কচ্ছপ ডিম পাড়তে সবসময় একই সৈকতে ফিরে যায় কেন?

কচ্ছপ ডিম পাড়তে সবসময় একই সৈকতে ফিরে যায় কেন?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

প্রশান্ত বা ভারত মহাসাগরের অসীম জলরাশি পেরিয়ে, দিকনির্দেশহীন মনে হওয়া এক দীর্ঘ যাত্রা শেষে হঠাৎ করেই একটি নির্দিষ্ট সৈকতে ভিড়ে ওঠে একটি সামুদ্রিক কচ্ছপ। চারপাশে অসংখ্য উপকূল, শত শত সৈকত, তবু সে ভুল করে না। ঠিক সেই জায়গাতেই সে ফিরে আসে, যেখানে বহু বছর আগে তার জন্ম হয়েছিল। প্রশ্নটা এখানেই! কচ্ছপ কেন ডিম পাড়তে সবসময় একই সৈকতে ফিরে যায় কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হয় জীববিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা এবং প্রকৃতির স্মৃতিশক্তির এক অসাধারণ জগতে। এটি শুধু প্রাণীর অভ্যাস নয়, এটি প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত ন্যাভিগেশন ব্যবস্থাগুলোর একটি।

কচ্ছপের জীবনের শুরুটা হয় বালির নিচে থেকে । একটি নির্দিষ্ট সৈকতে ডিম ফুটে বের হওয়ার সময়ই তার শরীর ও মস্তিষ্ক আশপাশের পরিবেশের নানা সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সংকেত গ্রহণ করতে থাকে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সময়েই কচ্ছপের মধ্যে সেই সৈকতের একটি জৈবিক স্মৃতি তৈরি হয়। এই স্মৃতি মানুষের মতো সচেতন নয়, এটি কাজ করে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মাধ্যমে। বহু বছর পর, যখন কচ্ছপ প্রজননের উপযুক্ত হয়, তখন সেই স্মৃতিই তাকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আবার জন্মস্থানের দিকে টেনে নিয়ে আসে।

পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে কচ্ছপের এই অবিশ্বাস্য দিকনির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রহস্য লুকিয়ে আছে । পৃথিবী একটি বিশাল চুম্বকের মতো আচরণ করে, যার শক্তি ও দিক পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, কচ্ছপ জন্মের সময় যে সৈকতে থাকে, সেই এলাকার চৌম্বক সংকেত, যেমন চৌম্বক শক্তির তীব্রতা ও দিক, তার স্নায়ুতন্ত্রে একটি মানচিত্রের মতো সংরক্ষিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে সমুদ্রের মাঝেও সে এই সংকেত শনাক্ত করতে পারে এবং ধীরে ধীরে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই কারণে কচ্ছপের পথচলা কেবল চোখ বা সূর্যের ওপর নির্ভর করে না, এটি অনেক গভীর ও সূক্ষ্ম একটি প্রাকৃতিক ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা।

চৌম্বক ক্ষেত্রের পাশাপাশি আরও কিছু প্রাকৃতিক উপাদান কচ্ছপকে সহায়তা করে-

◑ সমুদ্রস্রোত: ছোটবেলায় কচ্ছপ যেসব স্রোতের সঙ্গে ভেসে বড় হয়, সেগুলোর গতিপথ তার শরীরে একটি প্রাকৃতিক মানচিত্র তৈরি করে।

◑ গন্ধের সংকেত: নির্দিষ্ট সৈকতের বালু, পানি ও আশপাশের উদ্ভিদের নিজস্ব রাসায়নিক গন্ধ থাকে। আর প্রাপ্তবয়স্ক কচ্ছপ সেই পরিচিত গন্ধ শনাক্ত করতে পারে।

◑ তরঙ্গ ও শব্দ: সৈকতের ঢেউয়ের শব্দ ও কম্পনও কচ্ছপের জন্য একটি পরিচিত সংকেত হিসেবে কাজ করে। 

এই সব সংকেত একসঙ্গে কাজ করে কচ্ছপকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

তাপমাত্রা ও লিঙ্গ নির্ধারণের সূক্ষ্ম সম্পর্ক-

কচ্ছপের ক্ষেত্রে ডিমের তাপমাত্রা শুধু ডিম ফোটানোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি ভবিষ্যৎ বাচ্চার লিঙ্গও নির্ধারণ করে। বালুর তাপমাত্রা সামান্য কম বা বেশি হলে পুরুষ ও স্ত্রী কচ্ছপের অনুপাত বদলে যেতে পারে। একই সৈকতে ফিরে আসার মাধ্যমে কচ্ছপ সেই তাপমাত্রার পরিবেশে ডিম পাড়ে, যা তার প্রজাতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। ফলে প্রাকৃতিক জনসংখ্যার স্থিতিশীলতাও রক্ষা পায়।

মানুষ ও আধুনিকতার হস্তক্ষেপে বিপদের আশঙ্কা

এই নিখুঁত প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানুষের কার্যকলাপ। সৈকতে অতিরিক্ত আলো, পর্যটনের চাপ, নির্মাণকাজ এবং বালু পরিবর্তনের কারণে কচ্ছপের পরিচিত সংকেতগুলো অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কৃত্রিম আলো চাঁদ ও সমুদ্রের প্রতিফলনের স্বাভাবিক দিকনির্দেশ নষ্ট করে দেয়। ফলে ডিম পাড়তে আসা কচ্ছপ বা সদ্য ফোটা বাচ্চারা ভুল পথে চলে যায়। এতে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে কমে যায়।

মানুষ যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে পথ খুঁজে নেয়, সেখানে কচ্ছপ নির্ভর করে পৃথিবীর প্রাকৃতিক শক্তির ওপর। এই পার্থক্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই টিকে থাকা সবচেয়ে টেকসই পথ।

প্রকৃতি যখন কোনো প্রাণীকে এমন নিখুঁত দিকনির্দেশনা দেয়, তখন সেই পরিবেশ রক্ষা করা মানুষের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একটি সৈকত হারিয়ে গেলে, শুধু একটি জায়গা নয় হারিয়ে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা একটি জীবনের স্মৃতি।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ