{{ news.section.title }}
থাই বাজারে বাংলাদেশি কসমেটিকস, বাড়ছে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা
একসময় বাংলাদেশের প্রসাধনী বাজারে থাই কসমেটিকসের আধিপত্য ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। এখন উল্টো থাইল্যান্ডের বাজারেই জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশে উৎপাদিত স্কিন কেয়ার ও কসমেটিকস পণ্য। এমনকি থাই নারীদের সৌন্দর্যচর্চায়ও ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন প্রসাধনী।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য তৈরির সক্ষমতারও বড় স্বীকৃতি।
জানা গেছে, থাইল্যান্ডের স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশটির জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম লাজাদা থাইল্যান্ড এবং বিভিন্ন ফার্মেসিতে এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্লোবাল ব্র্যান্ডের স্কিন কেয়ার ও কালার কসমেটিকস পণ্য বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় আমদানিকারক ও পরিবেশকদের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশটির বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে।
থাইল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশকরা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক উপাদানসমৃদ্ধ স্কিন কেয়ার ও কসমেটিকস পণ্যের প্রতি দেশটির ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। উন্নত মান, কার্যকারিতা এবং তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে বাংলাদেশি পণ্য ধীরে ধীরে থাই বাজারে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের কসমেটিকস শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের কাঁচামাল, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এবং উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থার ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনে সক্ষম। এর ফলে একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমছে, অন্যদিকে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজারও উন্মুক্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া হালাল সার্টিফিকেশন, জিএমপি (GMP) সনদ এবং গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের প্রসাধনী শিল্পের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই অগ্রযাত্রার অন্যতম অংশীদার রিমার্ক এইচবি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত নিওর, সিওডিল এবং লিলি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন স্কিন কেয়ার ও কালার কসমেটিকস বর্তমানে থাইল্যান্ডসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে।
সিওডিল ব্র্যান্ডের পরিচালক সুকান্ত কুমার দাস বলেন, থাইল্যান্ডে তাদের স্কিন কেয়ার ও কসমেটিকস পণ্যের প্রতি ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রসাধনী উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বর্তমানে থাইল্যান্ড ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে উৎপাদিত কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বিউটি ও পার্সোনাল কেয়ার শিল্পে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশের (এএসবিএমইবি) সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দীন বলেন, থাইল্যান্ডের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশি স্কিন কেয়ার ও কসমেটিকস পণ্যের প্রবেশ দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, গবেষণা কার্যক্রম এবং মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারলে এ খাতের রপ্তানি আরও সম্প্রসারিত হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব আলী বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি পোশাকনির্ভর। কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের মতো উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী শিল্পের বিকাশ রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। থাইল্যান্ডের মতো বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের উপস্থিতি দেশের ব্র্যান্ড ইমেজকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করবে।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) সহসভাপতি এম এস সিদ্দিকী বলেন, বিশ্ববাজারে কসমেটিকস ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্যের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারের নীতিগত সহায়তা, রপ্তানি প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কসমেটিকসের চাহিদা বাড়লেও দেশের ভ্যাট ও করনীতিসহ বিভিন্ন নীতিগত বৈষম্যের কারণে এ শিল্পের বিকাশ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। তারা মনে করেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ভ্যাট ও কর কাঠামোর সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।