এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা জারি

এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা জারি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য নতুন বদলি নীতিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন নীতিমালা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক প্রথম নিয়োগের পর অন্তত দুই বছর চাকরি সম্পন্ন করলে বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। একইসঙ্গে একজন শিক্ষক তার পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার বদলির সুযোগ পাবেন।

 

বদলি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত বেসরকারি মাদরাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল বদলি ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ কারণে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত একটি নীতিমালার আওতায় এনটিআরসিএর সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ নীতিমালা দেশের সব বেসরকারি মাদরাসায় কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

 

শূন্য পদ প্রকাশ ও আবেদন প্রক্রিয়া

মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শূন্য পদের তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করবে। প্রকাশিত শূন্য পদের বিপরীতে বদলির আবেদন আহ্বান করা হবে। সমপদে শূন্যপদ থাকলে সরকার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রতি বছর আবেদন গ্রহণ, বদলির আদেশ প্রদান এবং নতুন কর্মস্থলে যোগদানের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

 

কোথায় আবেদন করা যাবে

একজন শিক্ষক তার চাকরির আবেদনে উল্লিখিত নিজ জেলার পাশাপাশি পারিবারিক সুবিধা বিবেচনায় দেশের অন্য যেকোনো জেলায় বদলির আবেদন করতে পারবেন। তবে শুধুমাত্র সমমান বা সমস্তরের মাদরাসার একই পদে বদলির আবেদন করার সুযোগ থাকবে।

 

একাধিক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার

একটি শূন্য পদের বিপরীতে একাধিক আবেদন জমা পড়লে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে-

  • নারী প্রার্থী হওয়া
  • বর্তমান কর্মস্থলের দূরত্ব
  • স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থল (সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান)
  • চাকরির জ্যেষ্ঠতা


জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে সর্বশেষ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার আলোকে। যদি প্রতিযোগী আবেদনকারীদের কর্মস্থল একই উপজেলায় হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার কেন্দ্র থেকে প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব হিসাব করা হবে। আবেদনকারীরা ভিন্ন উপজেলার হলে জেলা সদর থেকে দূরত্ব গণনা করা হবে। আর ভিন্ন জেলার ক্ষেত্রে বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রকে ভিত্তি ধরে দূরত্ব নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত মডেল অনুসরণ করা হবে।

 

ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল

নীতিমালায় বলা হয়েছে, অসম্পূর্ণ কিংবা ভুল তথ্যযুক্ত আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান প্রমাণিত হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বদলি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অবশিষ্ট শূন্যপদে নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ সুপারিশ চূড়ান্ত করবে।

 

একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে কতজন বদলি হতে পারবেন

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বছরে সর্বোচ্চ দুইজন শিক্ষক বদলির সুযোগ পাবেন। তবে একই বিষয়ে একাধিক শিক্ষককে একসঙ্গে বদলির অনুমতি দেওয়া হবে না, যেখানে বিষয়টি প্রযোজ্য।

 

পছন্দের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা

বদলির আবেদন করার সময় একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ তিনটি কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করতে পারবেন।নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর অন্তত দুই বছর দায়িত্ব পালন না করলে পরবর্তী বদলির জন্য আবেদন করা যাবে না। এছাড়া জনস্বার্থে সরকার প্রয়োজনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

 

বদলির আবেদন নিষ্পত্তির কর্তৃপক্ষ

মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মাধ্যমে বদলির আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে। পুরো কার্যক্রম সফটওয়্যারভিত্তিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের অনুমোদনের ভিত্তিতে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরি এবং অনলাইন আবেদন ফরমের কাঠামো নির্ধারণ করবে। বদলিকৃত শিক্ষকের ইনডেক্স নম্বর অনলাইনের মাধ্যমে আগের প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হবে। একইসঙ্গে এমপিও সুবিধা, অন্যান্য আর্থিক প্রাপ্যতা এবং চাকরির জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা বহাল থাকবে।

 

বদলির পর করণীয়

বদলির আদেশ জারির ১০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে শিক্ষককে অবমুক্ত করতে হবে। অবমুক্তির পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান বাধ্যতামূলক। যোগদানের তথ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে অনলাইনের মাধ্যমে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান এবং মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানাতে হবে। অবমুক্তির তারিখ থেকে নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগদান পর্যন্ত সময় চাকরির ধারাবাহিক কর্মকাল হিসেবে গণ্য হবে। তবে যেসব শিক্ষকের স্টপ পেমেন্ট, সাময়িক বরখাস্ত বা কোনো ফৌজদারি মামলা চলমান থাকবে, তারা বদলির জন্য বিবেচিত হবেন না।

 

২০২৪ সালের নীতিমালা বাতিল

নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে জারি করা ‘স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা (মাদরাসা) প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এনটিআরসিএ সুপারিশপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা-২০২৪’ বাতিল বলে গণ্য হবে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নীতিমালায় পরিবর্তন, সংযোজন, সংশোধন বা ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের হাতে থাকবে।

 

বৈষম্যের অভিযোগ জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের

নতুন বদলি নীতিমালায় শুধুমাত্র এনটিআরসিএর সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ মাদরাসা জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি হারুন অর রশিদ এবং মহাসচিব ফিরোজ আলম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, নীতিমালায় কেবল সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বদলির সুযোগের কথা বলা হয়েছে। অথচ স্কুল ও কলেজের বদলি নীতিমালায় সব শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ সিদ্ধান্তের ফলে মাদরাসা খাতের বহু শিক্ষক বৈষম্যের শিকার হবেন। তাই সংগঠনের পক্ষ থেকে তারা এ নীতিমালার প্রতি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।


সম্পর্কিত নিউজ