সিনেমায় ভারতীয়দের জয়, কিন্তু শুটিংয়ে পাল্টে গিয়েছিল বাজি- ‘লগান’-এর অজানা গল্প

সিনেমায় ভারতীয়দের জয়, কিন্তু শুটিংয়ে পাল্টে গিয়েছিল বাজি- ‘লগান’-এর অজানা গল্প
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন কিছু সিনেমা আছে, যেগুলো সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যায়। পরিচালক আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘লগান’ সেই বিরল তালিকার অন্যতম। ২০০১ সালের ১৫ জুন মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্র শুধু বক্স অফিসে সাফল্যই পায়নি, বরং ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন মর্যাদা এনে দিয়েছিল।

ক্রিকেট, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম, প্রেম, আত্মবিশ্বাস এবং সম্মিলিত লড়াই-সবকিছুর এক অনন্য মিশ্রণ ছিল ‘লগান’। মুক্তির ২৫ বছর পরও ছবিটির জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও এখনও ভুবন, গৌরী, কাচরা কিংবা ক্যাপ্টেন রাসেলের গল্পে মুগ্ধ হন।

 

সিনেমার গল্পের পেছনের আরেক গল্প

পর্দায় ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে চম্পানের কৃষকদের জয়ের গল্প দেখানো হলেও বাস্তবে শুটিং চলাকালে একদিন ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিনেতাদের মধ্যে আয়োজিত ক্রিকেট ম্যাচে ঘটেছিল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।

 

ছবির শুটিংয়ের সময় ভারতীয় ও ব্রিটিশ শিল্পীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কারণ ছবির কাহিনি অনুযায়ী ব্রিটিশদের শেষ পর্যন্ত হারতে হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে ইংরেজ অভিনেতাদের অনেকেই ছিলেন দক্ষ ক্রিকেটার। কেউ ক্লাব পর্যায়ে খেলেছেন, আবার কেউ কাউন্টি ক্রিকেটের অভিজ্ঞতাও রাখতেন। ফলে সিনেমার শুটিং চলাকালেই তারা বারবার একটি বাস্তব ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের দাবি তুলতে থাকেন। দীর্ঘদিন সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে থাকলেও অবশেষে ২০০০ সালের ২৬ মার্চ আয়োজন করা হয় বহুল আলোচিত সেই ‘গ্রাজ ম্যাচ’।

 

আমির বনাম ব্রিটিশ একাদশ

ম্যাচটিতে ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দেন আমির খান। তাঁর দলে ছিলেন অভিনেতা, সহকারী পরিচালক, ক্যামেরা ক্রু, লাইটম্যান, আর্ট বিভাগের কর্মী এবং অন্যান্য ইউনিট সদস্যরা। অন্যদিকে ব্রিটিশ দলে ছিলেন ছবিতে ইংরেজ ক্রিকেটারদের চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীরা।

 

মজার বিষয় হলো, কয়েকজন ব্রিটিশ খেলোয়াড় অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের দলে খেলোয়াড়সংখ্যা কমে যায়। তখন ভারতীয় দল থেকেই কাচরা চরিত্রে অভিনয় করা আদিত্য লাখিয়াকে প্রতিপক্ষ দলে খেলতে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই মজা করে তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে ডাকতে শুরু করেন সহকর্মীরা। মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচের আবহ তৈরি করতে স্কোরবোর্ড, ধারাভাষ্য, দর্শক এবং আনুষ্ঠানিক টসের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

 

বাস্তবের মাঠে টিকতে পারল না চম্পানের দল

সিনেমায় ভুবনের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল চম্পান। কিন্তু বাস্তবের ক্রিকেট ম্যাচে ভারতীয় দল দ্রুত বুঝতে পারে বাস্তবতা ভিন্ন। ব্রিটিশ দলের অনেক সদস্য নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। ফলে ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং-সব বিভাগেই তারা ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী।

 

অন্যদিকে ভারতীয় ইউনিটের অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন অপেশাদার ক্রিকেটার। ফলাফলও আসে একতরফাভাবে। ব্রিটিশরা সহজেই ম্যাচ জিতে নেয়। সিনেমায় যারা পরাজিত হয়েছিল, বাস্তবের মাঠে তারাই শেষ হাসি হেসেছিল। তবে পরাজয়ের পরও ভারতীয় দল ক্রীড়াসুলভ আচরণ করে প্রতিপক্ষকে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানায়। পরে অনেক শিল্পী জানিয়েছেন, এই ম্যাচ দুই দলের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় করেছিল।

 

সাত ঘণ্টার ‘লগান’

আজকের দর্শকরা যে সংস্করণটি দেখেন, সেটি তৈরি করতে নির্মাতাদের বিশাল পরিশ্রম করতে হয়েছিল। শুরুতে ছবিটির প্রথম কাটের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা। পরে দীর্ঘ সম্পাদনার মাধ্যমে সেটিকে কমিয়ে ৩ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে আনা হয়। এত দীর্ঘ সময়ের চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখার ঘটনা তখন বলিউডে বিরল ছিল।

 

ভুবনের লুকে ব্যক্তিগত ছোঁয়া

ভুবন চরিত্রকে বাস্তবসম্মত করে তুলতে আমির খান নিজের লুক নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। জানা যায়, ছবিতে তিনি তাঁর তৎকালীন স্ত্রী রীনা দত্তের কানের দুল ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়া গ্রামের যুবকের চরিত্রকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের পোশাক ও অলঙ্কার নিয়ে আলাদা গবেষণাও করা হয়েছিল। তবে একটি বিষয় নিয়ে পরে আফসোস করেছিলেন আমির। তাঁর মতে, দীর্ঘ খরার মধ্যে বসবাস করা একজন কৃষকের প্রতিদিন দাড়ি কামানোর সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু বিভিন্ন দাড়িওয়ালা লুক পরীক্ষা করেও সন্তোষজনক ফল না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ক্লিন-শেভড লুকই রাখা হয়েছিল।

 

এক শিডিউলে শেষ হয়েছিল পুরো সিনেমা

‘লগান’-এর পুরো শুটিং সম্পন্ন হয়েছিল একটানা একটি শিডিউলে। মাঝখানে কোনো বিরতি রাখা হয়নি। সে সময় অনেকেই এই পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন। কিন্তু নির্মাতাদের মতে, একটানা শুটিং করার ফলে চরিত্রগুলোর আবেগ ও ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়েছিল।

 

‘চলে চলো’ গানের অজানা গল্প

ছবির অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘চলে চলো’ প্রথমে অন্য নামে লেখা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে গানের লাইন ছিল ‘নাশা নাশা’। কিন্তু গীতিকার জাভেদ আখতার মনে করেছিলেন, দুর্ভিক্ষ ও খরায় জর্জরিত একটি গ্রামের মানুষ নেশা নিয়ে গান গাইবে-এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। পরে গানটির নতুন সংস্করণ তৈরি হয়, যা আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম অনুপ্রেরণামূলক গান হিসেবে বিবেচিত।

 

গুজরাট ভূমিকম্পের সঙ্গে অদ্ভুত সংযোগ

ছবিটির অধিকাংশ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলে। শুটিং শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পর ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভয়াবহ ভূমিকম্পে ভূজ ও আশপাশের এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ‘লগান’-এ দেখা বহু লোকেশন পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

 

প্রযুক্তিগতভাবেও যুগান্তকারী

‘লগান’ শুধু গল্প বা অভিনয়ের জন্য নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে। প্রায় ৩০ বছর পর বলিউডে বড় পরিসরে সিঙ্ক-সাউন্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় এই ছবিতে। অর্থাৎ শুটিংয়ের সময়ই সংলাপ রেকর্ড করা হয়েছিল।

এ জন্য জার্মানি থেকে বিশেষ ক্যামেরা ও অডিও সরঞ্জাম আনা হয়েছিল। টেবিল টেনিসেও জমেছিল লড়াই ক্রিকেটের পাশাপাশি ইউনিটে আরেকটি প্রতিযোগিতা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

 

ব্রিটিশ অভিনেতা ব্যারি হার্টের উদ্যোগে দুই সপ্তাহব্যাপী টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। ১৬টি ডাবলস দল অংশ নেয় সেখানে। প্রতিটি দলে একজন ভারতীয় এবং একজন ব্রিটিশ সদস্য ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আদিত্য লাখিয়া ও ক্রিস ইংল্যান্ড জুটি শিরোপা জিতে নেয়।

 

চম্পানের কুঁড়েঘরে এসি!

পর্দায় গ্রামটিকে যতটা বাস্তব মনে হয়েছে, নির্মাণের পেছনে ছিল ততটাই আধুনিক পরিকল্পনা। গুজরাটের মরুভূমিতে সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল চম্পান গ্রামের সেট। বাইরে থেকে কুঁড়েঘর মনে হলেও অধিকাংশ ঘরেই ছিল এয়ারকন্ডিশনার, বিশ্রামাগার এবং আধুনিক সুবিধা। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় শুটিং করার সুবিধার্থেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের গর্ব

‘লগান’ শুধু বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেনি, আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। ছবিটি ৭৪তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন লাভ করে। ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ও ‘সালাম বম্বে!’-এর পর এটি ছিল অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া ভারতের তৃতীয় চলচ্চিত্র। এছাড়া ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি প্রশংসিত হয়।

 

২৫ বছর পরও কেন অমর ‘লগান’?

মুক্তির এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ‘লগান’ এখনও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘ঘনন ঘনন’, ‘মিতওয়া’, ‘চলে চলো’, ‘ও রে ছোরি’ কিংবা ‘রাধা কাইসে না জলে’-গানগুলো এখনও দর্শকদের আবেগ স্পর্শ করে।

 

ক্রিকেটের উত্তেজনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার অনুপ্রেরণামূলক গল্প ‘লগান’-কে শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক স্থায়ী মাইলফলকে পরিণত করেছে। আর সেই কারণেই ২৫ বছর পরও ভুবনের ব্যাটে মারা শেষ ছক্কা কিংবা বাস্তবের সেই ভারত-ব্রিটিশ ক্রিকেট ম্যাচ-দুটোই সমান আগ্রহ নিয়ে স্মরণ করেন দর্শকরা।


সম্পর্কিত নিউজ