থেরাপিস্ট ছাড়াই মানসিক শান্তি! বিব্লিওথেরাপি কৌশল জানেন?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
মানসিক ক্লান্তি, অস্থিরতা, একাকিত্ব অথবা দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অনুভূতিগুলো আধুনিক জীবনে এখন আর নতুন কিছু নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই এসব সমস্যার সমাধানের জন্য ওষুধ বা কাউন্সেলিংয়ের কথা ভাবেন। কিন্তু এর পাশাপাশি এক ভিন্ন ধরনের প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি নতুন করে আবার সামনে আসছে, যেখানে প্রেসক্রিপশনে থাকে না ট্যাবলেট, থাকে শুধু বই। এই পদ্ধতির নাম বিব্লিওথেরাপি,যা কবিতা থেরাপি বা থেরাপিউটিক স্টোরিটেলিং, বই থেরাপি এমনকি পঠন থেরাপি নামেও পরিচিত। গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের বেশ প্রাচীন একটি ধারণা হল এই বাইবলিওথেরাপ।
‘বিব্লিওথেরাপি’ শব্দটির অর্থ হলো বইয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা। এটি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে নির্দিষ্ট ধরনের বই বা লেখা পাঠ করে মানুষ নিজের আবেগ, চিন্তা ও মানসিক সংকটকে বুঝতে পারে। এটি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। এখানে বই কোনো নির্দেশ দেয় না ঠিকই, তবে পাঠকের ভেতরে থাকা প্রশ্নগুলোকে বের করে আনে। থেরাপি হিসেবে এটি বই, কবিতা এবং অন্যান্য লিখিত শব্দের বিষয়বস্তুর সাথে ব্যক্তির সংযোগকে ব্যবহার করে থাকে।
শুনতে অবাক লাগলেও, বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ধারণাটি একেবারে কিন্তু নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনায় বিব্লিওথেরাপি নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
মানুষ গল্পপ্রিয় প্রাণী। ছোটবেলা থেকেই আমরা গল্পের মাধ্যমে পৃথিবী বুঝতে শিখি। বই পড়ার সময় মস্তিষ্ক কেবল শব্দ নয়, বরং অভিজ্ঞতাও গ্রহণ করে। গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যায় দেখা যায়, বই পড়ার সময় মস্তিষ্কের কল্পনাশক্তি সক্রিয় হয়। পাঠক নিজেকে চরিত্রের জায়গায় কল্পনা করে। ফলে আবেগ ও সহানুভূতির অংশগুলো উদ্দীপিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ নিজের সমস্যাকে অন্যের গল্পের ভেতর দিয়ে দেখতে পায়। এতে একধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা সমস্যাকে বোঝা ও গ্রহণ করা সহজ করে।
বিব্লিওথেরাপি যেভাবে কাজ করে:
বিব্লিওথেরাপি নির্দিষ্ট কোনো একধরনের বইয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে—
১. পরিচিতির ধাপ: পাঠক গল্পের কোনো চরিত্র, ভাবনা বা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে ফেলে। এতে তার মনে হয় সে একা নয়, অন্যরাও এমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছে।
২. আবেগ প্রকাশের ধাপ: বই পড়ার সময় চেপে রাখা অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে। দুঃখ, রাগ, ভয় কিংবা অপরাধবোধ, সবকিছু শব্দের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসার পথ পায়।
৩. উপলব্ধির ধাপ: গল্পের ভেতরের অভিজ্ঞতা পাঠককে নিজের জীবনের দিকে নতুনভাবে তাকাতে শেখায়। সমাধান সরাসরি না পেলেও, চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
এই তিনটি ধাপ মিলেই বিব্লিওথেরাপির মূল শক্তি।
যদিও বিব্লিওথেরাপি কোনো একক সমাধান না, তবুও কিছু মানসিক সমস্যায় এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে—
⇨ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
⇨ হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার বিষণ্নতা
⇨ উদ্বেগ ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
⇨ আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি
⇨ একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
এক্ষেত্রে বই একধরনের নীরব সঙ্গীর ভূমিকা পালন করে।
যে ধরনের বই ব্যবহৃত হয়:
অনেকের ধারণা, বিব্লিওথেরাপি মানেই আত্মউন্নয়নমূলক বই। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। এখানে ব্যবহৃত হতে পারে উপন্যাস ও ছোটগল্প, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা, কবিতা, দার্শনিক বা চিন্তামূলক লেখা। মূল বিষয় হলো বইটি যেন পাঠকের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে। কখনো একটি উপন্যাসের চরিত্র, কখনো বা একটি কবিতার পঙ্ক্তিই হয়ে ওঠে আরোগ্যের সূত্র।
আধুনিক থেরাপির সঙ্গে বিব্লিওথেরাপির সম্পর্ক:
বিব্লিওথেরাপি আধুনিক মানসিক চিকিৎসার বিকল্প নয়,অনেক ক্ষেত্রে এটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কাউন্সেলিং বা থেরাপির সঙ্গে বই পড়া যুক্ত হলে, মানুষ নিজের অনুভূতিকে ভাষা দিতে আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অনেক সময় মানুষ মুখে যা বলতে পারে না, বইয়ের মাধ্যমে তা বুঝতে পারে। এই উপলব্ধি থেরাপির পরবর্তী ধাপগুলোকে সহজ আরও করে তোলে।
ডিজিটাল যুগে মনোযোগ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো, অবিরাম স্ক্রিন ব্যবহার। বই পড়া এখানে একধরনের মানসিক বিরতি দেয়। স্ক্রিনের দ্রুত গতির বিপরীতে বই পড়া চিন্তার গতি ধীর করে, মনোযোগ স্থায়ী করে এবং মস্তিষ্ককে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ দেয়। এই ধীরতা মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা:
বিব্লিওথেরাপি সব সমস্যার সমাধান নয়। গুরুতর মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এটি একমাত্র চিকিৎসা হতে পারে না। তাছাড়া সবাই একই বই থেকে একই উপকার পায় না। কারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও মানসিক গঠন ভিন্ন। তবে এটুকু বলা যায়, বই পড়া ক্ষতিকর নয়। বরং সঠিকভাবে বেছে নেওয়া বই মানসিক সুস্থতার পথে একটি নিরাপদ সহযাত্রী হতে পারে।
সমাজে বিব্লিওথেরাপির গুরুত্ব:
যে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনো অনেকের কাছে কঠিন, সেখানে বিব্লিওথেরাপি একটি নীরব দরজা খুলে দেয়। বইয়ের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানো মানুষকে নিজের সঙ্গে কথা বলার সাহস দেয়। এটি কাউকে লেবেল দেয় না, বিচার করে না শুধু শোনে, অনুভব করতে শেখায়।
বই পড়া দিয়ে মানসিক রোগের চিকিৎসার ধারণা শুনতে হয়তো সহজ মনে হয়, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের মনের গভীর বিজ্ঞান। বিব্লিওথেরাপি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আরোগ্য সবসময় বাইরে থেকে আসে না। অনেক সময় তা জন্ম নেয় নিজের ভেতরেই। শব্দ, গল্প আর অনুভূতির মেলবন্ধনে বই হয়ে ওঠে নীরব থেরাপিস্ট। প্রযুক্তি আর দ্রুততার এই যুগে, হয়তো কয়েক পৃষ্ঠা পড়াই হতে পারে মানসিক প্রশান্তির প্রথম ধাপ।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।