পর্যাপ্ত পানি পান করলেও হতে পারে পানিশূন্যতা

পর্যাপ্ত পানি পান করলেও হতে পারে পানিশূন্যতা
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

দেশে তাপমাত্রা ও ভ্যাপসা গরম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। গরমে ঘাম বেশি হয়, শরীর থেকে পানি ও লবণজাতীয় খনিজ বেরিয়ে যায়, আর পর্যাপ্ত তরল না পেলে দ্রুত দেখা দিতে পারে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন।

তবে অনেকেই মনে করেন, শুধু তৃষ্ণা পেলেই বুঝি শরীরে পানির ঘাটতি হয়েছে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। নিয়মিত পানি পান করলেও অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, দীর্ঘসময় রোদে থাকা বা ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়তে পারে।

 

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর যতটা পানি গ্রহণ করে তার চেয়ে বেশি পানি হারালে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। এই পানি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইটও বেরিয়ে যেতে পারে। তাই সব সময় শুধু পানি পান করলেই সমস্যা পুরোপুরি মেটে না; কিছু ক্ষেত্রে শরীরের প্রয়োজন হয় পানি ও খনিজের সঠিক ভারসাম্য। Mayo Clinic জানিয়েছে, ডিহাইড্রেশনের চিকিৎসার মূল পদ্ধতি হলো হারানো তরল ও ইলেক্ট্রোলাইট পূরণ করা; বয়স, পানিশূন্যতার মাত্রা ও কারণ অনুযায়ী পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।

 

পানিশূন্যতা কীভাবে হয়

শরীরের প্রতিটি কোষ, অঙ্গ ও শারীরিক প্রক্রিয়ায় পানির প্রয়োজন। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রক্ত সঞ্চালন, খাবার হজম, কিডনির মাধ্যমে বর্জ্য বের করা, পেশি ও স্নায়ুর কাজ-সব ক্ষেত্রেই পানি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গরমে যখন শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপ বের করে, তখন সেই ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণও হারায়। পর্যাপ্ত তরল না পেলে রক্তের পরিমাণ কমে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে, কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো ব্যাহত হয়, ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

 

MedlinePlus-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিহাইড্রেশনের সাধারণ কারণের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া এবং কিছু রোগ বা অবস্থার কারণে শরীর থেকে বেশি তরল বেরিয়ে যাওয়া। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, কম প্রস্রাব হওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, শুকনো ত্বক, ক্লান্তি ও মাথা ঘোরাকে সাধারণ লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তৃষ্ণা না পেলেও শরীরে পানির ঘাটতি থাকতে পারে

তৃষ্ণা পানিশূন্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, কিন্তু এটি সব সময় প্রথম বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংকেত নয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ বা দীর্ঘসময় বাইরে কাজ করা শ্রমজীবীদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণা অনুভব দেরিতে হতে পারে। Cleveland Clinic জানায়, তৃষ্ণা পাওয়া মানে অনেক সময় শরীরে ইতোমধ্যেই মৃদু পানিশূন্যতা শুরু হয়েছে; এ সময় মাথাব্যথা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা গরমে শুধু তৃষ্ণার ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত বিরতিতে পানি পান, প্রস্রাবের রং ও পরিমাণ লক্ষ্য করা এবং শরীরের দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে বলেন।

 

পানিশূন্যতার সাধারণ লক্ষণ

অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা

পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রামের পরও যদি শরীর দুর্বল লাগে, সহজ কাজেও হাঁপিয়ে যান বা মাথা ভার লাগে, তাহলে সেটি পানির ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে। শরীরে তরল কমে গেলে রক্তের পরিমাণ ও সঞ্চালন প্রভাবিত হয়। এতে পেশি ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছানো কমে গিয়ে ক্লান্তি বাড়তে পারে। Mayo Clinic প্রাপ্তবয়স্কদের পানিশূন্যতার লক্ষণ হিসেবে tiredness বা ক্লান্তি, dizziness বা মাথা ঘোরা এবং confusion বা বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ করেছে।

 

ঘন ঘন মাথাব্যথা

গরমে বারবার মাথাব্যথা, মাথা ভার লাগা বা চোখ ঝাপসা লাগা ডিহাইড্রেশনের কারণে হতে পারে। পানি কমে গেলে রক্তপ্রবাহ, রক্তচাপ ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে, যা মাথাব্যথা বাড়াতে পারে। তবে মাথাব্যথা সব সময় শুধু পানিশূন্যতার কারণে হয় না; মাইগ্রেন, উচ্চ রক্তচাপ, চোখের সমস্যা বা অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি ও বিশ্রামের পরও মাথাব্যথা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

গাঢ় রঙের প্রস্রাব ও প্রস্রাব কমে যাওয়া

পানিশূন্যতার সবচেয়ে সহজ লক্ষণগুলোর একটি হলো প্রস্রাবের রঙ ও পরিমাণের পরিবর্তন। প্রস্রাব যদি গাঢ় হলুদ বা অ্যাম্বার রঙের হয়, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় বা দীর্ঘসময় প্রস্রাব না হয়, তাহলে শরীরে পানির ঘাটতি থাকতে পারে। MedlinePlus গুরুতর পানিশূন্যতার লক্ষণ হিসেবে প্রস্রাব না হওয়া বা খুব গাঢ় হলুদ/অ্যাম্বার রঙের প্রস্রাবের কথা উল্লেখ করেছে।

 

মুখ শুকিয়ে যাওয়া ও ঠোঁট ফেটে যাওয়া

মুখ শুকিয়ে যাওয়া, জিহ্বা শুষ্ক লাগা, ঠোঁট ফেটে যাওয়া বা ত্বক বেশি শুকনো মনে হওয়া পানিশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা এবং দীর্ঘসময় ভেজা ডায়াপার না হওয়া বিশেষ সতর্কতার বিষয়। Mayo Clinic শিশুদের ক্ষেত্রে dry mouth and tongue, no tears when crying এবং no wet diapers for three hours–এর মতো লক্ষণ উল্লেখ করেছে।

 

মনোযোগ কমে যাওয়া ও মানসিক ঝিমঝিম ভাব

পানিশূন্যতা শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তরল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতিতে মনোযোগ কমে যাওয়া, কাজের আগ্রহ কমে যাওয়া, বিরক্তি, মাথা ঝিমঝিম করা বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হতে পারে। MedlinePlus গুরুতর অবস্থায় irritability বা confusion, dizziness, rapid heartbeat, rapid breathing, sunken eyes, listlessness, shock এবং unconsciousness পর্যন্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।

 

পানি পান করেও তৃষ্ণা না মেটা

অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও তৃষ্ণা থেকে যায়, শরীর দুর্বল লাগে বা পেশিতে টান ধরে। এর একটি কারণ হতে পারে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা। অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য খনিজ বেরিয়ে গেলে শুধু সাধারণ পানি শরীরের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘসময় রোদে কাজ, ভারী ব্যায়াম, ডায়রিয়া বা বমির ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

পেশিতে টান বা ক্র্যাম্প

গরমে কাজ করার সময় বা ব্যায়ামের পর পেশিতে টান ধরা, পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা ব্যথা হওয়া পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। CDC-এর NIOSH তথ্য অনুযায়ী, heat cramps হলে পানি পান করা এবং কার্বোহাইড্রেট ও ইলেক্ট্রোলাইট প্রতিস্থাপনকারী খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা যেতে পারে; তবে heart problem, low-sodium diet বা এক ঘণ্টার বেশি ক্র্যাম্প থাকলে চিকিৎসা সহায়তা দরকার।

 

কারা বেশি ঝুঁকিতে

সব মানুষই পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হতে পারেন, তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি বেশি। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, ডায়াবেটিস রোগী, কিডনি রোগী, হৃদরোগী, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বা diuretic জাতীয় ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তি, রোদে কাজ করা শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ক্রীড়াবিদ ও দীর্ঘসময় বাইরে থাকা মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

 

শিশুরা অনেক সময় তৃষ্ণা বুঝিয়ে বলতে পারে না। বয়স্কদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যেতে পারে এবং কিছু ওষুধের কারণে শরীর থেকে পানি বেশি বেরিয়ে যেতে পারে। আবার ডায়রিয়া বা বমি হলে শিশু ও বয়স্করা দ্রুত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারেন। তাই এসব মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই নিয়মিত তরল গ্রহণ ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।

 

শুধু পানি নয়, কখন ইলেক্ট্রোলাইট দরকার

সাধারণ দিনের হালকা গরমে বা স্বাভাবিক কাজকর্মে বেশিরভাগ মানুষের জন্য পানি যথেষ্ট। তবে অতিরিক্ত ঘাম, দীর্ঘসময় রোদে কাজ, ভারী ব্যায়াম, ডায়রিয়া, বমি বা জ্বরের সময় শরীর থেকে পানি ছাড়াও লবণ ও খনিজ বেরিয়ে যায়। তখন ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ORS, লবণ-চিনি-সমৃদ্ধ চিকিৎসাগত রিহাইড্রেশন দ্রবণ, অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত তরল প্রয়োজন হতে পারে।

 

NHS জানায়, বমি বা ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে বেশি তরল হারালে হারানো sugar, salts and minerals পূরণ করতে হয়; এ ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্ট ORS বা oral rehydration solution পরামর্শ দিতে পারেন। NHS Inform আরও বলছে, ডিহাইড্রেশনে শরীর শুধু পানি নয়, sugar and salts–ও হারায়; ORS সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।

 

তবে সব ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংক ORS নয়। বাজারের অনেক পানীয়তে বেশি চিনি বা ফ্লেভার থাকতে পারে, যা ডায়রিয়া বা অসুস্থতার সময় উপযুক্ত নাও হতে পারে। শিশু, ডায়রিয়া, বমি বা জ্বরের ক্ষেত্রে প্যাকেটজাত ORS ব্যবহার করলে প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিষ্কার পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। নিজের মতো করে অতিরিক্ত লবণ বা চিনি যোগ করা বিপজ্জনক হতে পারে।

 

অতিরিক্ত পানি পান করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে

গরমে পানি পান জরুরি, কিন্তু একসঙ্গে অতিরিক্ত পানি পান করাও নিরাপদ নয়। খুব বেশি পানি দ্রুত পান করলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে hyponatremia হতে পারে, যা গুরুতর অবস্থায় বিপজ্জনক। CDC Yellow Book বলছে, mild to moderate exertion বা হালকা থেকে মাঝারি পরিশ্রমের সময় সাধারণত পানি যথেষ্ট; তবে অনেক ঘণ্টা গরমে ব্যায়াম বা কাজ করলে খাবার বা তরলের মাধ্যমে লবণ প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানি পান exercise-associated hyponatremia–এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। তাই নিয়ম হলো, অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করা, একবারে অনেক বেশি পানি না খাওয়া এবং ঘামের মাত্রা, কাজের ধরন ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে তরল গ্রহণ করা।

 

গরমে বাইরে কাজ করলে কী করবেন

যারা রোদে বা গরম পরিবেশে কাজ করেন, তাদের জন্য নিয়মিত বিরতিতে পানি পান, ছায়ায় বিশ্রাম, ঢিলেঢালা পোশাক এবং শরীরের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ খুব জরুরি। CDC/NIOSH তাপজনিত কাজের পরিবেশে প্রতি ১৫–২০ মিনিটে পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে এবং heat cramps হলে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট প্রতিস্থাপনকারী খাবার বা পানীয় গ্রহণের কথা বলেছে।

 

রোদে কাজ করলে শুধু কাজের সময় নয়, কাজ শুরুর আগেই শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা দরকার। দীর্ঘসময় কাজের পর শুধু ঠান্ডা পানি নয়, খাবারের সঙ্গে লবণযুক্ত সুষম খাবার, ফল, সবজি, ডাবের পানি বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ORS নেওয়া যেতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ বা হৃদরোগ থাকলে লবণ বা ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত পানীয় গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

 

কোন খাবার শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে

শুধু পানীয় নয়, কিছু খাবারও শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। তরমুজ, শসা, লেবু, কমলা, মাল্টা, আনারস, বাঙ্গি, টমেটো, লাউ, শাকসবজি, পাতলা ডাল, স্যুপ, দই ও ডাবের পানি গরমে উপকারী হতে পারে। তবে ডাবের পানি বা ফলের রসও সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত, বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে। অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক ও খুব বেশি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো। এগুলো অস্থায়ীভাবে সতেজ লাগালেও সব সময় কার্যকর হাইড্রেশন দেয় না এবং অতিরিক্ত চিনি শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

 

কখন দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে

মৃদু পানিশূন্যতা ঘরে বসে পানি, ORS, বিশ্রাম ও ঠান্ডা পরিবেশে থাকা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সামাল দেওয়া যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে। যদি কারও তীব্র দুর্বলতা, বারবার বমি, পানি খেলেও ধরে রাখতে না পারা, দীর্ঘসময় প্রস্রাব না হওয়া, খুব গাঢ় প্রস্রাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন, শ্বাস দ্রুত হওয়া, চোখ বসে যাওয়া, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, খুব বেশি জ্বর বা heat stroke–এর লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। National Weather Service heat stroke–এর লক্ষণ হিসেবে মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, অস্পষ্ট কথা, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, শরীরের তাপমাত্রা ১০৩°F–এর বেশি হওয়া, গরম/লাল/শুষ্ক বা ভেজা ত্বক, দ্রুত ও শক্তিশালী পালস, অজ্ঞান হওয়া বা চেতনা হারানোর কথা বলেছে।

 

শিশুর ক্ষেত্রে কান্নার সময় চোখে পানি না আসা, তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ভেজা ডায়াপার না হওয়া, অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব, অস্বাভাবিক বিরক্তি, চোখ বসে যাওয়া বা জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

ডিহাইড্রেশন, হিট এক্সহশন ও হিট স্ট্রোক: পার্থক্য জানা জরুরি

ডিহাইড্রেশন হলো শরীরের তরল ঘাটতি। কিন্তু গরমে এটি heat exhaustion বা heat stroke–এর দিকে যেতে পারে। Heat exhaustion–এ অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশিতে টান ও ঠান্ডা-ভেজা ত্বক থাকতে পারে। এই অবস্থায় দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় নেওয়া, পানি বা ORS দেওয়া, ভারী পোশাক ঢিলা করা এবং বিশ্রাম দরকার।

 

Heat stroke আরও বিপজ্জনক। এতে শরীরের তাপমাত্রা খুব বেড়ে যায়, ঘাম বন্ধ হতে পারে বা ত্বক খুব গরম হয়ে যায়, বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হওয়া দেখা দিতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, কারণ দেরি হলে মস্তিষ্ক, কিডনি, হৃদযন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ক্ষতি হতে পারে।

 

প্রতিদিন কত পানি দরকার

প্রতিদিন কত পানি দরকার, এর একক উত্তর নেই। বয়স, ওজন, কাজের ধরন, আবহাওয়া, ঘামের পরিমাণ, খাদ্যাভ্যাস, রোগব্যাধি ও ওষুধের ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে। গরমে, রোদে কাজ করলে, ব্যায়াম করলে বা জ্বর-ডায়রিয়া-বমি থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তরল দরকার হয়। তবে পানি পানের সবচেয়ে সহজ ব্যবহারিক সূচক হলো-প্রস্রাবের রং হালকা হলুদ বা স্বাভাবিক আছে কি না, দিনে কয়েকবার প্রস্রাব হচ্ছে কি না, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা আছে কি না। প্রস্রাব খুব গাঢ়, কম বা দীর্ঘসময় না হলে সতর্ক হতে হবে।

 

ভুল ধারণা এড়িয়ে চলুন

অনেকের ধারণা, “তৃষ্ণা না পেলে পানি দরকার নেই”-এটি ভুল। আবার “যত বেশি পানি, তত ভালো”-এটিও সব সময় ঠিক নয়। গরমে নিয়মিত পানি দরকার, কিন্তু একবারে অস্বাভাবিক বেশি পানি খেলে সমস্যা হতে পারে। আর “ডিহাইড্রেশন মানেই শুধু পানি কমে যাওয়া”-এটিও অসম্পূর্ণ ধারণা; অনেক সময় ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

 

আরেকটি ভুল ধারণা হলো, সব ধরনের বোতলজাত ইলেক্ট্রোলাইট বা স্পোর্টস ড্রিংক ORS–এর বিকল্প। চিকিৎসকেরা বলেন, ডায়রিয়া, বমি বা শিশুদের পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে ORS–এর নির্দিষ্ট সংমিশ্রণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই অসুস্থতার সময় ফার্মেসির ORS বা চিকিৎসকের পরামর্শই নিরাপদ পথ।

 

গরমে হাইড্রেটেড থাকার সহজ উপায়

গরমে বাইরে বের হওয়ার আগে পানি পান করুন। সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। দীর্ঘসময় বাইরে থাকলে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করুন। রোদে কাজ করলে মাঝে মাঝে ছায়ায় বিশ্রাম নিন। খুব বেশি ঘাম হলে পানি ছাড়াও সুষম খাবার ও প্রয়োজন হলে ORS নিন। শিশু ও বয়স্কদের পানি পান করানোর কথা মনে করিয়ে দিন। প্রস্রাবের রং ও পরিমাণ লক্ষ্য রাখুন। ডায়রিয়া বা বমি হলে দ্রুত ORS শুরু করুন এবং অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের কাছে যান।

 

ঈদের সময় বা গরমের মৌসুমে পশুর হাট, বাজার, ভ্রমণ, দীর্ঘ যানজট, রোদে হাঁটা কিংবা কোরবানির কাজের সময় পানিশূন্যতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই আগে থেকেই পানি, ORS, ছাতা, হালকা পোশাক এবং বিশ্রামের পরিকল্পনা রাখা জরুরি।

 

 

পানিশূন্যতা ছোট সমস্যা মনে হলেও অবহেলা করলে এটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তৃষ্ণা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, গাঢ় প্রস্রাব, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা-এসব সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত পানি পান, সুষম খাবার, প্রয়োজনমতো ইলেক্ট্রোলাইট, রোদ এড়িয়ে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের বিশেষ যত্ন-এই কয়েকটি অভ্যাসই গরমে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, গরমে শুধু পানি পান করাই যথেষ্ট নয়; শরীর কী বলছে সেটিও শুনতে হবে। কারণ অনেক সময় পানিশূন্যতার প্রথম সংকেত তৃষ্ণা নয়, বরং অকারণ ক্লান্তি, মাথা ভার লাগা, প্রস্রাবের রঙ বদলে যাওয়া বা মনোযোগ কমে যাওয়াই হতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: Mayo Clinic


সম্পর্কিত নিউজ