{{ news.section.title }}
চলতি অর্থবছরে ইইউতে পোশাক রফতানি কমেছে ৬৪০ মিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। সেই শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কিন্তু চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে উদ্বেগজনক ধীরগতি দেখা গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৬৪০ মিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন এবং খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাত প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারেনি।
মে মাসে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
তবে পুরো চিত্রটি একেবারে হতাশার নয়। অর্থবছরের অধিকাংশ সময় রপ্তানি কম থাকলেও মে মাসে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে মে মাসে ১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে জানুয়ারির পর এটিই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানি আয়। জানুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছিল ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউরোপের বড় বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে নতুন অর্ডার দেওয়া শুরু করায় এই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে এটিকে এখনও স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।
শুরু থেকেই ছিল চাপ
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি চাপে ছিল। জুলাই মাসে রপ্তানি হয়েছিল ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যে সেপ্টেম্বরে তা নেমে আসে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে।
পরবর্তী মাসগুলোতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে এবং মার্চে আরও কমে ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এর ফলে বছরের প্রথমার্ধে তৈরি হওয়া ঘাটতি মে মাসের প্রবৃদ্ধি দিয়েও পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
জার্মানি এখনো সবচেয়ে বড় বাজার
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানি গন্তব্য জার্মানি। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪০৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। এপ্রিল মাসে যা ছিল ৩১৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জার্মান বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে জুলাই মাসে জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছিল ৪৭১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় বর্তমান অবস্থান এখনো নিচে রয়েছে। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, জার্মান বাজারে চাহিদা পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি।
মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশই গেছে জার্মানিতে।
স্পেনে স্থিতিশীল চাহিদা
বাংলাদেশি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরোপীয় বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে স্পেন। মে মাসে দেশটিতে ৩০০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এপ্রিল মাসে এই পরিমাণ ছিল ২৮৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। যদিও প্রবৃদ্ধি খুব বেশি নয়, তবে স্পেনের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।
কেন কমছে রপ্তানি?
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইউরোপের ভোক্তারা এখনও মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিচ্ছেন। ফলে পোশাকসহ অপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন অনেকেই। দ্বিতীয়ত, ইউরোপের বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন আগের তুলনায় কম পরিমাণে অর্ডার দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার দেওয়ার সিদ্ধান্তও বিলম্বিত করছে। তৃতীয়ত, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
এ ছাড়া পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তাও রপ্তানি খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে।
আগের বছরের প্রবৃদ্ধি ছিল মূল্যভিত্তিক
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছিল পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি থেকে। প্রকৃত অর্থে ক্রয়াদেশের সংখ্যা বা রপ্তানি পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য সমন্বয় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
আশাবাদ দেখছে ইপিবি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক আলমগীর হোসেন মনে করেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুর দিকে রপ্তানিতে যে বড় ধরনের পতন দেখা গিয়েছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় বাজারে নতুন অর্ডার এবং ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তনের মুখে না পড়লে অর্থবছরের শেষ দিকে রপ্তানি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগিতা ধরে রাখা এবং নতুন বাজারে প্রবেশ করা। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশগত ও শ্রমসংক্রান্ত বিধিনিষেধ পূরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এদিকে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে এখন থেকেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও মে মাসের প্রবৃদ্ধি কিছুটা আশার বার্তা দিচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের শিল্পখাতকেও আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে।