{{ news.section.title }}
চাপ ও হতাশার সময়ে একজন মুসলিমের করণীয় কী?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে অনলাইন ভুল তথ্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় বুলিং এবং সামাজিক চাপের কারণে কিশোর ও তরুণরা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জীবিকার অনিশ্চয়তাও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চাকরি না পাওয়া ও আর্থিক অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ (chronic stress) বিশেষ করে ছেলেদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াচ্ছে, এমন তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সীমিত মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার কারণে সমস্যা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা আমাদের জীবনের এক অনাকাঙ্ক্ষিত অংশ। এটি কখনও আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব হতে পারে, আবার কখনও রহমতও হতে পারে। শাইখুল ইসলাম তাকী উসমানী বলেছেন, যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়ার পর তোমার গুনাহ বেড়ে যায় এবং আমল কমে যায়, তাহলে এটি ইঙ্গিত যে কষ্ট আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব। অন্যদিকে, যদি তোমার আমল বেড়ে যায় এবং গুনাহ কমে যায়, তাহলে এই পেরেশানিটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। মূলত এর মাধ্যমে তিনি তোমার মর্যাদা বাড়ান অথবা গুনাহ মাফ করে দেন।
দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ এবং ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কার্যকর কিছু আমল বলেছেন প্রখ্যাত আলেম ও আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমাদুল্লাহ।
তিনি বলেন, মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য প্রথমেই ইমান ও তাকওয়াকে মজবুত করতে হবে। যার ইমান দুর্বল, সে সহজেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, আর যার ইমান শক্তিশালী, দুশ্চিন্তা তাকে কম স্পর্শ করে। আমাদের মনে রাখতে হবে - যত সমস্যাই হোক, আল্লাহ তা'আলা তা দেখবেন। আল্লাহ তা'আলা আছেন, তার ওপর আমাদের পূর্ণ ভরসা থাকবে। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, এই সমস্যার সমাধান হবেই ইনশাআল্লাহ। আর যদি কিছু না হয়, আমাদের আখেরাত সব সময় সামনে আছে। এজন্য ইমানদার কখনো ডিপ্রেশন হয়ে ভেঙে পড়বে না। ইমান মজবুত রাখলেই আমরা দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে পারি।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পেরেশানি বা কষ্ট মোকাবিলার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দোয়া শিখিয়েছেন। এক হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এমন একটি দোয়া আমি জানি, যা কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি পাঠ করলে মহান আল্লাহ তার সেই বিপদ দূর করে দেন। এটি হলো আমার ভাই ইউনুস (আ.)-এর দোয়া।
দোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল, যা যে কোনো সময় এবং যে কোনো স্থানে পড়া যেতে পারে। এ ছাড়া পেরেশানি থেকে মুক্তির জন্য দরুদ, ইসতেগফার এবং দোয়ায়ে ইউনুসএই তিনটি আমল পরীক্ষিত ও কার্যকর। যে কোনো ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপ থেকে বাঁচার জন্য এগুলো এক ধরনের মনকে শান্ত করার উপায় হিসেবে কাজ করে। দোয়াটি -
আরবিঃ
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ، إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণঃ লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বালিমিন।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিঃসন্দেহে আমি নিজের প্রতি অবিচার করেছি। (তিরমিজি: ৩৫০৫)
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট বা চিন্তা, অস্থিরতা তথা হতাশাগ্রস্ত হতেন তখন বলতেন,
আরবিঃ
يَا حَيُّ يَا قَيُّوْمُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيْثُ
উচ্চারণঃ ইয়া- হাইয়ু ইয়া- ক্বাইয়ূ-মু বিরাহমাতিকা আস্তাগিছ।
অর্থঃ হে চিরঞ্জীব! হে চিরস্থায়ী! আপনার রহমতের মাধ্যমে আপনার নিকটে সাহায্য চাই। (তিরমিজি)
দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আল্লাহ তা'আলার কাছে সাহায্য চাওয়া। আবু সাঈদ আল-খুদরি (র) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আবু উমামাহ নামক এক আনসারি সাহাবিকে সেখানে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু উমামাহ, নামাজের সময় ছাড়া তুমি মসজিদে কেন বসে আছ?” আবু উমামাহ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি সীমাহীন দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝার কারণে এভাবে বসে আছি।”
রাসুল (স) তাকে বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন কিছু বাক্য শিখিয়ে দেব না, যা তুমি বললে আল্লাহ তোমার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তোমার ঋণেরও ব্যবস্থা করে দেবেন?” আবু উমামাহ বললেন, “হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল।” এরপর রাসুল (স) তাকে সকাল এবং সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট দোয়া পড়ার নির্দেশ দিলেন।
আবু উমামাহ (র) বলেন, “আমি সেই দোয়া মেনে চললাম। ফলশ্রুতিতে মহান আল্লাহ আমার দুশ্চিন্তা দূর করলেন এবং আমার ঋণেরও সমাধান করে দিলেন।”
(আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৫৫)
দোয়াটি হলো
আরবিঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ العَجزِ وَالكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الجُبنِ وَالبُخلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ غَلَبَةِ الدَّينِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আজজি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজুবিকা মিন গলাবাতিদ দাইনি ওয়া কহরির রিজাল।
অর্থঃ হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে আশ্রয় চাই। আমি আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, আপনার কাছে আশ্রয় চাই ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই ঋণের বোঝা ও মানুষের রোষানল থেকে।
দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমানোর উপায়
কোরআন তেলাওয়াত
হতাশা ও মানসিক চাপ কমাতে কোরআন তেলাওয়াতের বিকল্প নেই। মহান আল্লাহর মধুর বাণী মানুষের মনকে শান্তি ও প্রফুল্লতা প্রদান করে। কোরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তরের আনন্দ ও মানসিক প্রশান্তির অন্যতম উৎস। এর মাধ্যমে মানুষ দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে মুক্তি পায় এবং মন ও আত্মা প্রশান্ত থাকে। কোরআন তেলাওয়াত যদি পড়তে না পারেন, কোরআন শুনে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।
নামাজে মনোযোগী হওয়া
বিপদ, মুসিবত বা পেরেশানির সময় নামাজের মাধ্যমে প্রকৃত শান্তি ও প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব। কারণ নামাজের মাধ্যমেই বান্দা মহান আল্লাহর সাহায্য লাভ করেন। তাই মানসিক প্রশান্তি অর্জনের জন্য নামাজে মনোযোগী থাকা অত্যন্ত জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন,
"তোমরা নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে আমার সাহায্য প্রার্থনা কর। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব। (সুরা বাকারা ৪৫)"
হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতেন তখন নামাজ আদায় করতেন। (আবু দাউদ)
নবীজির প্রতি দরুদ পড়া
মহান আল্লাহর রহমত পাওয়ার একটি কার্যকর আমল হলো নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠ করা। আল্লাহর রহমত মানুষের মনকে সমস্ত মানসিক চাপ থেকে মুক্ত রাখে এবং আত্মপ্রশান্তি দেয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদ এমন একটি ইবাদত, যা মহান আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন। হাদিসে এসেছে,
হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বর্ণনা করেন, আমি বললাম,
"হে আল্লাহর রসুল, আমি আপনার ওপর অনেক বেশি দরুদ পড়তে চাই। আপনি বলে দেন আমি দরুদে কতটুকু সময় দেব? তিনি বললেন- তুমি যতটুকু চাও। আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। যদি আরো বাড়াও তা তোমার জন্যে ভালো। আমি বললাম, অর্ধেক সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু সময় পড়তে পার, যদি এর চেয়ে আরো সময় বাড়াও তোমার জন্যে ভালো। আমি বললাম, তাহলে সময়ের দুই তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও, যদি আরো বাড়াও তোমার জন্যে ভালো। আমি বললাম, সম্পূর্ণ সময় আমি আপনার ওপর দরুদ পড়ে কাটিয়ে দেব। তখন তিনি বললেন, তাহলে এখন হতে তোমরা পেরেশানি দূর হওয়ার জন্য দরুদই যথেষ্ট এবং তোমার পাপের কাফফারার জন্য দরুদই যথেষ্ট। (তিরমিজি)"
তাকদিরে বিশ্বাস করা
একজন মুমিন ব্যক্তি সুখ-দুঃখ সব সময়ই তাকদিরের ওপর বিশ্বাস করে। আর দুঃখ-হতাশা, অভাব-অনটন, বিপদ-আপদে তাকদিরের উপর বিশ্বাস থাকলে কোনো মানুষই মানসিক চাপ অনুভব করে না। যে কোনো চাপের সময় মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাকদিরের ওপর ছেড়ে দেয়ায় রয়েছে মানসিক প্রশান্তি। মহান আল্লাহ বলেন,
"আল্লাহ তোমাদের কষ্ট দিলে তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা মোচন করতে পারে না। আর আল্লাহ যদি তোমার মঙ্গল চান, তাহলে তার অনুগ্রহ পরিবর্তন করারও কেউ নেই। (সুরা ইউনুস, আয়াত: ১০৭)"
এভাবেই আল্লাহর প্রতি ধৈর্য, বিশ্বাস ও আমলের সমন্বয়ে একজন মানুষ কঠিন সময় অতিক্রম করতে পারে। জীবনের ঝড় যতই তীব্র হোক, আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে দৃঢ়তা দেয় এবং ভাঙা মনকে নতুন আশায় উজ্জীবিত করে। দুশ্চিন্তা তখন আর বোঝা হয়ে থাকে না, বরং হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নয়নের পথ। শেষ পর্যন্ত যে হৃদয় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করে।