{{ news.section.title }}
ত্বক ভালো রাখতে কী ধরনের পুষ্টি দরকার? - জেনে নিন
অনেকেই ত্বকের যত্ন বলতে শুধু ফেসওয়াশ, ক্রিম, সিরাম বা অন্য প্রসাধনী ব্যবহারের কথা ভাবেন। কিন্তু ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রাখতে হলে ভেতর থেকে সঠিক পুষ্টি দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। কারণ ত্বক শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ, আর এর স্বাভাবিক গঠন, আর্দ্রতা, মেরামত ও সুরক্ষার জন্য নিয়মিত পুষ্টির জোগান দরকার।
শুধু বাইরে যত্ন নিলেই হবে না-খাদ্যতালিকায় কী আছে, সেটাও ত্বকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভিটামিন, খনিজ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত পানি-সবকিছু মিলিয়েই ত্বকের ভেতরের স্বাস্থ্য গড়ে ওঠে। ভ্যারাইটি বা খাদ্যে বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এক ধরনের খাবার থেকে সব উপকার মেলে না।
ভিটামিন–এ
ত্বকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকে ভিটামিন–এ। এটি ত্বকের কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনে সাহায্য করে। ভিটামিন–এ কম থাকলে ত্বক শুষ্ক, খসখসে বা নিস্তেজ হয়ে যেতে পারে। গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, ডিমের কুসুম এবং কিছু প্রাণিজ খাদ্যে এই ভিটামিন পাওয়া যায়। তাই নিয়মিত এসব খাবার খেলে ত্বক কোমল ও মসৃণ রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।
ভিটামিন–সি
ত্বকের উজ্জ্বলতা, টানটান ভাব ও ক্ষত সারাতে ভিটামিন–সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনএইচএস বলছে, ভিটামিন–সি ত্বক, রক্তনালী, হাড় ও তরুণাস্থি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং wound healing বা ক্ষত সারাতেও ভূমিকা রাখে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, শরীরে কোলাজেন তৈরি করতে ভিটামিন–সি প্রয়োজন হয়, আর কোলাজেনই ত্বকের গঠন ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। লেবু, কমলা, আমলকী, পেয়ারা, টমেটো, স্ট্রবেরি ও ক্যাপসিকামে ভিটামিন–সি ভালো পরিমাণে পাওয়া যায়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এসব খাবার থাকলে ত্বকের সতেজতা ধরে রাখতে সুবিধা হয়।
ভিটামিন–ই
ভিটামিন–ই একটি পরিচিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। মায়ো ক্লিনিকের মতে, এটি কোষকে ফ্রি র্যাডিকেলের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, আর ত্বকও এর বাইরে নয়। সূর্যের আলো, দূষণ, ধোঁয়া ও শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়ায় তৈরি ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধে ত্বককে সুরক্ষা দিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাদাম, সূর্যমুখীর বীজ, অ্যাভোকাডো এবং কিছু উদ্ভিজ্জ তেলে ভিটামিন–ই পাওয়া যায়। নিয়মিত এসব খাবার খেলে ত্বকের বয়সের ছাপ কিছুটা ধীর হতে সাহায্য করতে পারে।
ওমেগা–৩
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। হার্ভার্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ওমেগা–৩ শরীরে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। যাদের ত্বক শুষ্ক, সংবেদনশীল বা সহজে লালচে হয়ে যায়, তাদের জন্য এই স্বাস্থ্যকর চর্বি বিশেষ উপকারী হতে পারে। সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যালমন, সার্ডিন, ম্যাকারেল, এছাড়া আখরোট ও তিসির বীজেও ওমেগা–৩ পাওয়া যায়।
জিংক ও অন্যান্য খনিজ
ত্বকের জন্য জিংক খুব দরকারি একটি খনিজ। এনএইচএস-সংশ্লিষ্ট পুষ্টি তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, ভিটামিন–সি, আয়রন ও জিংক ক্ষত সারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জিংক ত্বকের প্রদাহ কমাতে, ব্রণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং ক্ষত দ্রুত সারাতে কাজে লাগে। ডাল, বাদাম, বীজ, গোটা শস্য, মাংস ও সামুদ্রিক খাবারে জিংক পাওয়া যায়। এছাড়া আয়রন ও সেলেনিয়ামের মতো খনিজও শরীরের সার্বিক স্বাস্থ্যের মাধ্যমে ত্বকের অবস্থায় প্রভাব ফেলে।
প্রোটিন
ত্বকের সুস্থতায় প্রোটিনের গুরুত্ব অনেক। কারণ কোলাজেন ও ইলাস্টিন-ত্বকের গঠন ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুই উপাদান-প্রোটিন থেকেই তৈরি হয়। এনএইচএস বলছে, প্রোটিন শরীরের বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য অপরিহার্য। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, দই, ডাল, ছোলা, মসুর ও অন্যান্য শুঁটি জাতীয় খাবার থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া যায়। ত্বক, চুল, নখ-সবকিছুর স্বাস্থ্য ধরে রাখতে প্রোটিন দরকার।
বি ভিটামিন
ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষায় বি-ভিটামিনও উপকারী। এনএইচএস অনুযায়ী, রিবোফ্লাভিন বা ভিটামিন বি২ ত্বক, চোখ ও স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। আবার ভিটামিন বি৩ বা নিয়াসিনও ত্বক সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই শুধু ভিটামিন–এ, সি, ই নয়-পুরো খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত বি-ভিটামিন থাকাও দরকার। দুধ, ডিম, গোটা শস্য, ডাল, মাছ, মাংস ও সবুজ শাকসবজি থেকে এই ভিটামিনগুলো পাওয়া যেতে পারে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার
টমেটো, বেরি, মটরশুঁটি, ডাল, লেন্টিলস ও বিভিন্ন রঙিন ফল-সবজি ত্বকের জন্য উপকারী হতে পারে, কারণ এগুলোতে নানা ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। মায়ো ক্লিনিকের এক লেখায় বলা হয়েছে, টমেটো, বেরি, বিনস, মটরশুঁটি, লেন্টিলস এবং ফ্যাটি ফিশের মতো খাবার ত্বককে সুরক্ষায় সাহায্য করতে পারে। তাই এক ধরনের খাবারে আটকে না থেকে রঙিন ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়াই ভালো।
পানি
সবশেষে পানি-যেটি প্রায় সবাই জানেন, কিন্তু অনেকেই যথেষ্ট খান না। পর্যাপ্ত পানি না খেলে ত্বক শুষ্ক, টানটান বা নিষ্প্রভ লাগতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের সাম্প্রতিক এক আলোচনায়ও বলা হয়েছে, মানুষ জানে যে hydration ত্বকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এবং পর্যাপ্ত পানি পান ভালো ত্বকের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রতিদিন নিয়মিত পানি পান করা ত্বক সতেজ রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
শুধু খাবার নয়, জীবনযাপনও জরুরি
ত্বক ভালো রাখতে শুধু খাবার নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। মায়ো ক্লিনিকের সাম্প্রতিক আলোচনায় ঘুমের গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ত্বকের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে ধূমপান, অতিরিক্ত রোদ, মানসিক চাপ, কম পানি পান, অনিয়মিত খাবার-এসবও ত্বকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ত্বক ভালো রাখতে চাইলে সুষম খাদ্য, পানি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস-সবকিছু একসঙ্গে দরকার।
সব মিলিয়ে, সুন্দর ত্বক পেতে শুধু বাহ্যিক যত্নের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। ভেতর থেকে পুষ্টি না পেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা ও স্থায়িত্ব ধরে রাখা কঠিন। তাই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ভিটামিন–এ, সি, ই, বি-ভিটামিন, ওমেগা–৩, জিংক, পর্যাপ্ত প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল-সবজি এবং পর্যাপ্ত পানি রাখতে হবে। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যই দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের সবচেয়ে বড় সহায়ক।