{{ news.section.title }}
২০০৮ সালের পর জন্মগ্রহণকারী যে কেউ আজীবনের জন্য তামাক কিনতে পারবেন না
যুক্তরাজ্যে তামাকবিরোধী লড়াইয়ে নতুন এক বড় মোড় এলো। দেশটির পার্লামেন্ট এমন একটি বিল অনুমোদন করেছে, যার ফলে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি বা এর পরে জন্ম নেওয়া কেউই জীবনের কোনো পর্যায়েই বৈধভাবে তামাকজাত পণ্য কিনতে পারবেন না। অর্থাৎ বর্তমানে যাদের বয়স ১৭ বছর বা তার কম, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও সিগারেট বা অন্য তামাকপণ্য কিনতে পারবেন না। সরকারের ভাষায়, এটি হবে দেশের প্রথম “স্মোক-ফ্রি জেনারেশন” গড়ার পথ।
এই আইনটি এসেছে টোব্যাকো অ্যান্ড ভেপস বিলের মাধ্যমে। ২০২৪ সালে হাউস অব কমন্সে বিলটি উত্থাপন করেছিলেন যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং। তার লক্ষ্য ছিল, ধূমপানের কারণে যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তা কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তির হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা। পার্লামেন্টে বিলের যাত্রা শেষ হওয়ার পর স্ট্রিটিং একে জাতির স্বাস্থ্যের জন্য “ঐতিহাসিক মুহূর্ত” হিসেবে বর্ণনা করেন।
ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে উত্তম। তার ভাষায়, এই সংস্কার বহু মানুষের জীবন বাঁচাবে, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএসের ওপর চাপ কমাবে এবং ব্রিটেনকে আরও স্বাস্থ্যকর দেশে পরিণত করতে সহায়তা করবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের শিশুরাই হবে প্রথম ধূমপানমুক্ত প্রজন্ম, যারা আজীবনের আসক্তি ও ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
বিলটি আগামী সপ্তাহে রাজকীয় অনুমোদন বা রয়্যাল অ্যাসেন্ট পেলেই আইনে পরিণত হবে। এরপর সরকারের হাতে তামাক, ভ্যাপিং এবং অন্যান্য নিকোটিন পণ্যের স্বাদ, প্যাকেজিং ও বিপণন নিয়ন্ত্রণে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা চলে আসবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে নিকোটিন পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও বিজ্ঞাপন বন্ধ করার ক্ষমতাও পাবেন মন্ত্রীরা।
শুধু তামাক বিক্রিই নয়, ভ্যাপিং নিয়ন্ত্রণেও বড় পদক্ষেপ রাখা হয়েছে এই বিলে। নতুন ক্ষমতা কার্যকর হলে শিশুদের খেলার মাঠ, শিশু থাকা গাড়ি, স্কুল ও হাসপাতালের বাইরে ভ্যাপিং নিষিদ্ধ করা যাবে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে বিদ্যমান স্মোক-ফ্রি জোন আরও সম্প্রসারণের পথ খুলছে। সরকারের দাবি, তরুণদের মধ্যে ভ্যাপিংয়ের বাড়তি প্রবণতা ঠেকাতেও এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ারের পার্লামেন্টারি আন্ডারসেক্রেটারি ব্যারনেস গিলিয়ান মেরন হাউস অব লর্ডসে বলেন, এটি এক প্রজন্মে সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ। তার মতে, আইনটি বাস্তবায়িত হলে বহু জীবন রক্ষা পাবে। এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ব্রিটিশ সরকার বিষয়টিকে শুধু তামাক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে।
এই পরিকল্পনার শুরু অবশ্য আরও আগে। ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের কনজারভেটিভ সরকার প্রথম ধাপে ধাপে তামাক কেনার আইনি বয়স প্রতি বছর এক বছর করে বাড়ানোর পরিকল্পনা সামনে আনে। উদ্দেশ্য ছিল, এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ভবিষ্যতে কার্যত আর কেউই তামাক কিনতে না পারে। তবে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। পরে ক্ষমতায় এসে লেবার সরকার সেটিকে নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত করে এবং শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টের সমর্থন নিশ্চিত করে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ইংল্যান্ডেই ধূমপানের কারণে বছরে প্রায় ৪ লাখ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন এবং প্রায় ৬৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ক্যানসার, হৃদরোগসহ তামাকসংশ্লিষ্ট অসুস্থতার চিকিৎসায় এনএইচএসের বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হয়। ফলে সরকারের অবস্থান হলো, ধূমপান কমানো মানে শুধু জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নয়, স্বাস্থ্যখাতের আর্থিক চাপও কমানো।
অবশ্য বিলটি সবাই সমর্থন করেননি। ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে দলের নেতা নাইজেল ফারাজ আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে তার দল ক্ষমতায় এলে এই ধূমপান নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হবে। তিনি বিলটিকে “স্পষ্টতই বোকামি” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা, অতিরিক্ত কড়াকড়ি কালোবাজারকে উৎসাহ দিতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যখাতের অনেক সংগঠন ও প্রচারাভিযান দল বিলটিকে স্বাগত জানিয়েছে। অ্যাজমা অ্যান্ড লাং ইউকের প্রধান নির্বাহী সারাহ স্লিট বলেন, এই ঐতিহাসিক আইন দেশের জনস্বাস্থ্যকে বদলে দেবে। তার মতে, ধূমপানমুক্ত ভবিষ্যৎ মানে তামাকশিল্প আর আগামী প্রজন্মের ফুসফুসে ধ্বংস ডেকে আনতে পারবে না। সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের এই আইন শুধু একটি নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিকোটিননির্ভরতা থেকে দূরে রাখার এক দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি।