{{ news.section.title }}
কর ফাঁকি রোধে সকল পণ্যে কিউআর কোড চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর ফাঁকি রোধ ও কর ভিত্তি বৃদ্ধিতে প্রতিটি পণ্যে কিউআর কোড বা আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন। ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এই কথা জানান।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঢাকা’র আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এনবিআর ভবনে এই ঘোষণা করা হয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বব্যাপী রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক দেশ ইতোমধ্যেই পণ্যের ওপর ডিজিটাল কোড সংযুক্ত করে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইন নজরদারির আওতায় এনেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের প্রযুক্তি চালু করা গেলে কর ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।‘
তিনি বলেন, ‘উৎপাদন পর্যায় থেকেই প্রতিটি পণ্যকে একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনতে পারলে ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।‘ তিনি আরও বলেন, ‘উৎপাদনকারী অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বারকোড বা অন্যান্য ডিজিটাল কোড ব্যবহার করছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু করা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন নয়। বরং এটি বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে উঠবে।‘
এসময় আব্দুর রহমান খান ব্যাখ্যা করেন যে, প্রতিটি পণ্যে কিউআর কোড যুক্ত করা হলে উৎপাদনের সময় থেকেই সেই পণ্যের তথ্য এনবিআরের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে বাজারে কোনো পণ্য বিক্রির সময় সেটি স্ক্যান করে খুব সহজেই জানা যাবে পণ্যটি বৈধভাবে উৎপাদিত হয়েছে কিনা, যথাযথ ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে কিনা এবং সেটি অনুমোদিত সরবরাহ চেইনের অংশ কিনা। এতে করে মাঠপর্যায়ের নজরদারি আরও কার্যকর হবে এবং রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাজ সহজ হবে। এই ব্যবস্থায় শুধু কর কর্তৃপক্ষ নয়, সাধারণ ভোক্তারাও সরাসরি উপকৃত হবেন।
তিনি যোগ করেন, ‘একজন ক্রেতা মোবাইল ফোন দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের বৈধতা যাচাই করতে পারবেন। কোনো ধরনের অনিয়ম বা সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সিস্টেমে রিপোর্ট করার সুযোগ থাকবে।‘
অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং হুইসেলব্লোয়ারদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
প্রাথমিকভাবে কিউআর ব্যবস্থা তামাক খাতে চালু করার পরিকল্পনা জানিয়ে চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, ‘তামাক খাতে রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি এবং এ খাতে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। বর্তমানে তামাকজাত পণ্যে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ব্যবস্থার উন্নয়ন, নকশা পরিবর্তন এবং আঠার মান উন্নয়নের পাশাপাশি কিউআর কোড বা উন্নত নিরাপত্তা কোড সংযোজনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে।‘
এবিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তামাক খাতে সফলভাবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে পরবর্তীতে বোতলজাত পানীয়, প্রসাধনী, ভোক্তা পণ্যসহ অন্যান্য খাতেও ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা হবে। সাবান, শ্যাম্পু, টিস্যু পেপারসহ দৈনন্দিন ব্যবহৃত প্রায় সব পণ্যকেই এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।‘
বর্তমান বাজারে অনিইয়মকারী প্রতিষ্ঠানের অধিক্যের অবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করে তাদের বাজার অংশীদারত্ব ও রাজস্ব অবদান তুলনামূলকভাবে কম, অন্যদিকে অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠান বাজারে বড় অংশ দখল করে থাকে। এই বৈষম্য দূর করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এতে সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সমানভাবে নজরদারির আওতায় আসবে।‘
এসময় তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ‘কর প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করা নয়, বরং তাদের বিকাশে সহায়তা করা।‘ মৌমাছির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘যেমন মৌমাছি ফুলের ক্ষতি না করে মধু সংগ্রহ করে, তেমনি কর আহরণ ব্যবস্থাও এমন হওয়া উচিত যাতে ব্যবসার ক্ষতি না হয় কিন্তু রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় রাজস্ব পায়।‘
এছাড়া অতিরিক্ত জরিমানা ও জটিল নিয়মকানুন নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ স্বীকার করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শাস্তি ও জটিলতা ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। এসব বিষয় পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন যাতে তরুণ প্রজন্ম ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে।‘
ইতিমধ্যে কর সংস্কার কার্যক্রম শুরুর খবর দিয়ে তিনি বলেন, ‘ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অডিট নির্বাচন বন্ধ করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ফলে মানবিক হস্তক্ষেপ কমে আসবে এবং অডিট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। বহু বছরের অডিট একসঙ্গে করার পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক (রিস্ক-বেইজড) পদ্ধতিতে অডিট পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।‘
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারবর্গ, বিভিন্ন সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।