{{ news.section.title }}
ডুমস্ক্রোলিং: কিশোর-কিশোরীদের ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যে নতুন ঝুঁকি
পড়াশোনা, মানসিক বিকাশ ও শারীরিক বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম। কিন্তু সেই সময়েই গভীর রাত পর্যন্ত মুঠোফোনের পর্দায় আটকে থাকছে অনেক কিশোর-কিশোরী। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুল খোলার দিনগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি কিশোর-কিশোরী রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করছে।
গবেষকেরা বলছেন, রাতের এই ফোন ব্যবহারের বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও দেখা, গান শোনা, গেম খেলা ও বিনোদনমূলক অ্যাপে কাটে। বিশেষ করে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ বিভিন্ন অ্যাপে দীর্ঘ সময় স্ক্রল করতে করতে অনেকেই ঘুমের সময় হারিয়ে ফেলছে। এই অভ্যাসকে অনেকেই ‘ডুমস্ক্রোলিং’ বলছেন যেখানে ব্যবহারকারী একের পর এক কনটেন্ট দেখতে থাকেন, কিন্তু থামতে পারেন না।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার পেডিয়াট্রিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান লেখক জেসন এম নাগাতা জানান, কিশোর-কিশোরীদের অর্ধেকের বেশি মধ্যরাত থেকে ভোর ৪টার মধ্যেও ফোন ব্যবহার করে। গবেষণায় অ্যাডোলসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট স্টাডির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, রাতের ফোন ব্যবহারের ধরণ কীভাবে ঘুমের সময় কমিয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস ও অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন কিশোর-কিশোরীদের প্রতি রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক কিশোর-কিশোরী এই ঘুম পাচ্ছে না। রাত জেগে ফোন ব্যবহারের ফলে ঘুমাতে দেরি হচ্ছে, ঘুম ভেঙে যাচ্ছে এবং পরদিন স্কুলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের অভাব কিশোরদের মস্তিষ্ক, মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শেখা তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়, মনোযোগ কমে যায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিশোর বয়সে পড়াশোনা, খেলাধুলা, সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগের গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, কম ঘুম কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ, রাগ, বিভ্রান্তি, ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজ বাড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের ঘাটতি মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। এতে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মক্ষতির প্রবণতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের আশঙ্কাও বেড়ে যেতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, রাতের ফোন ব্যবহারের সমস্যা শুধু সময় নষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গেমিং অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রাখে। এতে মস্তিষ্ক উত্তেজিত থাকে এবং ঘুম আসতে দেরি হয়। পাশাপাশি ফোনের আলো, রিংটোন, বার্তা বা নোটিফিকেশনের শব্দ ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে দেয়।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক কিশোর-কিশোরী রাতে ফোন কল, বার্তা বা ই-মেইলের শব্দে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। কেউ কেউ ঘুম ভাঙার পর আবার ফোন ব্যবহার শুরু করে। এতে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং পরদিন ক্লান্তি আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এই সমস্যার সমাধানে পরিবারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। শুধু কিশোর-কিশোরীদের ফোন কমাতে বললেই হবে না; মা-বাবাকেও নিজেদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ অনেক সময় সন্তানরা অভিভাবকদের আচরণ অনুসরণ করে।
পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট ‘ফোনবিহীন সময়’ ও ‘ফোনবিহীন স্থান’ নির্ধারণ করা যেতে পারে। রাতের খাবারের সময়, পড়ার সময় এবং ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা শোবার ঘরে ফোন না রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রয়োজনে পরিবারের সবাই রাতে একটি নির্দিষ্ট বাক্সে ফোন রেখে দিতে পারেন। এতে রাতের নোটিফিকেশন, আলো বা স্ক্রলিংয়ের প্রলোভন কমবে। একই সঙ্গে ঘুমের আগে বই পড়া, হালকা কথা বলা, প্রার্থনা, মেডিটেশন বা শান্ত পরিবেশ তৈরির মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে বলা হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, প্রযুক্তি কিশোরদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে, তাই পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সময়, সীমা ও নিয়ম না থাকলে স্মার্টফোন ঘুম, পড়াশোনা ও মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিশোর বয়সে সুস্থ ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, স্কুল ও সমাজ সব পক্ষের সচেতনতা জরুরি।