{{ news.section.title }}
তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তান সেনাপ্রধান
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির। শুক্রবার (২২ মে) ইরানের রাজধানী তেহরানে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈঠকে চলমান যুদ্ধ বন্ধ, উত্তেজনা কমানো এবং পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর থেকেই ইসলামাবাদ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে একাধিক কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এই তেহরান সফরকে সেই বৃহত্তর মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, আসিম মুনির ও আব্বাস আরাগচির বৈঠক গভীর রাত পর্যন্ত চলে। দুই পক্ষ ‘ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ’ বন্ধ এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সর্বশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে মতবিনিময় করেন। আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংঘাত যেন প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে না পড়ে-এসব বিষয় গুরুত্ব পায়।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআরের বরাতে আরব নিউজ জানিয়েছে, আসিম মুনির শুক্রবার তেহরানে পৌঁছালে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি। এ সময় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও উপস্থিত ছিলেন। নাকভি এর আগেও তেহরানে ইরানি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব একযোগে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালাচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্যও পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইডেনে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে রুবিও সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরান সংকট সমাধানে পাকিস্তানের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তিনি পাকিস্তানকে এ প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের “প্রাইমারি ইন্টারলোকিউটর” বা প্রধান যোগাযোগকারী পক্ষ হিসেবেও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সমাধানের জন্য এখনও অনেক কাজ বাকি।
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইউরেনিয়াম মজুত, সামরিক হামলা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌচলাচল। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে এখনও গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, আর ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা চাইছে।
এদিকে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, কাতারও তেহরানে মধ্যস্থতাকারী দল পাঠিয়েছে। তাদের লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পরবর্তী ধাপ নিয়ে সমঝোতার পথ তৈরি করা। এর আগে এ প্রক্রিয়ায় ওমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আর সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান আরও সক্রিয় হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস বাজারেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার সঙ্গে চীনের সমর্থনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে একটি পাঁচ দফা শান্তি প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই প্রস্তাবে সংলাপ, যুদ্ধবিরতি, বেসামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনার সুরক্ষা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও চীনের এমন সমন্বিত অবস্থান ইরান সংকটে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক কাঠামো তৈরির ইঙ্গিত দিতে পারে।
এর আগে এপ্রিলেও আসিম মুনির তেহরান সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই সফরেও পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধ, উত্তেজনা প্রশমন এবং টেকসই আঞ্চলিক শান্তির পক্ষে অবস্থান তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য ইরান সংকট শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি, বাণিজ্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা স্বার্থও জড়িত। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে ইরানকে কেন্দ্র করে বড় আকারের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব পাকিস্তান, আফগানিস্তান, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ার ওপরও পড়তে পারে।
তেহরান বৈঠকের পর এখন নজর থাকবে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান, কাতার, ওমান ও চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা যদি সমন্বিত আকার নেয়, তাহলে যুদ্ধবিরতি বা অন্তত উত্তেজনা কমানোর একটি নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ-এসব প্রশ্নে সমঝোতা না হলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।