বাজেট ২০২৬-২৭: স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি

বাজেট ২০২৬-২৭: স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন, চিকিৎসা অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার উপস্থাপিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসা শিক্ষা উন্নয়ন, নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং স্বাস্থ্য খাতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। তুলনামূলকভাবে এটি একটি বড় বৃদ্ধি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ২১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা, আর মূল বাজেটে ছিল ১৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উন্নয়ন ব্যয় বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এই বাড়তি বরাদ্দ দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, নতুন হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন, আইসিইউ ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১২১ কোটি টাকা এবং মূল বাজেটে ছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিভাগের উন্নয়ন খাতে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

 

স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বাড়তি বরাদ্দের ফলে সরকারি মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা গবেষণা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির সক্ষমতাও বাড়বে।

 

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল মাত্র ২ হাজার ১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা পরে সংশোধিত বাজেটে কমে ৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় নেমে আসে।

 

একইভাবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য এডিপি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে প্রকৃত ব্যয় ছিল ৪১২ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে ৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা করা হয়েছিল।

 

দুই বিভাগের সম্মিলিত উন্নয়ন বরাদ্দ বা এডিপি দাঁড়াচ্ছে ৩৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বরাদ্দ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং বরাদ্দের কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

এদিকে সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

 

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতির ৪৮ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে এবং বাকি ৫২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

 

নতুন বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।

 

কর ও শুল্ক ব্যবস্থায়ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে জমা ও ঋণের ক্ষেত্রে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে, যেখানে আগে এ সীমা ছিল ৩ লাখ টাকা।

 

তবে কিছু ক্ষেত্রে নতুন কর ও ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবও রয়েছে। বাজেটে প্রতি ভরি স্বর্ণের ওপর ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মদের ওপর নতুন করে প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপের কথা বলা হয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দের মাধ্যমে সরকার চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তবে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাসময়ে এবং সঠিকভাবে ব্যয় করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


সম্পর্কিত নিউজ