হজমশক্তির নীরব রক্ষাকবচ,দক্ষিণ এশিয়ার এলিফ্যান্ট অ্যাপল এবং তার উপকারিতা
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামবাংলার পথঘাট, বনাঞ্চল কিংবা নদীপাড়ে চোখে পড়া এক পরিচিত তবে বেশ অবহেলিত একটি ফল এলিফ্যান্ট অ্যাপল। কোথাও একে ডাকা হয় চালতা, কোথাও ওলগোল, কোথাও আবার বুনো ফল হিসেবেই পরিচিত। শহুরে ফলের ঝলমলে বাজারে এর খুব একটা কদর না থাকলেও, লোকজ খাদ্যসংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক চিকিৎসায় এই ফলের অবস্থান বহু পুরনো। টক স্বাদের জন্য অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিলেও, খাদ্য বিজ্ঞান বলছে, এই টকই আসলে এর সবচেয়ে বড় শক্তি। এলিফ্যান্ট অ্যাপল কোনো বিলাসী ফল নয়, কোনো বিদেশি সুপারফুডও নয়। কিন্তু হজমব্যবস্থা ঠিক রাখা, অন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং শরীরের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষায় এই ফলের ভূমিকা ধীরে ধীরে নতুন করে আলোচনায় আসছে। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাকালে বোঝা যায়, গ্রামবাংলার এই সাধারণ ফলটি আদতে বেশ অসাধারণ।
চালতা বা চালিতা বা চাইলতে বৈজ্ঞানিকভাবে Dillenia indica- নামে পরিচিত। একে ইংরেজি বলে Elephant Apple। এলিফ্যান্ট অ্যাপল বা চালতা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে ভালো জন্মায়। এটি বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশে জন্মে। নদীবিধৌত এলাকা, বনাঞ্চল কিংবা গ্রামীণ পরিবেশে এই গাছ সহজেই বেড়ে ওঠে। গাছটি মাঝারি আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। এ গাছে উচ্চতা ১৫ মিটার পর্যন্তও হতে পারে। গাছের গায়ে থাকে লালচে রঙের চকচকে বাকল। পাতার কিনারা থাকে খাঁজ কাটা এবং শিরা হয় উঁচু সমান্তরাল। চালতার ফুল হয় সাদা রঙের,যা দেখতে খুব সুন্দর এবং সুগন্ধযুক্ত। ফুলের ব্যাস প্রায় ১৫-১৮ সেন্টিমিটার। বছরের মে-জুন মাস এ ফুল ফোটার মৌসুম। ফল পাকলে খোসা শক্তই থাকে, ভেতরের শাঁস হয় নরম, রসালো ও টক। এই টক স্বাদই একে রান্না, ভর্তা, চাটনি কিংবা ভেষজ প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে উপযোগী এবং অনেকের প্রিয় গড়ে তুলেছে। বহু অঞ্চলে মাছের ঝোল, ডাল কিংবা মাংসের রান্নায় এই ফলের ব্যবহার দীর্ঘদিনের রীতি। তাছাড়া পাকা ফল পিষে নুন-লংকা দিয়ে মাখালে তা খেতে বেশ লোভনীয় হয়।
এলিফ্যান্ট অ্যাপলের টক স্বাদ কোনো কাকতালীয় কিছু নয়। এতে প্রাকৃতিকভাবে থাকা জৈব অ্যাসিড, বিশেষ করে সাইট্রিক ও অন্যান্য হালকা অ্যাসিড হজমপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অ্যাসিডগুলো পাকস্থলীর হজমরসের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে, ফলে খাবার ভাঙার প্রক্রিয়া সহজ হয়। অনেক সময় ভারী খাবার খাওয়ার পর যে অস্বস্তি, গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা দেখা দেয়, তার পেছনে মূল কারণ হলো হজম এনজাইমের অসমতা। টক ফল হিসেবে এলিফ্যান্ট অ্যাপল বা চালতা পাকস্থলীতে হালকা উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা হজম এনজাইম নিঃসরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
হজমে সহায়ক হওয়ার পেছনের কারণগুলো :
১. চালতার শাঁসে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যআঁশ বা ফাইবার রয়েছে। এই ফাইবার অন্ত্রের ভেতরে খাবারের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় থাকে।
২. নিয়মিত হালকা টক ফল খেলে অন্ত্রের ভেতরের উপকারী জীবাণুর কার্যকারিতা বাড়তে পারে। চালতার মতো ফল অন্ত্রের পরিবেশকে এমনভাবে সহায়তা করে, যাতে হজমপ্রক্রিয়া আরও মসৃণ হয়।
৩. দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যাভ্যাসে তেল-মশলা ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। এমন খাবারের সঙ্গে চালতার মতো টক উপাদান যুক্ত হলে খাবারের ভারসাম্য রক্ষা হয় এবং পাকস্থলীর ওপর চাপও কম পড়ে।
তাছাড়া চালতার টক স্বাদ মুখে লালা নিঃসরণ বাড়ায়। লালার এনজাইম খাবার হজমের প্রথম ধাপ শুরু করে দেয়। এই প্রক্রিয়া যত ভালোভাবে শুরু হয়, পুরো হজমব্যবস্থাও তত কার্যকর হয়। এটি কোনো ওষুধ নয়, কোনো তাৎক্ষণিক সমাধানও নয়। তবে নিয়মিত ও পরিমিতভাবে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে, হজমব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। হজমে সহায়ক হওয়ার পাশাপাশি এতে থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।যেমন-
⇨ হালকা ডিটক্স প্রভাব: টক ফল শরীরের ভেতরের অতিরিক্ত বর্জ্য পদার্থ বের হতে সহায়তা করে।
⇨ ক্ষুধা উদ্দীপনা: যারা দীর্ঘদিন ক্ষুধামান্দ্যে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ফল স্বাভাবিক ক্ষুধা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
⇨ তাপমাত্রার ভারসাম্য: গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই ফল শরীরকে হালকা শীতল অনুভূতি দিতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুতে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ফলের ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন রকম। কোথাও এটি দিয়ে টক ঝোল, কোথাও ভর্তা, আবার কোথাও শুকিয়ে মশলা মিশিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। মাছের ঝোল বা ডালে এই ফল যোগ করলে খাবারের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি হজমের সুবিধাও তৈরি হয়।শহুরে রেস্তোরাঁয় এখনো এলিফ্যান্ট অ্যাপলের তেমন দেখা না মিললেও, ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।
রোপনের সময়:
বর্ষার পর থেকে শীতকাল পর্যন্ত এই ফল পাওয়া যায়। পাকা ফলের বীজ থেকে তৈরি করা যায় চারা। গাছে ফল পাকলে, না পাড়া হলে সে ফল থেকে বীজ মাটিতে আপনাআপনি ঝরে পড়ে, সেখানে চারা গজায়। এজন্য চালতা তলায় ছোট ছোট আরও অনেক চারা দেখা যায়। বীজ থেকে করা চারার গাছ ফল ধরতে ৬-৭ বছর সময় লেগে যায়।এই গাছ বাঁচে প্রায় ২৫-৩০ বছর। শাখা কলম বা কাটিং করেও চালতার চারা তৈরি করা যায়। কলমে ফল ধরে দ্রুত।
গুনাগুণ:
⇨ বাতের ব্যথার জন্য, কচি চালতার রস পানির সাথে মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়।
⇨ রক্ত আমাশয়ের জন্য চালতার কচি পাতার রস উপকার।
⇨ ঠান্ডা লাগলে বা জ্বর হলে চালতার রস অনেক উপকারে আসে।
⇨ কফ ও সর্দির জন্য গাছের ছালের গুঁড়া নিরাময়ের কাজ করে।
তাছাড়াও মুখে ঘা কিংবা চামড়া উঠে গেলে এটি খেলে তাড়াতাড়ি সারে।কারণ, এতে আছে ভিটামিন সি ও প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিক্সিডেন্ট।
সতর্কতা:
অনেক উপকারী পুষ্টিগুণ সম্পুর্ন হলেও যেকোনো টক ফলের মতোই চালতাও অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত টক উপাদান পাকস্থলীর সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই এটি খাবারের অংশ হিসেবে, পরিমিতভাবে গ্রহণ করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। এছাড়া এই ফলকে কোনো অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের একটি সহায়ক উপাদান মাত্র।
চালতা আমাদের চারপাশে থাকা এক অবহেলিত ফল। শহুরে ফলের ঝলকানিতে হারিয়ে যাওয়া এই টক ফল আসলে দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি আর আধুনিকতার দৌড়ে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, সুস্থতার অনেক সমাধান আমাদের মাটিতেই জন্মায়। এলিফ্যান্ট অ্যাপল বা চালতা তারই একটি উদাহরণ।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।