{{ news.section.title }}
ঘুম না আসলে যে দোয়া পড়তে বলেছেন বিশ্বনবি
রাত মানুষের বিশ্রাম, প্রশান্তি ও নতুন শক্তি সঞ্চয়ের সময়। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে মানুষ যখন ঘুমাতে যায়, তখন দেহ-মন শান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু দুশ্চিন্তা, ভয়, মানসিক চাপ, অস্থিরতা, অতিরিক্ত চিন্তা কিংবা জীবনের নানা অনিশ্চয়তার কারণে অনেকের ঘুম আসে না। কখনো বিছানায় শুয়েও মন অশান্ত থাকে, কখনো ভবিষ্যতের ভাবনা, কখনো অতীতের কষ্ট, আবার কখনো অজানা ভয় মানুষকে ঘুম থেকে দূরে রাখে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ঘুম আল্লাহ তাআলার এক বড় নেয়ামত। পবিত্র কোরআনে রাতকে মানুষের বিশ্রামের সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা রাতকে প্রশান্তির আবরণ বানিয়েছেন, যাতে মানুষ ক্লান্তি দূর করে নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তাই ঘুম শুধু শারীরিক প্রয়োজন নয়; এটি মানসিক প্রশান্তি, সুস্থতা ও আল্লাহর রহমতের একটি নিদর্শন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ছিল আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ। দিনের ব্যস্ততা, দাওয়াত, জিহাদ, শিক্ষা, পরিবার ও উম্মতের দায়িত্বের পাশাপাশি রাতেও তিনি আল্লাহর ইবাদত ও জিকিরে সময় কাটাতেন। তিনি ঘুমের আগেও দোয়া, জিকির ও কোরআন তিলাওয়াত করতেন। সহিহ হাদিসে ঘুমের আগে বিভিন্ন দোয়া ও আমলের কথা এসেছে; যেমন ডান কাতে শোয়া, বিছানা ঝেড়ে নেওয়া, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস পাঠ করা, শেষ দুই আয়াত সুরা বাকারা পাঠ করা এবং ঘুমের দোয়া পড়া। ইসলামকিউএ-তে ঘুমের আগে পাঠযোগ্য সহিহ হাদিসভিত্তিক দোয়াগুলোর একটি তালিকাতেও এসব আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘুম না আসা, ভয় বা অস্থিরতার সময় পড়ার জন্য আলেমদের আলোচনায় একটি দোয়া পাওয়া যায়। ইসলামকিউএ হাদিসআনসার-এর আলোচনায় এটিকে অনিদ্রা বা অস্থিরতার সময় উপযোগী দোয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
اَللّٰهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعِ وَمَا اَظَلَّتْ وَرَبَّ الْاَرَضِيْنَ وَمَا اَقَلَّتْ وَرَبَّ الشَّيَاطِيْنَ وَمَا اَضَلَّتْ كُنْ لِّيْ جَارًا مِّنْ شَرِّ خَلْقِكَ كُلِّهِمْ جَمِيْعًا اَنْ يَفْرُطَ عَلَيَّ اَحَدٌ مِّنْهُمْ اَوْ اَنْ يَّبْغِيَ عَزَّ جَارُكَ وَجَلَّ ثَنَاؤُكَ لَاۤ اِلٰهَ غَيْرُكَ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اَنْتَ
উচ্চারণ: আল্লাাহুম্মা রব্বাস সামাওয়াা তিস সাব‘ই ওয়ামাা আযা ল্লাত ওয়া রব্বাল আরাযীনা ওয়ামাা আক্বাল লাত ওয়া রব্বাশ শায়াা ত্বীনি ওয়ামাা আযাল লাত কুন লী জাা রন মিন শাররি খলক্বিকা কুল্লিহিম জামী‘আন আন ইয়াফরুত্বা ‘আলাইয়্যা আহাদুন মিনহুম আউ আন ইয়াবগিয়া ‘আযযা জাা রুকা ওয়া জাল্লা সানাা উকা ওয়ালাা ইলাহা গইরুকা লাا ইলাাহা ইল্লাا আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি সপ্ত আকাশের প্রতিপালক এবং ঐ সকল বস্তুর প্রতিপালক, যার উপর সপ্তম আকাশ বিস্তার করে আছে এবং যিনি সমগ্র জমিনের প্রতিপালক এবং ঐ সকল বস্তুর প্রতিপালক যা সমগ্র জমিন বহন করে আছে এবং যিনি শয়তান ও ঐ লোকদের প্রতিপালক যাদেরকে শয়তান গোমরা করেছে।
হে প্রতিপালক আল্লাহ! আপনি সমগ্র মাখলুকের অনিষ্ট হতে আমার রক্ষাকারী এবং আশ্রয়দাতা হয়ে যান। যাতে এ সকল মাখলুকের মধ্য হতে কোন মাখলুক আমার উপর অত্যাচার-অবিচার করতে না পারে। নিশ্চয়ই একমাত্র আপনার আশ্রিত ব্যক্তিই প্রভাবশালী নিরাপদ এবং একমাত্র আপনার প্রশংসাই অতি মহান। আপনি ছাড়া অপর কোনো মা‘বুদ নেই। একমাত্র আপনি ইবাদতের যোগ্য।
এই দোয়াটির মর্ম অত্যন্ত গভীর। এতে বান্দা আল্লাহকে আসমান, জমিন, শয়তান ও সব সৃষ্টির রব হিসেবে স্বীকার করে তাঁর আশ্রয় কামনা করে। রাতের অন্ধকারে যখন ভয়, দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতা মানুষকে ঘিরে ধরে, তখন এই দোয়া মুমিনকে মনে করিয়ে দেয়-সব ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
ইসলামী আলেমরা বলেন, ঘুম না আসার সময় শুধু দোয়া পড়াই নয়; আল্লাহর ওপর ভরসা, গুনাহ থেকে তওবা, অন্তরকে অহেতুক চিন্তা থেকে সরিয়ে আনা এবং জিকিরে নিজেকে ব্যস্ত করা জরুরি। কারণ অনেক সময় ঘুমের অস্থিরতা শুধু শারীরিক নয়; তা মানসিক ও আত্মিক অশান্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
হাদিসে এসেছে-হযরত জাবির (রা.) বলেন,
আমি রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো ব্যক্তি (আল্লাহর কাছে) কোনো কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআলা তাকে তা দান করেন। অথবা তদানুযায়ী তার থেকে কোনো অমঙ্গল প্রতিহত করেন। যতক্ষণ না সে কোনো পাপাচারে লিপ্ত হয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে। (তিরমিজি)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, দোয়া কখনো বিফলে যায় না। বান্দা যা চায়, আল্লাহ কখনো তা সরাসরি দান করেন, কখনো তার অনুরূপ কোনো অমঙ্গল দূর করেন, আবার কখনো আখিরাতের জন্য তার প্রতিদান জমা রাখেন। তবে দোয়া হতে হবে বৈধ বিষয়ে; পাপের কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করা যাবে না।
রাসুল সা. বলেছেন, যদি কেউ চায় যে বিপদের সময় তার দোয়া কবুল হোক, তাহলে সে যেন সুখের দিনগুলোতে বেশি বেশি দোয়া করে। (তিরমিজি ৩৩৮২)
সুনানে তিরমিজির এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন-কষ্টের সময় দোয়া কবুলের আশা রাখলে স্বস্তির সময়ও বেশি বেশি দোয়া করতে হবে। অর্থাৎ দোয়া শুধু বিপদে পড়লে নয়; সুস্থতা, নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তির সময়েও মুমিনের নিয়মিত আমল হওয়া উচিত।
ঘুমের আগে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল কোরআন তিলাওয়াত। হাদিসে এসেছে, তিনি ঘুমানোর আগে সুরা ইসরা ও সুরা যুমার পাঠ করতেন। ইসলামকিউএ-এর ঘুমের দোয়া সংক্রান্ত আলোচনায় তিরমিজির বর্ণনার ভিত্তিতে এই আমলের কথাও উল্লেখ আছে।
এ ছাড়া ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি পাঠের বিশেষ ফজিলত সহিহ হাদিসে এসেছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়ে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারে না। তাই রাতে ভয়, অস্থিরতা বা দুঃস্বপ্নের আশঙ্কা থাকলে আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করা অত্যন্ত উপকারী আমল।
ঘুমের আগে আরেকটি সুন্নত হলো অজু করে ঘুমানো। অজু শুধু বাহ্যিক পবিত্রতা নয়; এটি অন্তরেও প্রশান্তি আনে। একজন মুমিন যখন অজু করে, বিছানা ঝেড়ে, ডান কাতে শুয়ে আল্লাহর নাম নেয়, তখন তার ঘুমও ইবাদতের আবহে শুরু হয়। হাদিসভিত্তিক বিভিন্ন দোয়ার সংকলনে ঘুমের আগে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহইয়া” এবং ঘুম থেকে উঠে “আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা…” পড়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ইসলামী শিক্ষায় রাতকে শুধু বিশ্রামের সময় নয়; আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সময় হিসেবেও দেখা হয়েছে। দিনের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা, পরিবার-পরিজনের জন্য দোয়া করা, রোগ-শোক ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি চাওয়া-এসব রাতের নীরবতায় আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
তবে ঘুম না আসার সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শুধু দোয়া পড়ে বসে থাকা নয়; প্রয়োজনীয় জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনা উচিত। ইসলামী দৃষ্টিতে শরীরও আল্লাহর আমানত। তাই অতিরিক্ত রাত জাগা, অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার, মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাবার, অতিরিক্ত চা-কফি বা দুশ্চিন্তার কারণগুলো কমানোও জরুরি। দোয়া ও সুন্নত আমলের পাশাপাশি সুস্থ ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা একজন মুমিনের দায়িত্বের অংশ।
ঘুমের আগে কিছু উপকারী আমল হতে পারে-অজু করা, বিছানা ঝেড়ে নেওয়া, ডান কাতে শোয়া, আয়াতুল কুরসি পাঠ করা, সুরা ইখলাস-ফালাক-নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া, নিজের গুনাহের জন্য ইস্তিগফার করা, সবাইকে ক্ষমা করে ঘুমানো এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। এসব আমল অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং রাতে ভয়-অস্থিরতা কমাতে সহায়ক হয়।