তিন দিনেই ১০০ কোটির ক্লাবে ‘দৃশ্যম ৩’

তিন দিনেই ১০০ কোটির ক্লাবে ‘দৃশ্যম ৩’
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

মাত্র ক্লাস ফোর পাস করা এক সাধারণ মানুষ। পেশায় কেবল অপারেটর। কিন্তু পরিবারকে রক্ষার প্রশ্নে তার ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা, মানসিক দৃঢ়তা ও বুদ্ধিমত্তা বারবার হার মানিয়েছে উচ্চশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে। মালায়ালাম সিনেমার সেই কিংবদন্তি চরিত্র জর্জ কুট্টি আবারও ফিরে এসেছেন বড় পর্দায়। আর তার প্রত্যাবর্তনেই বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে মোহনলাল অভিনীত ও জিতু জোসেফ পরিচালিত ক্রাইম থ্রিলার ‘দৃশ্যম ৩’।

দক্ষিণী মেগাস্টার মোহনলালের জন্মদিন উপলক্ষে গত ২১ মে মুক্তি পায় সিনেমাটি। মুক্তির পর থেকেই দর্শকের আগ্রহ, অগ্রিম টিকিট বিক্রি এবং প্রেক্ষাগৃহে ভিড়-সব মিলিয়ে ‘দৃশ্যম ৩’ মালায়ালাম সিনেমার চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত মুক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। ট্রেড ট্র্যাকার স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহান্ত শেষে সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ১১৭ দশমিক ১৭ কোটি রুপি আয় করেছে। এর মাধ্যমে মুক্তির মাত্র তিন দিনেই ১০০ কোটির ক্লাবে প্রবেশ করেছে সিনেমাটি।

 

প্রথম সপ্তাহান্তে আয় ১১৭ কোটি রুপি

স্যাকনিল্কের হিসাব অনুযায়ী, তৃতীয় দিনে ‘দৃশ্যম ৩’ শুধু ভারতীয় বাজারে নেট আয় করেছে ১৩ দশমিক ৭০ কোটি রুপি। ওই দিন সিনেমাটির ৫ হাজার ১৮৫টি শো প্রদর্শিত হয়। তিন দিন শেষে ভারতে সিনেমাটির মোট নেট আয় দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৬০ কোটি রুপি এবং ভারতীয় গ্রস আয় ৪৭ দশমিক ১৭ কোটি রুপি। বিদেশি বাজারেও ছবিটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। তৃতীয় দিন বিদেশে ২৫ কোটি রুপি সংগ্রহ করে সিনেমাটির মোট আন্তর্জাতিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি রুপিতে। ফলে বিশ্বব্যাপী মোট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ১১৭ দশমিক ১৭ কোটি রুপি।

 

বক্স অফিস বিশ্লেষকদের মতে, ‘দৃশ্যম ৩’-এর এমন শুরু মালায়ালাম সিনেমার জন্য বড় ঘটনা। কারণ এটি শুধু তারকা মোহনলালের জনপ্রিয়তার ফল নয়; বরং ‘দৃশ্যম’ ব্র্যান্ডের দীর্ঘদিনের দর্শকবিশ্বাসেরও প্রতিফলন। দ্য ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, ২১ মে মুক্তির পর মাত্র তিন দিনে ছবিটি বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটির ক্লাবে ঢুকে পড়ে, যা এই ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রতি দর্শকের টানকে আরও স্পষ্ট করেছে।

 

জর্জ কুট্টির গল্প এবার আরও আবেগঘন

‘দৃশ্যম’ সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কেন্দ্রীয় চরিত্র জর্জ কুট্টি। তিনি কোনো পেশাদার অপরাধী নন, কোনো আইনজ্ঞ নন, কোনো গোয়েন্দাও নন। কিন্তু পরিবারকে রক্ষার জন্য তিনি বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব, পরিস্থিতি ও আইনের ফাঁকফোকর এমনভাবে ব্যবহার করেন, যা দর্শককে একই সঙ্গে বিস্মিত ও অস্বস্তিতে ফেলে।

 

প্রথম ছবিতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে রক্ষার জন্য জর্জ কুট্টি এক অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। দ্বিতীয় পর্বে অতীতের সেই ঘটনার মানসিক চাপ, পুলিশের নতুন তদন্ত এবং পরিবারের ভেতরের আতঙ্ক নতুন মাত্রা পায়। তৃতীয় পর্বে সেই গল্প আরও গভীরে যায়। এবার শুধু সাসপেন্স নয়, জর্জ কুট্টির সিদ্ধান্তের মানসিক মূল্য, পরিবারের ভাঙন-ভয় এবং দীর্ঘদিনের গোপন সত্য বহনের চাপও বড় হয়ে উঠেছে।

 

টিকিটিং প্ল্যাটফর্ম District-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘দৃশ্যম ৩’ জর্জ কুট্টি ও তার পরিবারের টানটান কাহিনি এগিয়ে নেয়; অতীতের গোপন সত্য আবার সামনে আসতে শুরু করে এবং গল্প আরও সাসপেন্স ও প্রতারণার জালে প্রবেশ করে। সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট এবং এটি ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার।

 

আগের দুই ছবির উত্তরাধিকার

‘দৃশ্যম’ প্রথম মুক্তি পায় ২০১৩ সালে। জিতু জোসেফ পরিচালিত সেই ছবি মালায়ালাম সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে ওঠে। এটি ছিল প্রথম মালায়ালাম সিনেমা, যা ৫০ কোটি রুপির ক্লাবে প্রবেশ করে। পরে ছবিটি ৬২ কোটির বেশি আয় করে এবং দীর্ঘদিন মালায়ালাম সিনেমার সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড ধরে রাখে।

 

শুধু মালায়ালাম নয়, ‘দৃশ্যম’ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সফল থ্রিলার ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পরিণত হয়েছে। ছবিটি হিন্দি, তামিল, তেলুগু, কন্নড়সহ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় রিমেক হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও এর রিমেক হয়েছে সিংহলি ও চীনা ভাষায়। কোরিয়ান রিমেকের ঘোষণাও এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ভারতীয় সিনেমার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার বিশেষ উদাহরণে পরিণত করেছে।

 

২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দৃশ্যম ২’ ছিল প্রথম ছবির সরাসরি সিক্যুয়েল। দ্বিতীয় ছবিতে জর্জ কুট্টির পরিবার বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও অতীতের ছায়া তাদের পিছু ছাড়েনি। দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া সেই সিক্যুয়েলই তৃতীয় পর্বের জন্য প্রত্যাশা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

 

ফিরেছেন পরিচিত মুখেরা

‘দৃশ্যম ৩’-এ জর্জ কুট্টি চরিত্রে আবারও অভিনয় করেছেন মোহনলাল। তার সঙ্গে ফিরেছেন মীনা, আনসিবা হাসান, এস্থার অনিল ও আশা শরৎ। তারা আগের পর্বগুলোর জনপ্রিয় চরিত্রে পুনরায় অভিনয় করেছেন। আইএমডিবি ও অন্যান্য প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি পরিচালনা করেছেন জিতু জোসেফ এবং এতে মোহনলাল, মীনা, আশা শরৎ, আনসিবা হাসান, এস্থার অনিলসহ আরও অনেকে অভিনয় করেছেন।

 

প্রযোজনায় রয়েছে আশীর্বাদ সিনেমাস। সিনেমাটির চিত্রগ্রহণ করেছেন সাথীশ কুরুপ, সম্পাদনায় ভি এস বিনায়ক এবং সংগীতে আছেন অনিল জনসন। ‘দৃশ্যম’ সিরিজের আবহসংগীত সব সময়ই গল্পের টেনশন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে; তৃতীয় পর্বেও সেই টানটান পরিবেশ ধরে রাখার চেষ্টা দেখা গেছে।

 

ধীর গতি, কিন্তু টানটান উত্তেজনা

‘দৃশ্যম ৩’ নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি একমুখী নয়। অনেক দর্শক মোহনলালের অভিনয়, আবেগঘন দৃশ্য এবং গল্পের ধীর কিন্তু চাপা উত্তেজনাকে প্রশংসা করেছেন। আবার কিছু সমালোচক মনে করছেন, প্রথম দুই পর্বের মতো নতুনত্বের বিস্ময় এবার তুলনামূলক কম। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জর্জ কুট্টির ফর্মুলা এবার কিছুটা পরিচিত মনে হতে পারে; আগের ছবিগুলোর মতো চমক না থাকলেও মোহনলালের অভিনয় ও চরিত্রের যাত্রা ছবিকে ধরে রেখেছে।

 

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের লাইভ রিভিউ আপডেটে দর্শক প্রতিক্রিয়ার বরাতে বলা হয়েছে, ছবিটি অনেকটা ‘ড্রামা-ড্রিভেন থ্রিলার’; বড় মুহূর্তের অপেক্ষায় গল্প ধীরে ধীরে এগোয়। এই ধীর বর্ণনা কারও কাছে আকর্ষণীয়, আবার কারও কাছে দীর্ঘ মনে হতে পারে। তবে আগের দুই পর্বের উত্তরাধিকার মাথায় রেখে দর্শকরা জর্জ কুট্টির নতুন অধ্যায় দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করছেন।

 

মালায়ালাম বাজারে শক্তিশালী, বিদেশেও দাপট

সিনেমাটির আয়ের বড় অংশ এসেছে মালায়ালাম ভাষার মূল সংস্করণ থেকে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেরালা ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী বাজার হিসেবে উঠে এসেছে। তৃতীয় দিনে আয়ে ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা যায়, যা ভালো word-of-mouth বা দর্শকপ্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।

 

শুধু কেরালা নয়, দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং বিদেশি বাজারেও ছবিটি ভালো সাড়া পেয়েছে। মালায়ালাম সিনেমার জন্য মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ বাজার। প্রবাসী মালায়ালি দর্শকদের কারণে ‘দৃশ্যম’ সিরিজের বিদেশি আয় সব সময়ই নজরকাড়া। ‘দৃশ্যম ৩’-এর ক্ষেত্রেও তিন দিনে ৭০ কোটি রুপির বিদেশি গ্রস আয় সেই বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

 

হিন্দি সংস্করণ নিয়েও আগ্রহ

মালায়ালাম ‘দৃশ্যম’ যেমন মোহনলালের জর্জ কুট্টিকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে, তেমনি হিন্দি রিমেকে অজয় দেবগনের বিজয় সালগাঁওকর চরিত্র জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এবার ‘দৃশ্যম ৩’-এর হিন্দি সংস্করণ নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, অজয় দেবগন অভিনীত হিন্দি ‘দৃশ্যম ৩’-এর শুটিংয়ে প্রকাশ রাজ তার অংশের কাজ শেষ করেছেন। এতে টাবু ও অজয় দেবগনের পাশাপাশি জয়দীপ আহলাওয়াতের যুক্ত হওয়ার খবরও আলোচনায় এসেছে। এই কারণে মালায়ালাম ‘দৃশ্যম ৩’-এর সাফল্য শুধু দক্ষিণী সিনেমা নয়, পুরো ভারতীয় বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল সংস্করণ কতটা সফল হয়, তার ওপর হিন্দি রিমেকের প্রত্যাশাও অনেকাংশে নির্ভর করে।

 

কেন ‘দৃশ্যম’ এখনও এত জনপ্রিয়

‘দৃশ্যম’ সিরিজের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এটি দর্শককে নৈতিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। একজন বাবা তার পরিবারকে রক্ষা করতে কত দূর যেতে পারেন? আইন কি সব সময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে? অপরাধ ঢেকে রাখা কি কখনো দর্শকের সহানুভূতি পেতে পারে? জর্জ কুট্টির চরিত্র এই প্রশ্নগুলোকে সহজ উত্তর দেয় না; বরং দর্শককে দ্বন্দ্বের মধ্যে রাখে।

 

এখানেই ‘দৃশ্যম’ অন্য অনেক থ্রিলার থেকে আলাদা। এটি শুধু হত্যাকাণ্ড বা তদন্তের গল্প নয়; এটি পরিবার, ভয়, অপরাধবোধ, বুদ্ধিমত্তা, শ্রেণিবৈষম্য, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। জর্জ কুট্টি শিক্ষিত নন, ক্ষমতাবান নন, প্রভাবশালীও নন। কিন্তু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সিনেমা দেখে শেখা কৌশল এবং পরিবারের জন্য সীমাহীন দায়বদ্ধতা তাকে এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করেছে।

 

‘দৃশ্যম ৩’ প্রমাণ করেছে, ভালো গল্প ও শক্তিশালী চরিত্র থাকলে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দীর্ঘ সময় পরও দর্শক টানতে পারে। মোহনলালের জর্জ কুট্টি এখন শুধু মালায়ালাম সিনেমার চরিত্র নয়; তিনি ভারতীয় থ্রিলার সিনেমার এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। তৃতীয় পর্বে গল্পের গতি ধীর, চমকের মাত্রা নিয়ে বিতর্ক আছে-তবু দর্শকের ভিড়, ১০০ কোটির বেশি বৈশ্বিক আয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা দেখিয়ে দিয়েছে, ‘দৃশ্যম’ এখনও বক্স অফিসে বড় শক্তি।

 

যদি প্রথম পর্ব ছিল বুদ্ধির খেলা এবং দ্বিতীয় পর্ব ছিল অতীতের ছায়া থেকে বাঁচার লড়াই, তবে তৃতীয় পর্বকে বলা যায় জর্জ কুট্টির মানসিক পরিণতির অধ্যায়। পরিবারকে বাঁচাতে এক সাধারণ মানুষ আবার কতদূর যেতে পারেন-সেই প্রশ্নই ‘দৃশ্যম ৩’-কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।


সম্পর্কিত নিউজ