{{ news.section.title }}
মাত্র ১ মিলিয়ন ডলার বাজেট, আয় ৩৭৭ মিলিয়ন-কী আছে এই সিনেমায়?
কাউকে নিঃশব্দে ভালোবাসেন, কিন্তু সাহস করে কখনো মনের কথা বলতে পারেননি-এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। আবার যদি এমন একটি সুযোগ আসে, যেখানে একটি মাত্র ইচ্ছা প্রকাশ করলেই সেই মানুষটি আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে শুরু করবে, তাহলে কি আপনি সেই সুযোগ গ্রহণ করবেন? প্রথমে বিষয়টি নিখুঁত রূপকথার মতো শোনালেও, বাস্তবে এমন একটি ইচ্ছা কীভাবে মানুষের জীবনকে ধীরে ধীরে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে, সেটিই দেখিয়েছে চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত স্বাধীন হরর চলচ্চিত্র ‘অবসেশন’ (Obsession)।
মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি শুধু দর্শকদের নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদেরও নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। খুব কম বাজেটে নির্মিত একটি স্বাধীন চলচ্চিত্র কীভাবে বিশ্বব্যাপী এত বড় সাফল্য অর্জন করতে পারে, সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও এখন রয়েছে এই সিনেমা।
হলিউডে বড় বাজেটের হরর সিনেমা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত হয় অসংখ্য চলচ্চিত্র। তবে গত কয়েক বছরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে-ভালো গল্প থাকলে বিশাল বাজেট সব সময় প্রয়োজন হয় না। ‘অবসেশন’ সেই ধারণাকেই আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রায় ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী ৩৭৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে বছরের সবচেয়ে লাভজনক সিনেমাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের এই ব্যবধান এতটাই বিস্ময়কর যে, অনেক বক্স অফিস বিশ্লেষক একে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সফল স্বাধীন হরর চলচ্চিত্রগুলোর কাতারে রাখছেন। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি, জনপ্রিয় সুপারহিরো কিংবা বিশাল মার্কেটিং প্রচারণা ছাড়াও কেবল একটি মৌলিক গল্প, কার্যকর নির্মাণশৈলী এবং দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ওপর ভর করেই সিনেমাটি এই সাফল্য অর্জন করেছে।
যদিও ‘অবসেশন’-এর মূল কাহিনি শুনলে অনেকের কাছেই তা পরিচিত মনে হতে পারে, কিন্তু এর উপস্থাপনাই সিনেমাটিকে আলাদা করেছে। সাহিত্য ও সিনেমার ইতিহাসে ইচ্ছাপূরণকে কেন্দ্র করে অসংখ্য গল্প লেখা হয়েছে। বিশেষ করে ১৯০২ সালে ব্রিটিশ লেখক ডব্লিউ ডব্লিউ জ্যাকবসের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দ্য মাংকিস প’ (The Monkey's Paw) প্রকাশের পর এই ধরনের গল্প হরর সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করে। সেই গল্পের মূল শিক্ষা ছিল, প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে পাওয়া কোনো ইচ্ছাই বিনা মূল্যে আসে না; প্রতিটি ইচ্ছার বিনিময়ে দিতে হয় ভয়ংকর মূল্য। পরবর্তী সময়ে ‘উইশমাস্টার’, ‘উইশ আপন’, ‘ড্র্যাগ মি টু হেল’ কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক মনস্তাত্ত্বিক হরর চলচ্চিত্রেও একই ধরনের ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ‘অবসেশন’ এই চেনা কাঠামোকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। এখানে ভয় শুরু হয় না কোনো অভিশপ্ত বাড়ি, অতিপ্রাকৃত প্রাণী কিংবা রহস্যময় দানব দিয়ে; বরং ভয় জন্ম নেয় মানুষের সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে পরিচিত এবং সবচেয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি-একতরফা ভালোবাসা থেকে।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র বিয়ার, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাইকেল জনস্টন। একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকানে কাজ করা এই তরুণ স্বভাবে অন্তর্মুখী, লাজুক এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশে অক্ষম। দীর্ঘদিন ধরে সহকর্মী নিকিকে ভালোবাসলেও কখনো সাহস করে নিজের মনের কথা বলতে পারেনি। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং পরিচিত সম্পর্কগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ তাকে সব সময় আটকে রেখেছে। বাস্তব জীবনে অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই অনুভূতির মিল রয়েছে বলেই গল্পের শুরু থেকেই দর্শক সহজেই বিয়ারের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করতে পারেন। পরিচালক ক্যারি বার্কার এখানেই সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখিয়েছেন। তিনি বিয়ারকে অতিমানবীয় কোনো নায়ক হিসেবে তুলে ধরেননি; বরং এমন একজন সাধারণ তরুণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যার দুর্বলতা, সংকোচ এবং আবেগ খুব সহজেই দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
গল্পে মোড় আসে এক অদ্ভুত ঘটনার মধ্য দিয়ে। একটি দোকান থেকে মাত্র ৬ দশমিক ৯৯ ডলারে একটি রহস্যময় কাঠির মতো বস্তু কিনে ফেলে বিয়ার, যার নাম ‘ওয়ান উইশ উইলো’। দোকানির দাবি, বস্তুটি মাঝখান থেকে ভেঙে একটি মাত্র ইচ্ছা প্রকাশ করলেই সেটি পূরণ হবে। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও শেষ পর্যন্ত কৌতূহল এবং নিজের দীর্ঘদিনের না-পাওয়া ভালোবাসার টানেই বিয়ার সেটি ব্যবহার করে। তার একমাত্র ইচ্ছা ছিল-নিকি যেন পৃথিবীর অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে তাকে বেশি ভালোবাসে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই ইচ্ছা সত্যি হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে নিকির আচরণ বদলে যেতে শুরু করে এবং সে বিয়ারের প্রতি এমন এক অস্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করতে থাকে, যা ধীরে ধীরে ভালোবাসার সীমা অতিক্রম করে ভয়ংকর আসক্তিতে রূপ নেয়।
সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। প্রথমদিকে দর্শক বিষয়টিকে মজার এবং রোমান্টিক হিসেবেই দেখেন। মনে হয়, দীর্ঘদিনের একতরফা প্রেম অবশেষে সফল হয়েছে। কিন্তু পরিচালক খুব ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দেন, স্বাভাবিক ভালোবাসা এবং নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তির মধ্যে পার্থক্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। নিকির আচরণ যত পরিবর্তিত হতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয় যে এটি আর ভালোবাসা নয়; বরং এমন এক মানসিক বন্দিত্ব, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। পরিচালক ক্যারি বার্কার এই পরিবর্তনটি এত ধীরে এবং নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন যে দর্শক বুঝতেই পারেন না ঠিক কোন মুহূর্তে একটি সাধারণ রোমান্টিক গল্প নিঃশব্দে রূপ নিয়েছে নির্মম মনস্তাত্ত্বিক হররে।
এই কারণেই ‘অবসেশন’কে অনেক সমালোচক শুধু হরর সিনেমা হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, এটি আধুনিক সম্পর্ক, অধিকারবোধ, একতরফা প্রেম, আবেগগত নির্ভরশীলতা এবং বিষাক্ত সম্পর্কের ওপর নির্মিত এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সিনেমাটি দর্শকের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও ছুড়ে দেয়-আমরা কি সত্যিই কাউকে ভালোবাসি, নাকি তাকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই ভালোবাসা বলে ভুল করি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সিনেমাটি ধীরে ধীরে আরও অন্ধকার, আরও সহিংস এবং আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
আর এখানেই পরিচালক ক্যারি বার্কারের নির্মাণশৈলী অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। তিনি সহজ কোনো জাম্প স্কেয়ার, বিকট শব্দ কিংবা হঠাৎ পর্দায় ভয়ংকর মুখ দেখিয়ে দর্শককে চমকে দিতে চাননি। বরং মানুষের স্বাভাবিক আবেগ, সম্পর্কের জটিলতা এবং মানসিক অস্থিরতাকেই ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে ভয় নিজেই তৈরি হয়। এই ধীরগতির উত্তেজনা, নিখুঁত আবহ এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল থাকা সম্পর্কের সংকটই ‘অবসেশন’-কে শুধু একটি হরর সিনেমা নয়, বরং চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
‘অবসেশন’-এর সবচেয়ে বড় চমক শুধু এর গল্প নয়, বরং এর নির্মাতাও। পরিচালক ক্যারি বার্কার হলিউডের প্রচলিত ধারার পরিচালক নন। বড় কোনো স্টুডিও বা চলচ্চিত্র স্কুলের মাধ্যমে নয়, বরং ইউটিউবে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও নির্মাণ করেই তিনি নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। শুরুতে ভয়, ডার্ক কমেডি এবং পরীক্ষামূলক গল্প নিয়ে কাজ করলেও খুব দ্রুতই তিনি এমন একটি দর্শকগোষ্ঠী তৈরি করেন, যারা তার নির্মাণশৈলীর স্বতন্ত্রতা লক্ষ্য করতে শুরু করে। এরপর সীমিত বাজেটে নির্মিত তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘Milk & Cereal’ হররপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই সিনেমাই প্রমাণ করে, প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়েও ভয় সৃষ্টি করা সম্ভব। ‘অবসেশন’-এ এসে তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে আরও পরিণত রূপ দিয়েছেন। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, ক্যারি বার্কারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি দর্শককে ভয় দেখানোর আগে চরিত্রগুলোর সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক তৈরি করেন। ফলে ভয়াবহ ঘটনাগুলো যখন ঘটতে শুরু করে, তখন দর্শক শুধু দৃশ্য দেখে চমকে ওঠেন না, বরং চরিত্রগুলোর জন্য সত্যিকার অর্থেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এই নির্মাণশৈলীই ‘অবসেশন’-কে সাধারণ হরর সিনেমা থেকে আলাদা করেছে। বর্তমান সময়ের অনেক হরর চলচ্চিত্র জাম্প স্কেয়ার, অতিরিক্ত শব্দ কিংবা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের ওপর নির্ভরশীল হলেও ক্যারি বার্কার সম্পূর্ণ বিপরীত পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি ভয় তৈরি করেছেন চরিত্রের আচরণ, সম্পর্কের পরিবর্তন এবং ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া মানসিক অস্বস্তির মাধ্যমে। দর্শক প্রথমে বুঝতেই পারেন না, ঠিক কোন মুহূর্তে গল্পটি রোমান্টিক কমেডি থেকে নির্মম মনস্তাত্ত্বিক হররে রূপ নিয়েছে। এই ধীরগতির উত্তেজনা তৈরির কৌশলের কারণেই অনেক সমালোচক তার নির্মাণশৈলীর সঙ্গে আরি অ্যাস্টার, রবার্ট এগার্স এবং ওজ পারকিন্স-এর কাজের মিল খুঁজে পেয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তারা এটিও বলেছেন, বার্কার কারও অনুকরণ করেননি; বরং নিজের একটি স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
সিনেমাটির আরেকটি বড় শক্তি এর অভিনয়। কেন্দ্রীয় চরিত্র বিয়ার-এর ভূমিকায় মাইকেল জনস্টন এমন এক অভিনয় করেছেন, যেখানে একই সঙ্গে লাজুক, দ্বিধাগ্রস্ত, আত্মবিশ্বাসহীন এবং পরে অপরাধবোধে ভেঙে পড়া একজন মানুষের পরিবর্তন অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে উঠেছে। প্রথমদিকে দর্শক তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করলেও গল্প যত এগোয়, ততই বোঝা যায় যে এই বিপর্যয়ের জন্য সেও পুরোপুরি নির্দোষ নয়। সে জানে নিকির আচরণ স্বাভাবিক নয়, তবুও প্রথমদিকে সেই অস্বাভাবিক ভালোবাসা উপভোগ করে। এই নৈতিক দ্বন্দ্বই চরিত্রটিকে বাস্তব এবং জটিল করে তুলেছে।
তবে চলচ্চিত্রটির প্রাণ নিঃসন্দেহে ইন্দে নাভারেতে। নিকি চরিত্রে তার অভিনয়কে ইতোমধ্যেই চলতি বছরের অন্যতম সেরা হরর পারফরম্যান্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন বহু আন্তর্জাতিক সমালোচক। গল্পের শুরুতে তিনি একজন স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত তরুণী; কিন্তু জাদুর প্রভাবে তার ব্যক্তিত্ব যেভাবে ধীরে ধীরে বিকৃত হতে থাকে, সেই পরিবর্তন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন তিনি। কোথাও তিনি অস্বস্তিকর, কোথাও করুণ, কোথাও আবার এতটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন যে দর্শক একই সঙ্গে তাকে ভয় পান এবং তার জন্য মায়াও অনুভব করেন। বিশেষ করে কয়েকটি দৃশ্যে, যখন নিকি সাময়িকভাবে নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং কিছুই বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত চোখে চারপাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন চরিত্রটির ট্র্যাজেডি আরও গভীর হয়ে ওঠে। সমালোচকদের মতে, পুরো সিনেমার আবেগগত ভার অনেকটাই বহন করেছেন ইন্দে নাভারেতে।
পার্শ্বচরিত্রগুলোও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কুপার টমলিনসন এবং মেগান ললেস অভিনীত চরিত্রগুলো শুধু গল্পকে এগিয়ে নেয় না, বরং প্রধান চরিত্রগুলোর মানসিক পরিবর্তন বোঝাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে তাদের উপস্থিতি দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বিষাক্ত সম্পর্ক কখনো শুধু দুইজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব আশপাশের মানুষদের জীবনেও পড়ে।
চলচ্চিত্রটির ভিজ্যুয়াল নির্মাণও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। বড় বাজেটের সিনেমার মতো জাঁকজমকপূর্ণ লোকেশন বা বিশাল সেট ব্যবহার না করেও ক্যামেরার কাজ, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে এমন এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যা দর্শককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অস্বস্তির মধ্যে রাখে। বিশেষ করে ক্যামেরার স্থির ব্যবহার, দীর্ঘ শট এবং চরিত্রের মুখের ক্লোজআপের মাধ্যমে দর্শককে চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থার খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেক সমালোচক এই ভিজ্যুয়াল স্টাইলকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক হররের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সাউন্ড ডিজাইন এবং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও ‘অবসেশন’-এর সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এখানে ভয় তৈরির জন্য অতিরিক্ত শব্দ বা হঠাৎ বিকট সাউন্ড ব্যবহার করা হয়নি। বরং অনেক সময় সম্পূর্ণ নীরবতা, ক্ষীণ পরিবেশগত শব্দ কিংবা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা সঙ্গীতের মাধ্যমে এমন উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছে, যা দর্শককে অস্বস্তিতে রাখে। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, এই সাউন্ড ডিজাইন না থাকলে সিনেমার অনেক দৃশ্য একই রকম কার্যকর হতো না।
এডিটিংয়ের ক্ষেত্রেও ক্যারি বার্কারের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। ইউটিউব কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে বছরের পর বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা তিনি এই সিনেমায় দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। দৃশ্যান্তরের গতি, হঠাৎ সময়ের পরিবর্তন, অস্বাভাবিক কাট এবং নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ক্যামেরা স্থির রাখার সিদ্ধান্ত গল্পের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সিনেমাটি কখনো দ্রুতগতির মনে হয় না, আবার কোথাও অপ্রয়োজনীয়ও লাগে না। বরং দর্শক ধীরে ধীরে এমন এক পরিবেশে ঢুকে পড়েন, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়।
মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক সমালোচকদের কাছ থেকেও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। বিভিন্ন রিভিউতে এটিকে বছরের সবচেয়ে মৌলিক স্বাধীন হরর চলচ্চিত্রগুলোর একটি বলা হয়েছে। অনেকেই লিখেছেন, এটি কেবল ভয় দেখানোর জন্য নির্মিত হয়নি; বরং আধুনিক সম্পর্ক, একতরফা প্রেম, আবেগগত নির্ভরশীলতা এবং মানুষের অধিকারবোধ নিয়ে গভীর আলোচনা করেছে। সমালোচকদের মতে, ‘অবসেশন’ এমন একটি সিনেমা, যা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দর্শকের মনে থেকে যায় এবং তাকে ভাবতে বাধ্য করে-ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা আসলে কোথায়।
বক্স অফিসেও সিনেমাটি অবিশ্বাস্য সাফল্য পেয়েছে। মাত্র এক মিলিয়ন ডলার বাজেটে নির্মিত এই চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী ৩৭৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে স্বাধীন চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম লাভজনক সিনেমায় পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। মুক্তির প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্রভিত্তিক ফোরাম এবং ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোতে সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। দর্শকেরাই মূলত ছবিটির সবচেয়ে বড় প্রচারক হয়ে ওঠেন। প্রচলিত বড় মার্কেটিং ছাড়াই কেবল ইতিবাচক দর্শক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সিনেমাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন দর্শক আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
‘অবসেশন’-এর গল্প যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি আসলে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রচলিত হরর চলচ্চিত্র নয়। বরং এটি মানুষের আবেগ, একতরফা প্রেম, অধিকারবোধ এবং মানসিক নির্ভরশীলতার এমন এক অন্ধকার দিক তুলে ধরে, যা বাস্তব জীবনেও প্রায়ই দেখা যায়। সিনেমার শুরুতে দর্শক বিয়ারের প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেন। একজন লাজুক তরুণ হিসেবে সে ভালোবাসার মানুষকে নিজের অনুভূতির কথা বলতে পারে না। কিন্তু গল্প ধীরে ধীরে এগোতে থাকলে দর্শক বুঝতে পারেন, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং কাউকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এক জিনিস নয়। পরিচালক ক্যারি বার্কার খুব সূক্ষ্মভাবে এই পার্থক্যটিই তুলে ধরেছেন। তিনি দর্শকদের এমন একটি জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে নায়ক এবং খলনায়কের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘অবসেশন’-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এটি দর্শককে কোনো চরিত্রকে সম্পূর্ণ ভালো কিংবা সম্পূর্ণ খারাপ হিসেবে দেখার সুযোগ দেয় না। বিয়ার যেমন প্রথমে দর্শকের সহানুভূতি অর্জন করে, তেমনি খুব দ্রুতই বোঝা যায় যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার পেছনে তার নিজের সিদ্ধান্তও সমানভাবে দায়ী। সে জানে, নিকির অনুভূতি স্বাভাবিক নয়; তবু সেই অস্বাভাবিক ভালোবাসা থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে প্রথমে সেটিকে উপভোগ করতে থাকে। নির্মাতা এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দেন-মানুষ কি সত্যিই ভালোবাসা চায়, নাকি সে চায় এমন কাউকে, যে তাকে নিঃশর্তভাবে নিজের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ধীরে ধীরে গল্পকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে নিকি চরিত্রটিও প্রচলিত হরর সিনেমার ভিলেন নয়। জাদুর প্রভাবে তার ব্যক্তিত্ব বিকৃত হয়ে যায় এবং সেই পরিবর্তনের ওপর তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে দর্শক একদিকে তার আচরণে আতঙ্কিত হন, অন্যদিকে বুঝতে পারেন যে সে নিজেও এই ঘটনার একজন শিকার। অনেক আন্তর্জাতিক সমালোচক লিখেছেন, ছবিটির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো-নিকি আসলে নিজের ইচ্ছায় কিছুই করছে না। তার ব্যক্তিত্ব, স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সবকিছুই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে সিনেমাটি ভালোবাসার গল্পের পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও গভীর প্রশ্ন তোলে।
এই কারণেই অনেক চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ‘অবসেশন’-কে টক্সিক রিলেশনশিপ বা বিষাক্ত সম্পর্কের প্রতীকী উপস্থাপন হিসেবে দেখেছেন। বাস্তব জীবনে এমন অনেক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে একজন মানুষ ধীরে ধীরে অন্যজনের পুরো জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। প্রথমদিকে সেই আচরণ যত্ন কিংবা ভালোবাসা বলে মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি দমবন্ধ করা মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়। পরিচালক ক্যারি বার্কার অতিপ্রাকৃত উপাদান ব্যবহার করলেও মূল বক্তব্যটি সম্পূর্ণ বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অনেক সমালোচক মনে করেন, এ কারণেই সিনেমাটি দর্শকদের মনে এত গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
ছবিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ভিজ্যুয়াল প্রতীক বা প্রতীকী ভাষা। পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে ব্যবহৃত হয়েছে সংকীর্ণ ঘর, অল্প আলো, বন্ধ জানালা এবং সীমাবদ্ধ ফ্রেমিং। এগুলো শুধু পরিবেশ তৈরির জন্য নয়; বরং চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থারও প্রতীক। বিশেষ করে নিকির পরিবর্তনের পর ক্যামেরা যেভাবে তাকে অনুসরণ করে, তাতে মনে হয় সে যেন নিজের ভেতরেই আটকে গেছে। একইভাবে বিয়ারের চারপাশের ফ্রেমও ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে, যা তার মানসিক বন্দিত্বের ইঙ্গিত বহন করে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, এত কম বাজেটে এমন ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
চলচ্চিত্রটির আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো এর সহিংসতা। শুরুতে ছবিটি অনেকটাই নিরীহ মনে হলেও মাঝামাঝি সময় থেকে এর সহিংসতা দ্রুত বেড়ে যায়। তবে নির্মাতা অযথা রক্তপাত দেখানোর চেষ্টা করেননি। বরং প্রতিটি সহিংস দৃশ্য গল্পের আবেগগত ও মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে একটি আকস্মিক আক্রমণের দৃশ্য এতটাই অপ্রত্যাশিতভাবে আসে যে অনেক দর্শক সেটিকে সিনেমার সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সমালোচকদের মতে, এই দৃশ্যগুলো শুধুমাত্র দর্শককে চমকে দেওয়ার জন্য নয়; বরং চরিত্রগুলোর মানসিক ভাঙনকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে সহিংসতা নিয়েই কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগে সেন্সর বোর্ডের পর্যালোচনায় কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে আপত্তি ওঠে। বিশেষ করে একটি নৃশংস হত্যার দৃশ্য এবং প্রাণীর প্রতি সহিংসতার কিছু মুহূর্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে কাঙ্ক্ষিত রেটিং নিশ্চিত করতে কয়েকটি দৃশ্যের দৈর্ঘ্য কমানো হয় বলে একাধিক আন্তর্জাতিক বিনোদনমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও চলচ্চিত্রটি তার অস্বস্তিকর পরিবেশ এবং মানসিক চাপের জন্য আলোচনায় থাকে।
সমালোচকদের আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিল ছবিটির গতি। অনেকেই মনে করেন, প্রায় ১১০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় অংশ কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা গেলে গল্প আরও গতিশীল হতে পারত। আবার অন্য একটি অংশের সমালোচকেরা বলেছেন, এই ধীর গতি ইচ্ছাকৃত এবং সেটিই দর্শকদের অস্বস্তির অনুভূতি দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ যে বিষয়টি একজন দর্শকের কাছে দুর্বলতা, অন্যজনের কাছে সেটিই ছবির অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবেও ‘অবসেশন’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। স্বাধীন ঘরানার চলচ্চিত্র হিসেবে এটি যে সাড়া ফেলেছে, তা অনেক নির্মাতার কাছেই অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য সিনেমাটি একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে-সীমিত বাজেট, অল্পসংখ্যক লোকেশন এবং তুলনামূলক কম পরিচিত অভিনয়শিল্পী নিয়েও যদি গল্প শক্তিশালী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হওয়া সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সিনেমাটির জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টিকটক, রেডিট, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউবে হাজার হাজার দর্শক ছবিটির বিভিন্ন দৃশ্য, প্রতীক এবং সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। অনেকেই ছবির লুকিয়ে থাকা ইঙ্গিত বা ইস্টার এগ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে 'ওয়ান উইশ উইলো' বস্তুটির প্রকৃত উৎস, এর অতিপ্রাকৃত শক্তির ব্যাখ্যা এবং শেষ দৃশ্যের বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থ নিয়ে অসংখ্য বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। এই অনলাইন আলোচনাগুলোও ছবিটির বক্স অফিস সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে ‘অবসেশন’ শুধু বিনোদনের জন্য নির্মিত একটি হরর সিনেমা নয়। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে প্রশ্ন রেখে যায়। ভালোবাসা কি কখনো জোর করে আদায় করা যায়? মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা কেড়ে নিয়ে তৈরি হওয়া সম্পর্ক কি সত্যিই ভালোবাসা হতে পারে? আর একজন মানুষ যখন নিজের অপূর্ণ চাওয়াকে পূরণ করতে গিয়ে অন্য একজনের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, তখন প্রকৃত ভুক্তভোগী আসলে কে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সরাসরি উত্তর পরিচালক দেননি। বরং দর্শকের বিচারবোধের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন।
মুক্তির পর থেকেই ‘অবসেশন’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এর শেষ অংশকে কেন্দ্র করে। প্রচলিত হরর সিনেমার মতো এখানে সব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া হয়নি। বরং পরিচালক ক্যারি বার্কার এমন একটি সমাপ্তি বেছে নিয়েছেন, যা দর্শকদের নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়। এই কারণেই সিনেমা শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্রভিত্তিক ফোরাম এবং বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী ইউটিউব চ্যানেলে ছবিটির শেষ দৃশ্য নিয়ে অসংখ্য আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই মনে করেন, ছবির শেষ অংশটি কেবল অতিপ্রাকৃত ঘটনার সমাপ্তি নয়; বরং এটি মানুষের ইচ্ছা, অপরাধবোধ এবং ভালোবাসাকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতার প্রতীকী উপস্থাপন। পরিচালক কোথাও স্পষ্ট করে বলেননি কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক, ফলে দর্শকের নিজস্ব ব্যাখ্যার জায়গা থেকেই গেছে।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ‘অবসেশন’-এর আসল শক্তি গল্পের চমক নয়, বরং এর মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলো। প্রথম দেখায় এটি একটি অতিপ্রাকৃত হরর সিনেমা মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এটি মানুষের একাকীত্ব, প্রত্যাখ্যানের ভয়, আবেগগত নির্ভরশীলতা এবং সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে নির্মিত একটি গভীর নাটক। অনেকেই এটিকে ‘রিলেশনশিপ হরর’ বা সম্পর্কভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক হররের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ এখানে ভয় কোনো অদৃশ্য দানব থেকে নয়; বরং এমন এক ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয়, যার মধ্যে স্বাধীনতা নেই, সম্মতি নেই এবং ব্যক্তিসত্তার কোনো মূল্যও নেই।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমালোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে-পরিচালক ক্যারি বার্কার গল্পের শুরুতেই দর্শকদের একটি নৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলেন। প্রথমে বিয়ারের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়, কারণ সে দীর্ঘদিন ধরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু গল্প যত এগোয়, দর্শক বুঝতে পারেন, নিকির স্বাধীন ইচ্ছাকে কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তই পুরো বিপর্যয়ের সূচনা করেছে। এই অবস্থায় দর্শক আর কোনো চরিত্রকে পুরোপুরি নির্দোষ বা পুরোপুরি অপরাধী হিসেবে দেখতে পারেন না। সমালোচকদের মতে, এই নৈতিক অস্পষ্টতাই সিনেমাটিকে সাধারণ হরর থেকে আলাদা করেছে।
তবে প্রশংসার পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও রয়েছে। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, নিকি চরিত্রটি অসাধারণভাবে নির্মিত হলেও তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মানসিক যন্ত্রণার দিকটি আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা যেত। গল্পটি মূলত বিয়ারের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হওয়ায় নিকির অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, চলচ্চিত্রের শেষ ২০ মিনিটে ঘটনাগুলো আরও কিছুটা ধীরে এগোলে আবেগগত প্রভাব আরও গভীর হতে পারত। তবে অধিকাংশ সমালোচকই একমত হয়েছেন যে এসব সীমাবদ্ধতা সিনেমার সামগ্রিক মানকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়নি।
বক্স অফিস বিশ্লেষকদের মতে, ‘অবসেশন’-এর সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দর্শকদের মুখে মুখে প্রচার। প্রথম সপ্তাহে ছবিটি বড় কোনো ব্লকবাস্টারের মতো আয় করেনি। কিন্তু যারা সিনেমাটি দেখেছিলেন, তাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। টিকটক, রেডিট, ইউটিউব, এক্স এবং চলচ্চিত্রভিত্তিক অনলাইন কমিউনিটিতে ছবির বিভিন্ন দৃশ্য, প্রতীক, সংলাপ এবং সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ প্রচারণাই ধীরে ধীরে নতুন দর্শকদের সিনেমা হলে টেনে আনে। বর্তমানে স্বাধীন চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই ধরনের দর্শকনির্ভর প্রচারণাকে সবচেয়ে কার্যকর বিপণন কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর ‘অবসেশন’ তার সাম্প্রতিকতম সফল উদাহরণ।
অনেক বিশ্লেষক এই সাফল্যের পেছনে আরেকটি কারণও উল্লেখ করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হরর সিনেমার দর্শকদের রুচিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। শুধু অতিপ্রাকৃত ভয় নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক চাপ, সামাজিক প্রতীক, সম্পর্কের সংকট এবং মানবিক দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হরর চলচ্চিত্রগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ‘হেরেডিটারি’, ‘মিডসোমার’, ‘টক টু মি’, ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ কিংবা ‘লংলেগস’-এর মতো সিনেমার পর দর্শক এমন গল্পের প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যেখানে ভয় এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সংযোগ থাকে। ‘অবসেশন’ সেই ধারারই নতুন সংযোজন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর নির্মাতা ক্যারি বার্কার একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি এমন একটি হরর সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন যেখানে অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো শুধু ভয় দেখানোর জন্য থাকবে না, বরং মানুষের আবেগ এবং সম্পর্কের জটিলতাকে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হবে। তার ভাষায়, সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় কোনো অভিশাপ নয়; বরং এমন একজন মানুষ, যে ভালোবাসার নামে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়। এই ভাবনাই পুরো সিনেমার ভিত্তি তৈরি করেছে।
এদিকে ছবির অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যের পর থেকেই সম্ভাব্য সিক্যুয়েল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও নির্মাতা বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় কিস্তির ঘোষণা দেয়নি, তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনোদনমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টুডিও ইতোমধ্যেই এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। অনেকের ধারণা, একই ধরনের অভিশপ্ত ইচ্ছাপূরণের ধারণাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন চরিত্র এবং নতুন গল্প নিয়ে অ্যান্থলজি ধাঁচের সিক্যুয়েলও তৈরি হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, মূল গল্পের কিছু অমীমাংসিত দিক ভবিষ্যতে নতুন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হতে পারে। তবে নির্মাতারা এখন পর্যন্ত কোনো গুজবের সত্যতা নিশ্চিত করেননি।
ওটিটি মুক্তি নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ কম নয়। আন্তর্জাতিক বক্স অফিসে সাফল্যের পর বড় কয়েকটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ছবিটির ডিজিটাল স্বত্ব নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন বিনোদনমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক মুক্তির তারিখ এখনো জানানো হয়নি, তবু বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের নির্ধারিত সময় শেষ হলে ছবিটি জনপ্রিয় কোনো আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাবে।
সব মিলিয়ে ‘অবসেশন’ শুধু একটি সফল হরর সিনেমা নয়; বরং স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সীমিত বাজেট, অল্পসংখ্যক লোকেশন এবং তুলনামূলক কম পরিচিত অভিনয়শিল্পী নিয়েও যে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা সম্ভব, সেটি আবারও প্রমাণ করেছে এই সিনেমা। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, শক্তিশালী চিত্রনাট্য, বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় এবং ভিন্নধর্মী নির্মাণশৈলী থাকলে বিশাল বাজেট কিংবা বড় স্টুডিওর ওপর নির্ভর করতেই হবে-এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
হরর ঘরানার চলচ্চিত্র হিসেবে ‘অবসেশন’ দর্শকদের ভয় দেখাতে সফল হয়েছে, কিন্তু সেখানেই এর সাফল্য সীমাবদ্ধ নয়। সিনেমাটি শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে থেকে যায় কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন-ভালোবাসা কি কখনো জোর করে পাওয়া সম্ভব? একজন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা কেড়ে নিয়ে তৈরি হওয়া সম্পর্ক কি আদৌ ভালোবাসা হতে পারে? আর নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণের জন্য অন্য একজনের জীবনকে বদলে দেওয়ার অধিকার কি কারও আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিচালক দর্শকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। সম্ভবত এ কারণেই ‘অবসেশন’ শুধু কয়েক ঘণ্টার বিনোদন নয়; বরং এমন একটি চলচ্চিত্রে পরিণত হয়েছে, যা সিনেমা শেষ হওয়ার অনেক পরও দর্শকের ভাবনার ভেতর বেঁচে থাকে।
বাজেটের তিন শতাধিক গুণ আয়, বছরের সবচেয়ে লাভজনক সিনেমাগুলোর একটি
‘অবসেশন’-এর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক শুধু এর জনপ্রিয়তা নয়, বরং এর অবিশ্বাস্য বাণিজ্যিক সাফল্যও। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বক্স অফিস ট্র্যাকার ও বিনোদনভিত্তিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা) বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির পর বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ৩৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার সমান।
অর্থাৎ, নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় ছবিটি ৩৭৭ গুণেরও বেশি আয় করেছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক হলিউডে এত কম বাজেটের কোনো স্বাধীন হরর সিনেমার জন্য এটি এক অসাধারণ সাফল্য। বড় স্টুডিওর বিপুল প্রচারণা ছাড়াই কেবল দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে ছবিটি এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রথম সপ্তাহান্তের পর থেকেই বক্স অফিসে ছবিটির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। সাধারণত বড় বাজেটের সিনেমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আয় কমতে শুরু করলেও ‘অবসেশন’-এর ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যায়। নতুন নতুন বাজারে মুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল আলোচনা এবং সমালোচকদের ইতিবাচক মূল্যায়নের কারণে ছবিটি সপ্তাহের পর সপ্তাহ শক্ত অবস্থান ধরে রাখে। অনেক ট্রেড বিশ্লেষকের মতে, এটাই ছিল ছবিটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, শুধুমাত্র প্রেক্ষাগৃহ থেকেই নয়, ভবিষ্যতে ডিজিটাল স্ট্রিমিং, টেলিভিশন সম্প্রচার, ভিডিও-অন-ডিমান্ড (VOD), ব্লু-রে বিক্রি এবং আন্তর্জাতিক স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে ছবিটির মোট আয় আরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে পারে। সে হিসেবে ‘অবসেশন’ নির্মাতাদের জন্য চলতি বছরের সবচেয়ে লাভজনক চলচ্চিত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।