অতিরিক্ত রাগ শরীরে যেসব ক্ষতি ডেকে আনে

অতিরিক্ত রাগ শরীরে যেসব ক্ষতি ডেকে আনে
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। অন্যায়, অপমান, হতাশা বা চাপের মুখে মানুষ রেগে যেতে পারে-এটি অস্বাভাবিক নয়। বরং সঠিক মাত্রার রাগ অনেক সময় মানুষকে প্রতিবাদী, সচেতন ও আত্মরক্ষামূলক হতে সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, ঘন ঘন প্রকাশ পায় বা দীর্ঘ সময় ধরে মনের মধ্যে জমে থাকে। তখন এই আবেগ শুধু আচরণ বা সম্পর্ক নষ্ট করে না; শরীরের ভেতরেও তৈরি করে বড় ধরনের চাপ।

আপনার দেওয়া তিনটি লেখার মূল বিষয় ছিল-অতিরিক্ত রাগ হৃদরোগ, স্ট্রোক, হজমের সমস্যা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া, মানসিক অবসাদ, বদভ্যাস এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব তথ্যকে ভিত্তি করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা ও চিকিৎসা সূত্র মিলিয়ে দেখা যায়, রাগকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

 

রাগ করলে শরীরে কী ঘটে

মানুষ রেগে গেলে শরীরে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়। তখন অ্যাড্রেনালিন, নরঅ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বাড়ে। এর ফলে হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তচাপ বাড়ে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং পেশি টানটান হয়ে যায়। স্বল্প সময়ের জন্য এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক হলেও ঘন ঘন এমন হলে তা হৃদযন্ত্র, রক্তনালি, মস্তিষ্ক ও হজমতন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণহীন রাগ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ত্বকের সমস্যা ও হজমজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

 

হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় অতিরিক্ত রাগ

রাগের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ক্ষতি হলো হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব। হার্ভার্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, তীব্র রাগের পরবর্তী দুই ঘণ্টায় বুকব্যথা, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা ঝুঁকিপূর্ণ হৃদস্পন্দনজনিত সমস্যার ঝুঁকি সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। একবার রাগ করলে ঝুঁকি খুব বেশি না হলেও যারা ঘন ঘন রেগে যান, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি জমতে জমতে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

 

২০২৪ সালে জার্নাল অব দ্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র কয়েক মিনিটের রাগও রক্তনালির স্বাভাবিক প্রসারণক্ষমতা সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের রাগের স্মৃতি মনে করতে বলা হলে তাদের রক্তনালির কার্যকারিতায় নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, রক্তনালির ভেতরের আস্তরণ বা এন্ডোথেলিয়ামের এই ধরনের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস, হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

 

স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে

হঠাৎ রাগ বা মানসিক উত্তেজনা শুধু হৃদযন্ত্র নয়, মস্তিষ্কের রক্তনালির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। হার্ভার্ড হেলথ একটি বড় আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে জানায়, স্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগের এক ঘণ্টায় রাগ বা মানসিক অস্থিরতার অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস বা হৃদরোগের ঝুঁকি আছে, তাদের ক্ষেত্রে রাগের সময় রক্তচাপের আকস্মিক ওঠানামা বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।

 

রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় প্রভাব

অতিরিক্ত রাগ ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের প্রদাহপ্রক্রিয়া ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। বয়স্কদের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার রাগ অনুভব করা কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারলিউকিন-৬ বা আইএল-৬ নামে প্রদাহের একটি বায়োমার্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ হৃদরোগ, বাত, ডায়াবেটিসসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।

 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাগ মানেই রোগ নয়; কিন্তু নিয়মিত তীব্র রাগ, ক্ষোভ ধরে রাখা, প্রতিহিংসা বা দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতা শরীরের স্ট্রেস সিস্টেমকে বারবার সক্রিয় করে। এতে ঘুম, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

হজমতন্ত্রেও পড়ে প্রভাব

অনেকেই লক্ষ্য করেন, রাগ বা মানসিক চাপের পর পেটব্যথা, বুকজ্বালা, বদহজম, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এর কারণ হলো মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যাকে অনেক সময় ‘গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’ বলা হয়। রাগ বা চাপের সময় শরীর রক্তপ্রবাহকে পেশি ও মস্তিষ্কের দিকে বেশি পাঠায়, ফলে হজমপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকও নিয়ন্ত্রণহীন রাগের সঙ্গে হজমজনিত সমস্যার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।

 

যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক, আইবিএস, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা অন্ত্রের সংবেদনশীলতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে রাগ ও চাপ উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই পেটের রোগের চিকিৎসায় অনেক সময় খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি স্ট্রেস ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

রাগ শুধু শরীরের ওপর নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। অনিয়ন্ত্রিত রাগ থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, কর্মস্থলে সমস্যা, পরিবারে দূরত্ব, অপরাধবোধ, অনুশোচনা ও একাকিত্ব তৈরি হতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের মতে, রাগ স্বাভাবিক আবেগ হলেও নিয়ন্ত্রণহীন রাগ স্বাস্থ্য ও সম্পর্ক-দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি করতে পারে।

 

দীর্ঘদিন ধরে রাগ চেপে রাখা বা বারবার বিস্ফোরিত হওয়া-দুই অবস্থাই ক্ষতিকর। কেউ রাগ প্রকাশ করতে না পেরে ভেতরে জমিয়ে রাখলে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, অনিদ্রা বা আত্মসম্মানবোধের সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার কেউ আক্রমণাত্মকভাবে রাগ প্রকাশ করলে পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রের জটিলতা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ে।

 

রাগ থেকে তৈরি হতে পারে বদভ্যাস

অনেকে রাগ কমানোর জন্য ধূমপান, অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, মদ্যপান, চিৎকার, জিনিসপত্র ভাঙা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এগুলো সাময়িকভাবে চাপ কমিয়েছে মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়। ধূমপান, অ্যালকোহল, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ও ঘুমের সমস্যা-সবই আবার হৃদরোগ, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

রাগের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি

রাগ মানুষের বিচারক্ষমতা ও মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে রাগের মাথায় গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কারও সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়া দুর্ঘটনা ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। রাগের সময় মানুষ অনেক সময় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালায়, হঠাৎ ব্রেক করে, অন্য চালকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে বা রাস্তার পরিস্থিতি ঠিকমতো বুঝতে পারে না। তাই রাগের সময় গাড়ি চালানো এড়িয়ে চলা নিরাপদ।

 

রাগ কি সবসময় খারাপ?

রাগকে পুরোপুরি খারাপ বলা ঠিক নয়। অন্যায়, অবিচার বা সীমা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে প্রকাশ করা রাগ মানুষকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে দিতে পারে। সমস্যা হলো-রাগ যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, বারবার হয়, আক্রমণাত্মক আচরণে রূপ নেয় বা শরীর-মন-সম্পর্কের ক্ষতি করে, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মায়ো ক্লিনিকও বলছে, রাগ স্বাভাবিক এবং কখনো কখনো স্বাস্থ্যকর আবেগ; তবে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

 

রাগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৌশল

রাগ কমানোর প্রথম ধাপ হলো নিজের রাগের লক্ষণ চিনতে শেখা। যেমন হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মুখ গরম লাগা, হাত কাঁপা, চোয়াল শক্ত হয়ে যাওয়া, গলা উঁচু হয়ে যাওয়া বা কথা বলার আগে মাথা গরম হয়ে যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে বিরতি নেওয়া দরকার।

 

মায়ো ক্লিনিক রাগ নিয়ন্ত্রণে কিছু কার্যকর কৌশলের কথা বলেছে-কথা বলার আগে ভাবা, শান্ত হওয়ার পর নিজের বক্তব্য বলা, কিছুটা শারীরিক নড়াচড়া করা, বিরতি নেওয়া, সমাধান খোঁজা, ‘আমি’ দিয়ে বাক্য শুরু করা, ক্ষমা করার চেষ্টা করা, হাস্যরস ব্যবহার করা এবং রিল্যাক্সেশন অনুশীলন করা।

 

ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া, ১০ পর্যন্ত গোনা, পানি পান করা, জায়গা পরিবর্তন করা, হাঁটতে বের হওয়া, নামাজ/ধ্যান/মাইন্ডফুলনেস, জার্নাল লেখা বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে কথা বলা রাগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে রাগের সময় সঙ্গে সঙ্গে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা, ফোনে তর্ক করা বা কাউকে অপমান করা এড়িয়ে চলা উচিত।

 

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া দরকার

যদি রাগের কারণে পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হয়; যদি রাগের মাথায় আঘাত, ভাঙচুর বা হুমকির মতো আচরণ হয়; যদি পরে অপরাধবোধ বা বিষণ্ণতা তৈরি হয়; অথবা যদি মনে হয় রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না-তাহলে মনোবিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়া উচিত। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট থেরাপি মানুষকে রাগের মুহূর্ত চিনতে এবং স্বাস্থ্যকরভাবে তা মোকাবিলার দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

 

রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ, কিন্তু অতিরিক্ত রাগ শরীর ও জীবনের জন্য নীরব ঝুঁকি। এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়া, মানসিক অস্থিরতা, সম্পর্কের অবনতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই রাগ দমন নয়, বরং রাগকে বুঝে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

 

সুস্থ থাকতে হলে রাগের মুহূর্তে নিজেকে থামানো, শান্তভাবে কথা বলা, নিয়মিত ঘুম, ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং-এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ রাগ নিয়ন্ত্রণ মানে দুর্বলতা নয়; বরং নিজের শরীর, মন ও সম্পর্ককে রক্ষা করার শক্তিশালী সিদ্ধান্ত।


সম্পর্কিত নিউজ