ব্রাজিলে দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল সংগীতশিল্পী অলিভার ট্রি

ব্রাজিলে দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল সংগীতশিল্পী অলিভার ট্রি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন সংগীতশিল্পী, গীতিকার এবং ইন্টারনেট তারকা অলিভার ট্রি (Oliver Tree) ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৩২ বছর। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার সকালে রিও ডি জেনেইরোর পশ্চিমাঞ্চলীয় রেক্রেইও দোস বান্দেইরান্তেস এলাকায় আকাশে দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হলে সেগুলো ভূপাতিত হয়। দুর্ঘটনায় দুটি হেলিকপ্টারে থাকা মোট ছয়জনের সবাই নিহত হন।

ব্রাজিলের জরুরি সেবা ও দমকল বিভাগ জানিয়েছে, সংঘর্ষের পর একটি হেলিকপ্টার একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির ডিলারশিপের পার্কিং এলাকায় আছড়ে পড়ে। এতে সেখানে পার্ক করে রাখা প্রায় ২০টি বৈদ্যুতিক গাড়িতে আগুন ধরে যায়। পরে দমকলকর্মীরা দীর্ঘ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। দুর্ঘটনার কারণ জানতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে ব্রাজিলের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ।

 

প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত যাত্রী তালিকায় অলিভার ট্রির নাম থাকলেও দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কারণে নিহতদের অনেকের মরদেহ পুড়ে যাওয়ায় আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে ব্রাজিলের পুলিশ সূত্র এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, নিহতদের মধ্যে অলিভার ট্রি ছিলেন।

 

দুর্ঘটনায় নিহত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন আর্জেন্টাইন ইউটিউবার গাসপার প্রিম (গ্যাসপি), একজন ব্রাজিলীয় সংগীত প্রযোজক এবং কয়েকজন বিমানচালক ও যাত্রী। গ্যাসপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ অনুসারী ছিল এবং লাতিন আমেরিকার তরুণদের মধ্যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন।

 

অলিভার ট্রি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিকল্প পপ, ইলেকট্রনিক, রক এবং ইন্টারনেট সংস্কৃতির এক ব্যতিক্রমী মুখ হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার অদ্ভুত বোল-স্টাইল চুল, রঙিন পোশাক এবং ব্যঙ্গাত্মক মঞ্চ ব্যক্তিত্ব তাকে অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা পরিচিতি দেয়। সংগীতের পাশাপাশি তিনি নিজেই তার অনেক মিউজিক ভিডিও পরিচালনা করতেন এবং কমেডি ঘরানার কনটেন্টও তৈরি করতেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্রুজে জন্ম নেওয়া অলিভার ট্রির পুরো নাম ছিল অলিভার ট্রি নিকেল। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব আর্টস থেকে সংগীত প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সংগীত জীবনের শুরুর দিকে বিভিন্ন স্বাধীন প্রকল্পে কাজ করলেও ২০১৬ সালে “When I'm Down” গানটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে আটলান্টিক রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে মূলধারার সংগীত জগতে প্রবেশ করেন।

 

বিশ্বব্যাপী তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে “Life Goes On”, “Miss You”, “Alien Boy”, “When I'm Down”, “Hurt” এবং “Cowboys Don't Cry”। বিশেষ করে “Life Goes On” এবং “Miss You” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক, ইউটিউব ও স্পটিফাইয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। “Miss You” গানটি জার্মান ডিজে ও প্রযোজক রবিন শুলৎসের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি হয় এবং যুক্তরাজ্যের সিঙ্গেলস চার্টে তৃতীয় স্থান পর্যন্ত উঠেছিল। ২০২৪ সালে এই গানটির জন্য তিনি ব্রিট অ্যাওয়ার্ডের আন্তর্জাতিক গানের বিভাগে মনোনয়নও পান।

 

স্পটিফাইয়ে অলিভার ট্রির মাসিক শ্রোতার সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখেরও বেশি ছিল। তার একাধিক গান শত শত মিলিয়নবার স্ট্রিম হয়েছে। “Life Goes On” একাই বিশ্বের বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শত কোটি শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে এবং অসংখ্য দেশে চার্টে স্থান পেয়েছে।

 

সংগীতের বাইরেও অলিভার ট্রি বিভিন্ন অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচনায় থাকতেন। ২০২০ সালে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কিক স্কুটার তৈরি করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছিলেন। প্রায় ৪.১৬ মিটার উচ্চতা ও ৩.১৩ মিটার দৈর্ঘ্যের ওই স্কুটার নিয়ে তিনি বিশেষ প্রদর্শনীও করেন। পরে তিনি জানান, এটি ছিল তার দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণের প্রচেষ্টা।

 

মৃত্যুর আগে অলিভার ট্রি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় বিশ্ব সফরে ছিলেন। সাতটি মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশে ৭০টির বেশি কনসার্ট করার পরিকল্পনা ছিল তার। জুনের শুরুতে তিনি আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে পারফর্ম করেন। এরপর ব্রাজিলে কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। দুর্ঘটনার মাত্র একদিন আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাজিলের একটি এলাকায় ফুটবল খেলার ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন, যা এখন তার শেষ পোস্ট হিসেবে ভাইরাল হয়েছে।

 

সংগীত জগতে অলিভার ট্রিকে অনেকেই এক প্রজন্মের সবচেয়ে সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী শিল্পীদের একজন হিসেবে বিবেচনা করতেন। পপ, রক, ইলেকট্রনিক ও ইন্টারনেট সংস্কৃতির মিশেলে তিনি নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন। অনেক শিল্পী, ইউটিউবার এবং সংগীত সমালোচকও তার অকাল মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

 

মাত্র ৩২ বছর বয়সে অলিভার ট্রির এই আকস্মিক মৃত্যু বিশ্ব সংগীত অঙ্গনের জন্য বড় একটি ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি উজ্জ্বল ও সৃজনশীল ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থাতেই তার জীবনাবসান ঘটল। তবে তার গান, ব্যতিক্রমী শিল্পসত্তা এবং কোটি ভক্তের হৃদয়ে গড়ে তোলা স্মৃতি তাকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।


সম্পর্কিত নিউজ