ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত কিছু গান

ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত কিছু গান
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

শুরু হয়ে গেছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মহাযজ্ঞ। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মতো বাংলাদেশের সমর্থকরাও অপেক্ষায় রয়েছেন নিজেদের প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য। আর বিশ্বকাপের আসরে ব্রাজিল মাঠে নামবে, অথচ উন্মাদনা থাকবে না-এমনটা যেন কল্পনাও করা যায় না। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল শুধু ফুটবলের জন্যই বিখ্যাত নয়, দেশটি বিশ্বসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও। সাম্বা, বোসা নোভা, ফোরো এবং জনপ্রিয় ব্রাজিলিয়ান পপসংগীতের মাধ্যমে দেশটি বিশ্বসংস্কৃতিতে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

ফুটবল ও সংগীত-এই দুই বিষয় ব্রাজিলের সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে আছে যে দেশটির বড় কোনো ফুটবল আসর মানেই রাস্তায় রাস্তায় গান, নাচ আর উৎসবের আবহ। বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলের শহরগুলোতে যেমন ফুটবলের উন্মাদনা দেখা যায়, তেমনি শোনা যায় দেশটির ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় গান।

 

ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিতে তারা গড়েছে অনন্য এক রেকর্ড। ফুটবল কিংবদন্তি Pelé, Zico, Ronaldo Nazário, Ronaldinho এবং Neymar-এর মতো তারকারা বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলকে ফুটবলের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

 

ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একটি বহুল প্রচলিত মন্তব্য হলো-“The English invented football, the Brazilians perfected it।” অর্থাৎ, ইংরেজরা ফুটবলের জন্ম দিলেও ব্রাজিলিয়ানরা এটিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মাঠের নান্দনিকতা, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক তৈরি হয়েছে ব্রাজিলের।

 

বিশ্বকাপের আবহে প্রিয় দলের খেলা উপভোগ করার পাশাপাশি ব্রাজিলের সংগীত ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানা যেতে পারে। দেশটির কয়েকটি জনপ্রিয় গান ফুটবলপ্রেমীদের প্লেলিস্টেও নিয়মিত জায়গা করে নেয়।

 

১. Aquarela do Brasil

ব্রাজিলের জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় এই গানটি। ১৯৩৯ সালে বিখ্যাত সুরকার আরি বারোসো গানটি রচনা করেন। কয়েক দশক ধরে এটি ব্রাজিলের অনানুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক সংগীতে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে গানটির আধুনিক সংস্করণ ‘To Brazil!’ নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বকাপের সময় স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এই সুর শোনা যায়।

 

২. Asa Branca

ব্রাজিলের লোকসংগীতের ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত গান ‘আসা ব্রাঙ্কা’। ১৯৪৮ সালে Luiz Gonzaga এবং Humberto Teixeira গানটি রচনা করেন। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, খরা এবং ভালোবাসার গল্প নিয়ে তৈরি এই গানকে অনেকেই ব্রাজিলের ‘অঘোষিত জাতীয় সংগীত’ বলে থাকেন। আজও দেশটির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

 

৩. Mas Que Nada

বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলিয়ান সংগীতকে জনপ্রিয় করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা গানগুলোর একটি হলো ‘Mas Que Nada’। ১৯৬৩ সালে Jorge Ben Jor গানটি প্রকাশ করেন। পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্পী এটি নতুনভাবে পরিবেশন করেন। সাম্বার প্রাণবন্ত ছন্দে ভরপুর এই গানটি ফুটবল উৎসব, স্টেডিয়াম উদযাপন এবং ক্রীড়া অনুষ্ঠানে প্রায়ই বাজানো হয়।

 

৪. País do Futebol

ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি গান হলো ‘País do Futebol’ বা ‘ফুটবলের দেশ’। জনপ্রিয় ব্রাজিলিয়ান র‍্যাপার MC Guimê এবং ফুটবল তারকা Neymar-এর অংশগ্রহণে গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্য, জাতীয় গর্ব এবং বিশ্বকাপের আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি এই গানটি বিশ্বকাপ মৌসুমে নতুন করে আলোচনায় আসে।

 

৫. Daqui Pra Sempre

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ব্রাজিলিয়ান গানের তালিকায় রয়েছে ‘Daqui Pra Sempre’। ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত গানটি ব্রাজিলের সংগীত চার্টে দীর্ঘ সময় শীর্ষস্থানে ছিল। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন Manu Bahtidão এবং Simone Mendes। ইউটিউব এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে গানটি শত শত মিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে।

 

ফুটবল আর সাম্বা: ব্রাজিলের দুই পরিচয়

ব্রাজিলে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ। একইভাবে সাম্বা সংগীতও দেশটির সাংস্কৃতিক আত্মার প্রতীক। ব্রাজিলের বড় বড় ফুটবল জয় উদযাপনের সময় সাম্বা নৃত্য ও সংগীত অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। রিও ডি জেনেইরো থেকে সাও পাওলো-দেশের প্রায় সব অঞ্চলে ফুটবল ও সংগীত একসঙ্গে উদযাপিত হয়।

 

বাংলাদেশেও ব্রাজিলের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ শুধু তাদের সাফল্য নয়, বরং তাদের খেলার সৌন্দর্য। প্রতি বিশ্বকাপে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্রাজিলের পতাকা টানানো, বড় পর্দায় খেলা দেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের সরব উপস্থিতি সেই জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।

 

বিশ্বকাপের নতুন যাত্রায় যখন ব্রাজিল মাঠে নামতে প্রস্তুত, তখন প্রিয় দলের খেলা দেখার পাশাপাশি দেশটির সংগীত ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়াও হতে পারে বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ। ফুটবল, সাম্বা আর আবেগ-এই তিনের মিলনেই গড়ে উঠেছে ব্রাজিলের অনন্য পরিচয়, যা বিশ্বকাপ এলেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।


সম্পর্কিত নিউজ