আঙুল ফোটানোর অভ্যাস কি সত্যিই ক্ষতিকর? চিকিৎসাবিজ্ঞান যা বলছে

আঙুল ফোটানোর অভ্যাস কি সত্যিই ক্ষতিকর? চিকিৎসাবিজ্ঞান যা বলছে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা কাজের ব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই অজান্তেই আঙুল ফোটাতে শুরু করেন। কারও কাছে এটি স্বস্তির অনুভূতি এনে দেয়, আবার কারও জন্য এটি নিছক একটি অভ্যাস। তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে-বারবার আঙুল ফোটানো কি হাড়, জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির জন্য ক্ষতিকর?

এ নিয়ে প্রচলিত ধারণার অভাব নেই। অনেকেই মনে করেন, নিয়মিত আঙুল ফোটালে বাত (আর্থ্রাইটিস) হতে পারে কিংবা আঙুল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার তথ্য বলছে, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইনের এক প্রতিবেদনে আঙুল ফোটানোর অভ্যাস, এর পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

মানুষ কেন আঙুল ফোটায়?

গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে আঙুল ফোটান। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অনেকে আঙুল ফোটানোর সময় যে শব্দ হয়, সেটিকে স্বস্তিদায়ক মনে করেন। আবার অনেকের ধারণা, এতে আঙুলের চাপ বা অস্বস্তি কমে যায়। মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা একঘেয়েমি কাটানোর উপায় হিসেবেও অনেকেই এই অভ্যাস গড়ে তোলেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি অনেকটা নখ কামড়ানো, কলম ঘোরানো বা চুল পাকানোর মতোই একটি অভ্যাসগত আচরণ। একবার অভ্যাসে পরিণত হলে অনেকেই না বুঝেই বারবার আঙুল ফোটাতে থাকেন।

 

আঙুল ফোটানোর সময় শব্দ কেন হয়?

অনেকের ধারণা, আঙুল ফোটানোর সময় হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণ হওয়ার কারণে শব্দ তৈরি হয়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। ২০১৫ সালে এমআরআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, আঙুলের জোড়া বা জয়েন্ট টান দিলে অস্থিসন্ধির ভেতরে থাকা সাইনোভিয়াল তরলে একটি ক্ষুদ্র ফাঁপা স্থান বা ‘ক্যাভিটি’ তৈরি হয়। এই ক্যাভিটি তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গেই শব্দের সম্পর্ক রয়েছে।

 

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের আরেকটি গবেষণায় গবেষকরা জানান, ওই ফাঁপা অংশটি আংশিকভাবে ভেঙে পড়ার সময়ই পরিচিত ‘পপ’ বা ‘ক্র্যাক’ শব্দটি তৈরি হয়। এ কারণেই একই আঙুল সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোটানো যায় না। কারণ অস্থিসন্ধির ভেতরের সেই ফাঁপা স্থানটি পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাধারণত প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে।

 

আঙুল ফোটানো কি সত্যিই ক্ষতিকর?

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, মাঝেমধ্যে আঙুল ফোটানো সাধারণত গুরুতর কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না। বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত আঙুল ফোটানোর সঙ্গে আর্থ্রাইটিস বা বাত রোগের সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ শুধু আঙুল ফোটানোর কারণে বাত হবে-এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

 

এ বিষয়ে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত গবেষণা। তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে শুধু এক হাতের আঙুল ফোটিয়েছিলেন, অন্য হাতের আঙুল কখনও ফোটাননি। দীর্ঘ সময় পর দুই হাতের মধ্যে আর্থ্রাইটিস বা জয়েন্ট ক্ষয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, কোনো অভ্যাসই অতিরিক্ত মাত্রায় করা ভালো নয়। দিনে অসংখ্যবার জোরে জোরে আঙুল ফোটালে অস্থিসন্ধির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই।

 

কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

আঙুল ফোটানোর সময় যদি কোনো ব্যথা না হয়, তাহলে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকে না। তবে আঙুল ফোটানোর সময় বা পরে যদি ব্যথা, ফোলাভাব কিংবা জয়েন্টে অস্বাভাবিক অস্বস্তি দেখা দেয়, তাহলে সেটি অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন উপসর্গ গাউট, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কিংবা অন্যান্য জয়েন্টজনিত রোগের লক্ষণও হতে পারে।

 

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

নিচের যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত একজন অর্থোপেডিক বা রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

  • আঙুল বা জয়েন্টে স্থায়ী ব্যথা
  • ফোলাভাব বা লালচে ভাব
  • জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
  • আঙুল নাড়াতে বা ভাঁজ করতে অসুবিধা হওয়া
  • আঙুলের স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যাওয়া


চিকিৎসাবিজ্ঞানের চূড়ান্ত মত কী?

বর্তমান গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, মাঝেমধ্যে আঙুল ফোটানো সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং এটি সরাসরি বাত বা হাড় ক্ষয়ের কারণ-এমন প্রমাণও নেই। তবে অতিরিক্ত মাত্রায় কোনো অভ্যাসই ভালো নয়। তাই বারবার বা জোর করে আঙুল ফোটানোর প্রবণতা এড়িয়ে চলাই উত্তম। আর আঙুলে ব্যথা, ফোলাভাব, শক্তভাব বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে, আঙুল ফোটানো নিয়ে প্রচলিত অনেক ভয় ও ভুল ধারণার পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে নিজের শরীরের সংকেতগুলোর প্রতি সচেতন থাকাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।


সম্পর্কিত নিউজ