এই ভুলগুলো না করলে টবেই ফুটবে সূর্যমুখী!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
উঁচু উঁচু দালান, কংক্রিটের দেয়াল আর পরিমিত খোলা জায়গার শহরজীবনে অনেকেই মনে করেন, চাষাবাদ বুঝি শুধু গ্রামের বিষয়। কিন্তু বর্তমান নগরজীবনে টবে সবজি, ফল বা ফুল চাষ এখন আর বিলাস নয়, উল্টো সচেতন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূর্যমুখী ফুল চাষ বেশ লাভজনক। অথচ অনেকেই মনে করে থাকে, সূর্যমুখী মানেই বিশাল মাঠ আর উঁচু গাছ। এদেশের মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায়, সঠিক পদ্ধতি জানলে অল্প জায়গায়, এমনকি বারান্দা বা ছাদে রাখা একটি টবেই সফলভাবে সূর্যমুখী চাষ করা সম্ভব। সূর্যমুখী একটি অর্থকরী ফসল। এর উৎপাদন খরচ কম। তাছাড়া ফুল থেকে উৎপাদিত তেল ও খৈল বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হাচ্ছে অনেকই।
সূর্যমুখী কেন টবে চাষের জন্য উপযোগী?
সূর্যমুখী একটি দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ। এর শিকড় খুব বেশি গভীরে না গেলেও পর্যাপ্ত জায়গা পেলে ভালোভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে। এ কারণেই নির্দিষ্ট আকারের টবে এটি সহজেই মানিয়ে নিতে পারে।বিশেষ করে বর্তমানে এমন কিছু জাত পাওয়া যায়, যেগুলো তুলনামূলক খর্বাকৃতির। এসব সূর্যমুখী ছোট জায়গায় বেড়ে ওঠে এবং টবে চাষের জন্য আদর্শ। নগরজীবনের সীমাবদ্ধতায় এই বৈশিষ্ট্যই সূর্যমুখীকে জনপ্রিয় করে তুলছে।
টব নির্বাচন:
টবে সূর্যমুখী চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক টব নির্বাচন। সূর্যমুখীর শিকড় নিচের দিকে বিস্তৃত হতে চায়, তাই খুব ছোট টব হলে গাছের বৃদ্ধিতে বাধা পড়ে। তাই মাঝারি থেকে বড় আকারের টব সবচেয়ে উপযোগী। টবের নিচে অবশ্যই পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র রাখতে হবে। প্লাস্টিক, মাটির বা সিমেন্টের টব সবই ব্যবহার করা যায়, তবে মাটির টব গাছের জন্য তুলনামূলক আরামদায়ক। টব যত গভীর হবে, গাছ তত বেশি মজবুত হবে, সূর্যমুখীর ক্ষেত্রে এ ধারণাটি বেশ কার্যকর।
মাটি প্রস্তুত:
ঝরঝরে ও পানি নিষ্কাশনযোগ্য মাটি, সূর্যমুখীর ভালো ফলনের জন্য উপযোগী। ভারী বা কাদাযুক্ত মাটিতে, পানি জমে গেলে শিকড় পচে যাওয়ার মত ঝুঁকি থাকে। একটি আদর্শ মাটির মিশ্রণে সাধারণত থাকে-
১। বাগানের সাধারণ মাটি
২। জৈব সার বা পচা গোবর
৩। বালু বা ঝরঝরে উপাদান
এই মিশ্রণ মাটিকে হালকা রাখে এবং শিকড়ের চারপাশে বাতাস চলাচলের সুযোগ দেয়। ফলে গাছ দ্রুত ও সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
বীজ বপন:
সূর্যমুখীর বীজ সরাসরি টবেই বপন করাই উত্তম। আলাদা চারা তৈরি করে, পরবর্তীতে স্থানান্তর করলে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বীজ বপনের সময় মাটির উপরে হালকা গর্ত করে বীজ বসাতে হয়। খুব গভীরে পুঁতে দিলে অঙ্কুরোদগম দেরি হতে পারে। বীজ পুঁতে হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পেলে কয়েক দিনের মধ্যেই মাটি ফুঁড়ে ছোট্ট একটি চারা বেরিয়ে আসে।
রোদ:
নামেই বোঝা যায়, সূর্যমুখী সূর্যালোক ভালোবাসে। সূর্যের আলো সূর্যমুখীর প্রিয় উপাদান। প্রতিদিন অন্তত ৫–৬ ঘণ্টা সরাসরি রোদ না পেলে গাছ দুর্বল হয়ে যায় এবং ফুল আকারের ছোট হয়। শহুরে বাড়ির ক্ষেত্রে বারান্দা বা ছাদের এমন জায়গা বেছে নিতে হবে, যেখানে দিনের বেশিরভাগ সময়ই আলো থাকে জানালার পাশে পর্যাপ্ত আলো না পেলে গাছ লম্বা হলেও ফুল ভালো হয় না। রোদ যত ভালো, ফুল তত বড় ও উজ্জ্বল হবে।
পানি ব্যবস্থাপনা:
সূর্যমুখী পানি পছন্দ করে। কিন্তু অতিরিক্ত পানি একেবারেই সহ্য করতে পারে না। টবে চাষের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাটির উপরিভাগ শুকালে তবেই পানি দেওয়া ভালো
টবে পানি জমে থাকলে শিকড়ের ক্ষতি হয়। সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা গাছকে রোগমুক্ত ও সবল রাখতে সাহায্য করে।
বৃদ্ধি পর্যায় ও পরিচর্যা:
সূর্যমুখী সাধারণত খুব দ্রুত বাড়ে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গাছ লম্বা হতে হয়ে, কুঁড়ি ধরতে দেখা যায়। এই সময় গাছের যত্নে কিছু বিষয় উল্লেখযোগ্য—
⇨ গাছ বেশি লম্বা হলে খুঁটি দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া।
⇨ শুকনো বা ক্ষতিগ্রস্ত পাতা ছেঁটে দেওয়া।
⇨ মাঝে মাঝে জৈব সার প্রয়োগ।
এই পরিচর্যাগুলো গাছকে শক্ত রাখে এবং ফুল ফোটার সময় শক্তি জোগায়।
ফুল ফোটার মুহূর্ত:
সূর্যমুখীর সবচেয়ে আনন্দের সময় আসে ফুল ফোটার দিনগুলোতে। একটি টবে বড় হলুদ ফুল ফুটে উঠলে তা শুধু চোখের আরামই দেয় না, মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে এই মুহূর্ত থেকেই বাগান করার প্রতি ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়।
বীজ সংগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:
ফুল শুকিয়ে গেলে সূর্যমুখীর মাঝখানে তৈরি হয় অসংখ্য বীজ। সেগুলো পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। এতে বাজারের ওপর নির্ভরতা কমে এবং নিজস্ব চাষের আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
চাষাবাদ মানেই বিশাল জমি নয়, অল্প জায়গায় টবে সূর্যমুখি চাষ তারই প্রমাণ। সূর্যের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা এই ফুল শহুরে জীবনে এক টুকরো প্রকৃতি এনে দিতে পারে। শুধু প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, সামান্য সময় আর একটু যত্ন। একটি ছোট টবে ফুটে ওঠা সূর্যমুখী আমাদের দেখায়, পরিসর যত ছোটই হোক, যত্ন আর আগ্রহ থাকলে সম্ভাবনার কোনো সীমা থাকে না।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।