবে বুঝবেন জীবনের ট্র্যাকে কোথাও একটা গড়বড় হচ্ছে। সত্যি বলতে, স্ক্রল করতে করতে আমরা আসলে ভুলেই যাচ্ছি, বইয়ের পাতার ঘ্রাণ! এক সময় বই পড়া ছিল অবসর কাটানোর আনন্দময় অভ্যাস। আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল জীবনে সেটাই অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে বিলাসিতা।কিন্তু জানেন কি, স্রেফ বিনোদনের জন্য নয়, নিজেকে চেনার জন্য এবং মেন্টাল গেম স্ট্রং রাখতেও বইয়ের চেয়ে বড় কোনো হাতিয়ারই নেই! বই কেবল কাগজের স্তূপ নয়, বরং অন্য একজনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকার এক অনন্য সুযোগ। আপনি যদি ভুলেই গিয়ে থাকেন শেষ কবে কোনো গল্পের গভীরে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তবে সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। গবেষকরা বলছেন, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্ককে করে তোলে আরও ধারালো ও শান্ত।

আধুনিক জীবন যত জটিল হচ্ছে, ততই বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর ও জরুরি হয়ে উঠছে। কারণ বই শুধু জ্ঞান দেয় না, বই মানুষকে ভেতর থেকে গড়ে তোলে। মানুষের মধ্যে চিন্তা, মনন ও সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি করে। নিয়মিত বই পড়া কেন প্রয়োজন, এই প্রশ্নের উত্তর একটি লাইনে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতি, ভাষার দক্ষতা, এমনকি জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও। সব মিলিয়েই বই পড়ার গুরুত্ব আজ নতুন করে আলোচনায়।

চলুন জেনে নিই, কেন আজই আপনার একটি বই হাতে নেওয়া উচিত।

☞ বই পড়া ও মস্তিষ্কের ব্যায়ামের সমতুল্য। মানুষের মস্তিষ্ক কোনো স্থির যন্ত্র নয়। এটি ব্যবহার অনুযায়ী বদলায়, শক্তিশালী হয় বা দুর্বল হয়। নিয়মিত বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়ামের মতো কাজ করে। যখন আমরা বই পড়ি, তখন মস্তিষ্ক একসঙ্গে বহু কাজ করে। মস্তিষ্ক একই সাথে শব্দ বোঝে, অর্থ বিশ্লেষণ করে, কল্পনা তৈরি করে এবং আগের জ্ঞানের সঙ্গে নতুন তথ্যের সংযোগ ঘটায়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হয়। ফলে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে, চিন্তার গভীরতা তৈরি হয় এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে শুরু করে। যারা নিয়মিত বই পড়েন, তারা সাধারণত দীর্ঘ সময় এক বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেন, যা আজকের বিভ্রান্তিকর সময়ে একটি বিরল ক্ষমতা।

☞ মনোযোগ হারানোর যুগে বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় মানসিক সমস্যা হলো মনোযোগের ভাঙন। কয়েক সেকেন্ড পরপর নোটিফিকেশন, নতুন কনটেন্ট আর দ্রুত বদলে যাওয়া তথ্য আমাদের মনকে অস্থির করে তুলছে। এর ফলে গভীরভাবে কিছু ভাবার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। বই পড়া এই অস্থিরতার বিপরীতে কাজ করে। একটি বই পড়তে হলে নির্দিষ্ট সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। গল্পের ধারাবাহিকতা, তথ্যের যুক্তি বা ভাবনার প্রবাহ বুঝতে মনকে স্থির রাখতে হয়। নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে উঠলে ধীরে ধীরে মনোযোগের ক্ষমতা ফিরে আসে। শুধু বই পড়ার সময় নয়, কাজের ক্ষেত্রেও এই মনোযোগ ধরে রাখার দক্ষতা কাজে লাগে।

☞ মানসিক চাপ কমানোর একটি নীরব উপায়। মানসিক চাপ আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজের চাপ, অনিশ্চয়তা, সামাজিক তুলনা সব মিলিয়ে মানুষের মাথার ভেতর সারাক্ষণ এক ধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করে। বই পড়া এই চাপ থেকে বের হওয়ার একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর উপায়। বই পড়ার সময় মানুষ সাময়িকভাবে নিজের বাস্তব জগত থেকে বেরিয়ে অন্য এক জগতে প্রবেশ করে। গল্পের চরিত্র, ঘটনা বা ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে গিয়ে নিজের সমস্যাগুলো কিছুক্ষণের জন্য হলেও দূরে সরে যায়। এই মানসিক বিরতি মস্তিষ্ককে স্বস্তি দেয়। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস মানসিক অস্থিরতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

☞ ভাষা দক্ষতা ও শব্দভান্ডার বাড়ায় বই। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, চিন্তার কাঠামোও গড়ে তোলে। আমরা যত সমৃদ্ধ ভাষায় ভাবতে পারি, তত গভীরভাবে চিন্তা করতে পারি। নিয়মিত বই পড়া ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। বইয়ের মাধ্যমে নতুন শব্দ, বাক্যগঠন ও প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এতে শব্দভান্ডার স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। যারা নিয়মিত বই পড়েন, তারা নিজের কথা বা ভাবনা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ও গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। এটি পড়াশোনা, চাকরি বা সামাজিক যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই বড় একটি সুবিধা।

☞ চিন্তার গভীরতা ও যুক্তিবোধ তৈরি করে। বই শুধু তথ্য দেয় না, প্রশ্ন তুলতে শেখায়। বিশেষ করে প্রবন্ধ, দর্শন, ইতিহাস বা বিজ্ঞানভিত্তিক বই চিন্তাকে বহুমাত্রিক করে তোলে। একটি বিষয়কে শুধু এক দিক থেকে নয়, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অভ্যাস তৈরি হয়। নিয়মিত বই পড়লে মানুষ সহজেই সবকিছু বিশ্বাস করে ফেলার বদলে ভাবতে শেখে, কেন এমন হলো, এর পেছনের কারণ কী, এর বিকল্প ব্যাখ্যা কী হতে পারে। এই যুক্তিবোধ একজন মানুষকে কুসংস্কার, গুজব ও ভুল তথ্য থেকে অনেকটাই রক্ষা করে।

☞ সহানুভূতি ও মানবিক বোধ বাড়ায়। গল্প, উপন্যাস বা জীবনী পড়ার একটি বড় প্রভাব পড়ে মানুষের আবেগ ও সহানুভূতির ওপর। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের জীবন, সংগ্রাম ও অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হলে পাঠকের ভেতর অন্যকে বোঝার ক্ষমতা বাড়ে। যখন কেউ একটি চরিত্রের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখে, তখন বাস্তব জীবনের মানুষের অনুভূতিও সে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে সহানুভূতিশীল মনোভাব তৈরি করে, যা সামাজিক সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে।

☞ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা উন্নত করে। জীবনে প্রতিদিনই ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বই পড়ার অভ্যাস এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে পরিণত করে। কারণ বই আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়ায়, নিজের জীবনে না ঘটলেও অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ দেয়। ইতিহাসের বই মানুষকে শেখায় ভুল থেকে শিক্ষা নিতে। জীবনী শেখায় সাফল্য ও ব্যর্থতার বাস্তব দিক। গল্প শেখায় পরিস্থিতির জটিলতা। এই সবকিছু মিলিয়ে বই পড়ুয়া মানুষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বেশি ভেবে, যুক্তি দিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি ফল বিবেচনা করে এগোন।

☞ স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সহায়ক।বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিয়মিত বই পড়া স্মৃতিশক্তিকে সক্রিয় রাখে। গল্পের চরিত্র, ঘটনা, তথ্য সব মনে রাখতে গিয়ে মস্তিষ্ক নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পায়। এতে স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুগুলোর কার্যকারিতা বজায় থাকে। ফলে বয়স বাড়লেও মানসিক সতর্কতা ও স্মরণক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে।

☞ আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়। জীবনের অর্থ, লক্ষ্য, নৈতিকতা ইত্যাদি  নিয়ে ভাবতে শেখে। ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান ও বিশ্বাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়। এই আত্মপরিচয় আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। যারা পড়াশোনা ও চিন্তায় সমৃদ্ধ, তারা সাধারণত নিজের মত প্রকাশে দ্বিধা কম অনুভব করেন। তারা জানেন, মতের পেছনে যুক্তি আছে।

☞ শিশু ও তরুণদের জন্য বই পড়ার গুরুত্ব অসীম। শিশু ও তরুণ বয়সে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে তার প্রভাব সারাজীবন থাকে।এই বয়সে মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি শিখতে পারে।বই পড়া তাদের কল্পনাশক্তি বাড়ায়, ভাষা শেখায় এবং চিন্তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, তারা সাধারণত পড়াশোনায় মনোযোগী হয় এবং ভবিষ্যতে জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।

ডিজিটাল কনটেন্ট বনাম বই!

ডিজিটাল কনটেন্ট তথ্য দেয় দ্রুত, কিন্তু গভীরতা দেয় না। বই সেখানে ব্যতিক্রম। বই ধীর গতির, কিন্তু গভীর। বই পড়তে সময় লাগে, কিন্তু সেই সময়টাই মানুষকে ভাবতে শেখায়। ডিজিটাল যুগে বই পড়া মানে প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং ভারসাম্য তৈরি করা। স্ক্রিনের বাইরে গিয়ে কাগজের পাতায় বা দীর্ঘ লেখায় মন দেওয়া মানে নিজের চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। নিয়মিত বই পড়া কোনো তাৎক্ষণিক ফলের প্রতিশ্রুতি দেয় না। এটি ধীরে কাজ করে, নীরবে কাজ করে। কিন্তু এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

 

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ