হরমুজ সংকটে তেলের উৎস বদলাচ্ছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে নয়াদিল্লি

হরমুজ সংকটে তেলের উৎস বদলাচ্ছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে নয়াদিল্লি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে হিসাব কষছে ভারত। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী দেশটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং আটলান্টিক বেসিনের কিছু উৎস ভারতের জ্বালানি আমদানির নতুন আলোচনায় উঠে এসেছে।

ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে এশিয়ার বড় অংশের তেল পরিবহন হয়, আর রয়টার্স-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারত দৈনিক প্রায় ২ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালির মাধ্যমে আমদানি করত। কেপলার-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চলমান সংকটে নয়াদিল্লির ঝুঁকি অনেক বেড়েছে।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন শক্তি তথ্য প্রশাসন-এর তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় অংশ চলাচল করে। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু ভারত নয়, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বাজারেও সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হয়।

 

সংকটের কারণে ভারতের তেল আমদানিতে ইতোমধ্যে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, মার্চে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায় থেকে ১৩ শতাংশ কমে দৈনিক ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। ওই সময় ভারতের আমদানির প্রায় অর্ধেকই আসে রাশিয়া থেকে, কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে হরমুজ হয়ে আসা সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল।

 

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। কেপলার-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটে ভারতের কাছে তেল ও গ্যাস রপ্তানি বাড়ানোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে। তবে মার্কিন সরবরাহ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের পুরো বিকল্প হতে পারবে না। কারণ ভারতের পরিশোধনাগারগুলোর বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট গ্রেডের তেলের সঙ্গে মানিয়ে চলেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থাও সেই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে।

 

একই সঙ্গে রাশিয়ার তেলও ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল কেনার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ছাড় (ওয়েভার) আরও ৩০ দিন বাড়িয়েছে। ভারতীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা বলেছেন, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় থাকুক কিংবা না থাকুক, আগেও রাশিয়া থেকে তেল কিনেছে এবং এখনো কিনছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের তেল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

 

কেপলার-এর হিসাবে, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া থেকে ভারতে তেল রপ্তানি আবারও বেড়েছে। আল জাজিরা-র প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে ভারতে রাশিয়ার তেল রপ্তানি ২ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিনের বেশি ছিল, যা আগের মাসে ছিল ১ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ব্যারেল। কেপলার বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় রাশিয়ান ক্রুড ভারতের জন্য মূল্য ও তুলনামূলক স্থিতিশীল লজিস্টিক-দুই দিক থেকেই সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

 

শুধু রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভারত এখন আরও বিস্তৃত উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মে মাসে ভেনেজুয়েলা ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর ভেনেজুয়েলার অবস্থান ভারতের তেল উৎস বৈচিত্র্যের নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ভারী ও তুলনামূলক সস্তা গ্রেডের তেল ভারতীয় পরিশোধনাগারের জন্য লাভজনক হওয়ায় এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

 

হরমুজ সংকটের প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে হরমুজ সংকটের কারণে ভারতের এলপিজি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ কমেছে। গৃহস্থালি এলপিজি সরবরাহ কমেছে ১১ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডার বিক্রি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।

 

এদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২৩ মে ভারত সফরে পৌঁছেছেন। এপি ও রয়টার্স জানিয়েছে, তার সফরে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে রয়েছে। রুবিওর সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন নয়াদিল্লি জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণে আগ্রহী এবং ওয়াশিংটনও ভারতের জ্বালানি বাজারে নিজের ভূমিকা বাড়াতে চায়।

 

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রের বরাতে বলা হয়েছে, রুবিও ২৩ থেকে ২৬ মে ভারত সফর করবেন এবং কলকাতা, আগ্রা, জয়পুর ও নয়াদিল্লি সফর করবেন। সফরের সময় জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে সিনিয়র ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও তার অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ অনিশ্চিত হলে কীভাবে পরিশোধনাগার সচল রাখা যাবে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া থেকে ছাড়ে তেল কিনলেও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক চাপ কীভাবে সামলানো হবে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র বা আটলান্টিক বেসিন থেকে তেল বাড়তি আমদানি করলে পরিবহন খরচ, গ্রেডের সামঞ্জস্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির বাস্তবতা কী হবে।

 

ভারতের কাছে কিছু মজুত থাকলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সংকট সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কৌশলগত রিজার্ভ, বাণিজ্যিক মজুত ও জাহাজে থাকা তেল মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহের সরবরাহ সুরক্ষা থাকলেও হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে চাপ বাড়বে। কেপলার-এর হিসাব উদ্ধৃত করে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেলের মজুত ১০৭ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ৯১ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে।

 

রয়টার্স-এর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখন হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। দ্বীপভিত্তিক চেকপয়েন্ট, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং কিছু ক্ষেত্রে নিরাপদ চলাচলের বিনিময়ে ফি নেওয়ার মতো ব্যবস্থা চালুর অভিযোগ উঠেছে। ইরান বলছে, এগুলো নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সেবা; তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী নিরাপদ চলাচলের (প্যাসেজ) বিনিময়ে এমন ফি নেওয়া বিতর্কিত।

 

এই পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশল এখন একমুখী নয়, বরং বহুমুখী। একদিকে দেশটি রাশিয়ান ক্রুডের ওপর নির্ভরতা ধরে রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আটলান্টিক উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সরবরাহকারী-বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিকল্প রুট বা বিকল্প প্রবাহ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে ভারতীয় পরিশোধনাগার প্রতিষ্ঠানগুলো।

 

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ সংকট ভারতের জ্বালানি নীতির একটি পুরনো দুর্বলতাকে সামনে এনেছে-একটি মাত্র সামুদ্রিক করিডরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তাই দীর্ঘমেয়াদে ভারতকে শুধু তেল উৎস বৈচিত্র্য নয়, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তা এবং পরিশোধনাগারের গ্রেড-ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়াতেও মনোযোগ দিতে হবে।

 

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা ভারতের জ্বালানি কূটনীতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে। রুবিওর ভারত সফর, রাশিয়ান তেল নিয়ে মার্কিন ওয়েভার, ভেনেজুয়েলার উত্থান এবং হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ-সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।

 

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ