{{ news.section.title }}
শয়তান থেকে দূরে থাকতে ইসলামের ১০ গুরুত্বপূর্ণ আমল
মানবজাতির চিরশত্রু শয়তান। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে শয়তানের ধোঁকা, কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা থেকে সতর্ক করেছেন। শয়তান আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছিল, নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চায়নি; বরং অহংকার, জিদ ও হিংসার ওপর অটল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে বিভ্রান্ত করার অবকাশ চেয়েছে।
আল্লাহ তাআলা তাকে সেই সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষকে দিয়েছেন কোরআন, বিবেক-বুদ্ধি, নবী-রাসুলের শিক্ষা এবং জিকির-আজকারের শক্তিশালী সুরক্ষা।
কোরআনে আল্লাহ বললেন, ‘আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সিজদা করতে বারণ করল? সে বলল, আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। ’আল্লাহ বললেন, তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোনো অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা: আরাফ, আয়াত: ১২, ১৩)
এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, শয়তানের প্রথম অপরাধ ছিল অহংকার। সে নিজের সৃষ্টি উপাদানকে বড় মনে করেছে এবং আল্লাহর আদেশের সামনে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। তাই শয়তানের পথ থেকে বাঁচার প্রথম শিক্ষা হলো-অহংকার নয়, আত্মসমর্পণ; জিদ নয়, তওবা; নিজের ইচ্ছা নয়, আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করা।
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে চায় মানুষ যেন আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যায়, গুনাহকে সহজ মনে করে, ভালো কাজ পিছিয়ে দেয়, ইবাদতে অলসতা করে, পরিবার-সমাজে অশান্তি ছড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত জান্নাতের পথ হারিয়ে ফেলে। তবে আল্লাহ তাআলা শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার বহু পথ শিক্ষা দিয়েছেন। আপনার দেওয়া মূল লেখাতেও এসব আমলের গুরুত্বপূর্ণ তালিকা এসেছে।
১. ইখলাসের সঙ্গে কাজ করা
শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় ঢাল হলো ইখলাস। ইখলাস মানে-সব কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। নামাজ, রোজা, দান, দাওয়াত, জ্ঞানচর্চা, পরিবারকে সময় দেওয়া-সবকিছুর উদ্দেশ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, তাহলে শয়তানের প্রবেশপথ সংকুচিত হয়ে যায়।
ইখলাস না থাকলে ভালো কাজও লোকদেখানো, অহংকার বা স্বার্থে পরিণত হতে পারে। শয়তান মানুষকে অনেক সময় গুনাহের মাধ্যমে নয়, বরং নেক আমলের ভেতর অহংকার ঢুকিয়ে ধ্বংস করতে চায়। তাই মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজের আগে নিজের নিয়ত যাচাই করা।
আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন,
‘আমি তুই আর তাদের মধ্যে যারা তোর অনুগামী হবে তাদের সকলের দ্বারা জাহান্নাম ভরে ফেলব।’ (সুরা: সোয়াদ, আয়াত ৮৫)
এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে-শয়তানের অনুসরণ শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথ। আর ইখলাস মানুষকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আল্লাহর দলে অন্তর্ভুক্ত করে।
২. খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা
খাবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজ। কিন্তু ইসলাম সাধারণ কাজকেও ইবাদতে রূপান্তর করার শিক্ষা দিয়েছে। খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা শুধু আদব নয়; এটি শয়তানকে খাবারে শরিক হওয়া থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যম।
রাসুল সা. বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ খাবার খায়, তখন সে যেন বিসমিল্লাহ বলে। যদি সে খাবার গ্রহণের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তবে সে যেন পরে বলে, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরা’ অর্থ: আমি আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করছি প্রথমে এবং শেষে। (মুসলিম, হাদিস ৫০৯৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৭৬৭)
সুনানে আবু দাউদের খাবার সংক্রান্ত অধ্যায়েও খাবারের সময় আল্লাহর নাম স্মরণের গুরুত্ব এসেছে। সেখানে ঘরে প্রবেশ ও খাবারের সময় আল্লাহর নাম নিলে শয়তান ওই ঘরে রাতযাপন ও খাবারের সুযোগ পায় না বলে বর্ণিত হয়েছে। এখানে শিক্ষা হলো-খাবার শুধু শরীরের প্রয়োজন নয়; তা আল্লাহর দেওয়া রিজিক। তাই রিজিক গ্রহণের শুরুতে রিজিকদাতার নাম স্মরণ করা মুমিনের পরিচয়।
৩. ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলা
মানুষের ঘর তার আশ্রয়স্থল। কিন্তু ঘরেও শয়তানের কুমন্ত্রণা, অশান্তি ও প্রভাব প্রবেশ করতে পারে। তাই ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া, সালাম দেওয়া এবং জিকির করা সুন্নাহসম্মত আমল।
হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার তিনি নবী সা.-কে এরূপ বলতে শোনেন, যখন কোন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করে এবং ভেতরে প্রবেশের সময় ও খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে, তখন শয়তান বলে, এখানে তোমাদের জন্য রাতে থাকার কোন স্থান নেই, আর খানাও নেই।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশের সময় বিসমি্ল্লাহ বলে না, তখন শয়তান বলে, তোমরা রাতে থাকার স্থান পেয়েছ। এরপর সে ব্যক্তি খাবার সময় যখন বিসমিল্লাহ বলে না, তখন শয়তান (তার সাথীদের) বলে, তোমরা রাতে থাকার স্থান এবং খাবার পেয়ে গেছ। (মুসলিম, হাদিস ২০১৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৭৬৫)
ইসলামকিউএ-এর আলোচনায়ও ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং সালাম দেওয়াকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে ঘর আল্লাহর স্মরণে শুরু হয় এবং শয়তানের অংশগ্রহণ বন্ধ হয়।
৪. ওয়াশরুমে প্রবেশের আগে দোয়া পড়া
শৌচাগার এমন স্থান, যেখানে মানুষ দুর্বল ও অসুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। ইসলাম এ সময়ও মুমিনকে দোয়া ও আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছে। ওয়াশরুমে প্রবেশের আগে দোয়া পড়া শয়তান ও জিনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার মাধ্যম।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন,
জ্বীনদের চোখ ও আদম সন্তানের লজ্জাস্থানের মাঝে পর্দা হল এই যে, কেউ যখন শৌচাগারে প্রবেশ করবে, তখন সে বলবে ‘বিসমিল্লাহ’। (ইবনে মাজাহ হাদিস ২৯৭, বোখারি হাদিস ৪৫১১)
এ আমলের শিক্ষা হলো-মুমিনের লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতা শুধু মানুষের সামনে নয়; অদৃশ্য জগতের অনিষ্ট থেকেও সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়।
৫. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দোয়া পড়া
মানুষ যখন ঘর থেকে বের হয়, তখন সে নানা বিপদ, ফিতনা, দুর্ঘটনা, অন্যায়, শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং মানুষের ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করা, হিদায়াত চাওয়া এবং শক্তি-ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে আসে-এ কথা স্বীকার করার শিক্ষা দিয়েছেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, যখন কোন লোক তার ঘর থেকে বের হয়, তখন তার সাথে দু'জন ফিরিশতা থাকে, যাদেরকে তার জন্য নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর যখন সে 'বিস্মিল্লাহ' বলে তখন তাঁরা (ফিরিশতাদ্বয়) বলেন তোমাকে হিদায়ত দান করা হয়েছে আর যখন সে لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ বলে, তখন তাঁরা বলেন তোমাকে রক্ষা করা হয়েছে। যখন সে تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ বলে, তখন তারা বলেন, তোমার জন্য (আল্লাহ) যথেষ্ট হয়েছে। অতঃপর তার সাথে দু'জন সাক্ষাৎ করে। তখন ফিরিশতাদ্বয় বলেন, এমন লোককে তোমরা কি করতে চাও, যাকে হিদায়াত দান করা হয়েছে, এবং যাকে রক্ষা করা হয়েছে যার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট হয়েছেন। (আবু দাউদ হাদিস ৫০৯৫, ইবনে মাজা হাদিস ৩৮৮৬।
ইসলামিক হেরিটেজ সেন্টারের আদকার সংকলনেও ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়ার জিকিরকে মুমিনের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও তাওয়াক্কুলের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৬. নামাজের কাতারের মধ্যখানে ফাঁকা বন্ধ করে দাঁড়ানো
শয়তান শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, জামাতের ইবাদতেও বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়। তাই জামাতে নামাজের সময় কাতার সোজা করা, ফাঁক বন্ধ করা এবং মুসল্লিদের একতাবদ্ধভাবে দাঁড়ানো গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
হযরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা নামাজের কাতার সোজা করবে, বাহুকে সমপর্যায়ে রাখবে, ফাঁকসমূহ পূর্ণ করবে। মধ্যখানে শয়তানের (জন্য) ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি কাতার সোজা করে মিলিয়ে দাঁড়ায় আল্লাহ তাকে (আপন রহমতের সহিত মিলান। আর যে ব্যক্তি কাতার পৃথক করে আল্লাহও তাহাকে (আপন রহমত হইতে) পৃথক করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৬৬৫, মিশকাত, হাদিস ১১০২)
কাতার সোজা করার মধ্যে শুধু বাহ্যিক শৃঙ্খলা নয়; বরং উম্মাহর ঐক্য, বিনয়, আনুগত্য ও শয়তানের বিভক্তি সৃষ্টির পথ বন্ধ করার শিক্ষা রয়েছে।
৭. হাই উঠলে হাত দ্বারা মুখ বন্ধ করা
হাই তোলা স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.) এটিকে শয়তানের সঙ্গে সম্পর্কিত করে শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। হাই উঠলে মুখ খোলা রাখা, শব্দ করা বা অবহেলা করা উচিত নয়। মুখ বন্ধ করা বা হাতে ঢেকে রাখা সুন্নাহ।
হাই উঠার সময় মুখে হাত দিয়ে বাধা দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, হাই তোলা শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে। কাজেই তোমাদের কারো যখন হাই আসবে তখন তা সাধ্যমত রোধ করবে। হাই তোলার সময় যেন ‘হা’ না হয়, কেননা শয়তান তাতে হাসে (বুখারি হাদিস ৩২৮৯, মিশকাত হাদিস ৯৮৬)। অন্য হাদিসে আছে, রাসুল সা. বলেন,
যদি তোমাদের কেউ হাই তোলে তবে সে যেন তার মুখের উপর হাত রেখে তাকে প্রতিহত করে। কেননা এ সময় শয়তান (মুখ দিয়ে) প্রবেশ করে (মুসলিম হাদিস ২৯৯৫, মিশকাত হাদিস ৯৮৫)।
ইসলামকিউএ-এর আলোচনায়ও হাই উঠলে মুখ ঢেকে রাখা এবং তা যথাসম্ভব রোধ করার নির্দেশকে সুন্নাহসম্মত আদব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৮. সন্ধ্যার সময় দরজা-জানালা বন্ধ করা ও শিশুদের ঘরে রাখা
সন্ধ্যা এমন সময়, যখন শয়তান ও ক্ষতিকর অদৃশ্য সৃষ্টির চলাচল সম্পর্কে হাদিসে সতর্কতা এসেছে। তাই সন্ধ্যার সময় শিশুদের বাইরে না রাখা, দরজা বন্ধ করা, খাবারের পাত্র ঢেকে রাখা এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করা সুন্নাহ।
হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন রাত ঘনিয়ে আসবে অথবা (বলেছেন) তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হবে, তখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের আটকে রাখবে। কেননা শয়তান সেসময় চলাফেরা করে। রাত ঘন্টাখানেক অতিক্রান্ত হলে তাদের ছেড়ে দাও। আর দরজাগুলো বন্ধ করবে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। কারণ, শয়তান কোন বন্ধ দুয়ার খোলে না। আর তোমরা নিজেদের মশকসমূহের মুখ এঁটে রাখবে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। আর নিজেদের পাত্রগুলো ঢেকে রাখবে এবং যদি তার ওপর একটি কাঠি রেখেও হয় এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। আর তোমাদের বাতিগুলো নিভিয়ে দেবে। (মুসলিম, ৫০৮০, বোখারি ৫১৪৮)
এ হাদিসে একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও বাস্তব নিরাপত্তা রয়েছে। দরজা বন্ধ করা, পাত্র ঢেকে রাখা, আগুন নিভানো-এসব ঘরের নিরাপত্তারও অংশ। আর আল্লাহর নাম স্মরণ করা শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষা।
৯. এ দোয়াটি ১০০ বার পড়া
দৈনন্দিন জিকিরের মধ্যে এই তাওহিদের দোয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এটি শুধু সওয়াবের মাধ্যম নয়; বরং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে দিনের জন্য রক্ষাকবচ।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ (আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই; তিনি একক, তাঁর কোন শরিক নেই; রাজত্ব তাঁরই, যাবতীয় প্রশংসা তাঁরই; তিনিই সবকিছু উপর ক্ষমতাবান)
এই দোয়া যে দিনে একশ বার পাঠ করে সে দশজন গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে, তার আমল নামায় একশ নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তার থেকে একশ গোনাহ মুছে দেওয়া হবে। আর তা ঐ দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান (তার কুমন্ত্রণা) থেকে তার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে যায়। সেদিন সে যা করেছে তার চেয়ে উত্তম পুণ্য সম্পাদনকারী কেউ হবে না। কিন্তু কেউ তার বেশি আমল করলে তার কথা ভিন্ন। (বোখারি, হাদিস ৬৪৩, মুসলিম, হাদিস ৬৫৯৮।
ইসলামকিউএ ও ইসলামকিউএ হাদিসআনসার-দুই জায়গাতেই এই জিকিরের ফজিলত উল্লেখ আছে: দিনে ১০০ বার পাঠ করলে দশজন দাস মুক্ত করার সওয়াব, ১০০ নেকি, ১০০ গুনাহ মাফ এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। এ জিকিরের মূল শিক্ষা হলো তাওহিদ। যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ব, রাজত্ব, প্রশংসা ও সর্বশক্তিমান ক্ষমতাকে বারবার ঘোষণা করে, তার অন্তরে শয়তানের ভয়, দুনিয়ার মোহ এবং মানুষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে যায়।
১০. সবসময় আল্লাহর আশ্রয় কামনা করা
শয়তানের কুমন্ত্রণা কখনো ইবাদতের সময় আসে, কখনো রাগের সময়, কখনো হতাশায়, কখনো গুনাহের আহ্বানে, কখনো অহংকারে, আবার কখনো ভালো কাজ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে। তাই শয়তানের ধোঁকা অনুভব করলেই আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া জরুরি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যদি শয়তানের পক্ষ হতে তোমাকে কোনও কুমন্ত্রণা দেওয়া হয়, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা: আরাফ, আয়াত: ২০০)
এ আয়াতে সকল মুসলিমকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে, শয়তান আমাদের মনে কখনও মন্দ ভাবনার প্রতি প্ররোচনা দিলে সঙ্গে-সঙ্গে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত।
ইসলামকিউএ-এর জিন ও শয়তানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা সংক্রান্ত আলোচনায় বলা হয়েছে, কোরআন তিলাওয়াত, শরিয়তসম্মত জিকির-আজকার, বিসমিল্লাহ বলা এবং আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া-এসবই শয়তান ও জিনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার মাধ্যম।
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল
শয়তান থেকে বাঁচতে উপরোক্ত ১০ আমলের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় মুমিনের জীবনে জরুরি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত ফরজ নামাজ আদায় করা। নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। যে ঘরে নামাজ, কোরআন, জিকির ও সালাম চালু থাকে, সে ঘর আল্লাহর রহমতের পরিবেশে থাকে।
দ্বিতীয়ত, ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা। সহিহ হাদিসে এসেছে, যে ঘরে সুরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান সে ঘর থেকে দূরে সরে যায়-এ মর্মে আলেমরা ঘরে কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। ইসলামকিউএ-এর জিন থেকে সুরক্ষা বিষয়ক আলোচনায়ও সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত ও কোরআন-জিকিরের সুরক্ষামূলক গুরুত্ব এসেছে।
তৃতীয়ত, রাগের সময় আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া। শয়তান মানুষের রাগকে ব্যবহার করে পরিবার ভাঙে, সম্পর্ক নষ্ট করে, মুখ দিয়ে অন্যায় কথা বের করায় এবং পরে অনুশোচনায় ফেলে। তাই রাগ উঠলে ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়া, অজু করা, অবস্থান পরিবর্তন করা এবং নীরব থাকা উপকারী।
চতুর্থত, একাকী গুনাহ থেকে বাঁচা। শয়তান মানুষকে বলে-কেউ দেখছে না। কিন্তু মুমিন জানে, আল্লাহ সব দেখছেন। গোপনে আল্লাহকে ভয় করা শয়তানের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
পঞ্চমত, ভালো সঙ্গ গ্রহণ করা। শয়তান একাকী মানুষকে বেশি আক্রমণ করে; আর খারাপ সঙ্গ সেই আক্রমণকে সহজ করে। তাই আল্লাহভীরু বন্ধু, সৎ পরিবেশ, জ্ঞানী আলেমের পরামর্শ এবং নেককারদের মজলিস মুমিনকে সুরক্ষিত রাখে।
শয়তানের ধোঁকার ধরন বুঝতে হবে
শয়তান সব মানুষের কাছে একইভাবে আসে না। একজন আলেমের কাছে সে অহংকার দিয়ে আসে, একজন ব্যবসায়ীর কাছে হারাম লেনদেন দিয়ে আসে, একজন তরুণের কাছে কামনা-বাসনা দিয়ে আসে, একজন ইবাদতকারীর কাছে লোকদেখানো দিয়ে আসে, একজন গুনাহগারের কাছে হতাশা দিয়ে আসে। তাই শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে নিজের দুর্বলতা জানা জরুরি।
কখনো সে বলে, “এখনো সময় আছে, পরে তওবা করবে।” কখনো বলে, “তোমার গুনাহ এত বেশি, আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।” অথচ দুটিই ধোঁকা। মুমিন গুনাহকে হালকা ভাবে না, আবার আল্লাহর রহমত থেকেও নিরাশ হয় না।
শয়তানের সঙ্গে মানুষের লড়াই এক দিনের নয়; এটি জীবনব্যাপী পরীক্ষা। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে অসহায় রেখে দেননি। কোরআন, সুন্নাহ, দোয়া, জিকির, নামাজ, ইখলাস, বিসমিল্লাহ, তাওয়াক্কুল, সালাম, ঘরের আদব, খাবারের আদব, কাতারের শৃঙ্খলা-সবকিছুই মুমিনের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা।
শয়তান শক্তিশালী নয়; শক্তিশালী হলো আল্লাহর আশ্রয়। যে বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করে, বিসমিল্লাহ দিয়ে কাজ শুরু করে, গুনাহের মুহূর্তে আল্লাহকে ভয় করে, ঘরে-বাইরে দোয়া পড়ে, নিয়মিত জিকির করে এবং তাওহিদের ঘোষণা দিয়ে দিন কাটায়-শয়তান তার ওপর সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের শয়তানের ধোঁকা, কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা থেকে হেফাজত করুন; ইখলাস, জিকির, কোরআন ও সুন্নাহর পথে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।