শব্দে শব্দে কুরআন পাঠ করার সুবিধা কী?

শব্দে শব্দে কুরআন পাঠ করার সুবিধা কী?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কুরআন মানবজাতির হেদায়াত ও জীবনযাপনের এক নিখুঁত গাইডবুক। যুগে যুগে বিশ্বজুড়ে এই মহাগ্রন্থের তিলাওয়াত কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে আলোড়িত করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম সমাজের চিন্তাভাবনা এবং কুরআন অধ্যয়নের ধরনে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে না বুঝে তিলাওয়াত করার প্রথাগত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে, বর্তমান প্রজন্মের পাঠকেরা কুরআনের মূল বার্তা সরাসরি বোঝার প্রতি বেশি জোর দিচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটেই তরুণ প্রজন্ম, গৃহিণী এবং কর্মজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘শব্দে শব্দে কুরআন’ (Word-by-Word Quran) শিক্ষার বিশেষ পদ্ধতি। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, আল্লাহর কালামের মূল উদ্দেশ্য ও দর্শন নিজের জীবনে প্রতিফলিত করার জন্য এই অর্থপূর্ণ তিলাওয়াত পদ্ধতি বর্তমান যুগের অন্যতম সেরা মাধ্যম হয়ে উঠেছে।


সাধারণত দেখা যায়, শৈশব থেকেই শিশুদের শুধু আরবি উচ্চারণ বা নাজেরা পড়তে শেখানো হয়। এর ফলে চমৎকার কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করা সম্ভব হলেও, আল্লাহ আসলে কী নির্দেশ দিচ্ছেন তা অধিকাংশ সময়ই অজানা থেকে যায়। একটি পুরো আয়াতের সাধারণ অনুবাদ পড়লে আংশিক ধারণা পাওয়া গেলেও, প্রতিটি শব্দের একক গুরুত্ব আড়ালে পড়ে যায়। এই ভাষাগত দূরত্ব দূর করতেই ‘শব্দে শব্দে অনুবাদ’ পদ্ধতিটি আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করছে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি আরবি শব্দের ঠিক নিচে বা পাশে তার নির্দিষ্ট বাংলা প্রতিশব্দ দেওয়া থাকে।

 

নিচে শব্দে শব্দে কুরআন পাঠ করার প্রধান সুবিধা ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

 

অর্থ ও মর্মার্থ অনুধাবন

আরবি ভাষা সবার মাতৃভাষা না হওয়ার কারণে সাধারণ পাঠকদের পক্ষে কুরআনের মূল বক্তব্য ধরা কঠিন হয়। কিন্তু শব্দে শব্দে কুরআন পাঠের ফলে আরবি ভাষা না জানা সত্ত্বেও প্রতিটি শব্দের সঠিক অর্থ সহজেই বোঝা যায়। এর ফলে আল্লাহর নির্দেশ, নিষেধ, জান্নাতের সুসংবাদ এবং জাহান্নামের ভয়াবহ উপদেশগুলো সরাসরি হৃদয়ঙ্গন করা সম্ভব হয়। এটি পাঠককে যান্ত্রিক তিলাওয়াতের গণ্ডি থেকে বের করে আল্লাহর বাণীর সাথে একাত্ম করে তোলে।

 

নামাজে গভীর মনোযোগ

দৈনন্দিন ইবাদত, বিশেষ করে নামাজের ক্ষেত্রে এই শব্দার্থ জানার প্রভাব অপরিসীম। অনেক মুসলিমই অভিযোগ করেন যে, নামাজে দাঁড়ালে তাদের মন দুনিয়াবী নানা চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে এবং মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়। মনোবিজ্ঞান এবং ইসলামি স্কলারদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো আমরা নামাজে যা মুখে উচ্চারণ করি, মন তার অর্থ প্রসেস বা অনুধাবন করতে পারে না। কিন্তু যখন একজন মুসল্লি সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরার প্রতিটি শব্দের অর্থ আলাদাভাবে জানেন, তখন ইমামের তিলাওয়াত বা নিজের পড়ার সময় প্রতিটি শব্দ সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। তখন নামাজের প্রতিটি রুকু, সেজদা এবং তাসবিহ এক জীবন্ত সংলাপে পরিণত হয়, যা ইবাদতে সর্বোচ্চ খুশু-খুজু বা পরম একাগ্রতা এনে দেয়।

 

ভুল সংশোধনে সুবিধা

এই পদ্ধতির আরেকটি বড় প্রায়োগিক সুবিধা হলো এটি তিলাওয়াতের বড় ও ছোট ভুলত্রুটি দূর করতে সাহায্য করে। দ্রুত গতিতে কুরআন পড়ার সময় অনেক সময় হরফ বা মাখরাজের ভুলগুলো চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু শব্দে শব্দে পড়ার সময় হরফ, মাখরাজ ও তাজউইদের দিকে আলাদা মনোযোগ দিতে হয়। প্রতিটি শব্দের গঠন এবং হরকতের (জের, জবর, পেশ) দিকে আলাদা নজর দেওয়ার কারণে তিলাওয়াত অত্যন্ত সুন্দর ও নির্ভুল হয়।

 

শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি

অনেকের ধারণা, কুরআনের ভাষা বুঝতে হলে বছরের পর বছর প্রাতিষ্ঠানিক আরবি ব্যাকরণ শিখতে হবে। কিন্তু ‘শব্দে শব্দে কুরআন’ পড়ার পদ্ধতি এই ধারণাকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, পবিত্র কুরআনে প্রায় ৭৭,৪৩০টি শব্দ রয়েছে, যার মধ্যে অনেক শব্দ বারবার ফিরে এসেছে। যেমন কিছু মৌলিক শব্দ বা সর্বনাম কয়েক হাজার বার ব্যবহৃত হয়েছে। একজন পাঠক যখন প্রতিদিন শব্দে শব্দে কুরআন পড়েন, তখন তার মনের অজান্তেই একটি শক্তিশালী কুরআনিক শব্দভাণ্ডার (Vocabulary) তৈরি হয়ে যায়। মাত্র কয়েক মাসের নিয়মিত চর্চায় একজন সাধারণ মানুষও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই কুরআনের আয়াতের একটি বড় অংশের অর্থ নিজে নিজেই বুঝতে সক্ষম হন।

 

শুদ্ধ উচ্চারণ ও তাজউইদ চর্চায় অনন্য ভূমিকা

এই পদ্ধতির আরেকটি বড় প্রায়োগিক সুবিধা হলো এটি তিলাওয়াতের ভুলত্রুটি দূর করতে সাহায্য করে। সাধারণ গতিতে কুরআন পড়ার সময় অনেক সময় হরফ বা মাখরাজের ভুলগুলো চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু শব্দে শব্দে পড়ার সময় পাঠককে প্রতিটি শব্দের ওপর আলাদাভাবে থামতে বা ফোকাস করতে হয়। প্রতিটি শব্দের গঠন এবং হরকতের (জের, জবর, পেশ) দিকে আলাদা নজর দেওয়ার কারণে তাজউইদের নিয়মগুলো নিখুঁতভাবে মেনে চলা সহজ হয়। ফলে তিলাওয়াত যেমন শুদ্ধ হয়, তেমনি অর্থ বিকৃতির হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।

 

সহজে হেদায়াত ও আমল

কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষ এর থেকে হেদায়াত নেবে এবং নিজের বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করবে। কুরআনের মূল বার্তা যখন শব্দে শব্দে পড়ার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, তখন সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং বাস্তব জীবনে তা মেনে চলা বা আমল করা অনেক সহজ হয়ে যায়। এটি মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে, অন্যায় ও অপরাধ থেকে দূরে রাখে এবং সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।

 

অর্থ না বোঝার সংকট ও বর্তমান বাস্তবতা

আমাদের সমাজে ঐতিহাসিকভাবে শৈশব থেকেই শিশুদের শুধু আরবি উচ্চারণ বা নাজেরা পড়তে শেখানো হয়। এর ফলে একজন মুসলিম চমৎকার কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারলেও, তিনি আসলে কী পড়ছেন বা আল্লাহ তাকে কী নির্দেশ দিচ্ছেন, তা অধিকাংশ সময়ই অজানা থেকে যায়। একটি পুরো আয়াতের সাধারণ অনুবাদ পড়লে আংশিক ধারণা পাওয়া গেলেও, প্রতিটি শব্দের একক গুরুত্ব অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। এই ভাষাগত দূরত্ব দূর করতেই ‘শব্দে শব্দে অনুবাদ’ পদ্ধতিটি আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করছে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি আরবি শব্দের ঠিক নিচে বা পাশে তার নির্দিষ্ট বাংলা প্রতিশব্দ দেওয়া থাকে, যা পাঠককে প্রতিটি শব্দের আলাদা অর্থ বুঝতে সাহায্য করে।

 

আধুনিক মাধ্যমে সহজলভ্যতা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই বিশেষ ধারার শিক্ষা আরও সহজ হয়েছে। বাজারে এখন চমৎকার ‘কালার কোডেড’ বা রঙিন শব্দার্থের প্রিন্টেড কুরআন পাওয়া যায়। এছাড়া অসংখ্য মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে, যেখানে ঘরে বসেই কর্মব্যস্ত মানুষ এখন প্রতিদিন অল্প সময় দিয়ে কুরআনের ভাষা বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন।

 

কুরআন পাঠের উপকারিতা

কুরআন হলো আল্লাহ তাআলার নূর, হিদায়াত ও সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিজা। এই নূর মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে এবং অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। কুরআন তিলাওয়াত করলে মুমিনের হৃদয়ে শান্তি ও স্বস্তি সৃষ্টি হয়। কুরআন পাঠের রয়েছে অসংখ্য ফজিলত ও উপকারিতা। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে।

 

আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমি তাদেরকে যে রিযিক  দিয়েছি তা গোপনে ও .প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে তাদের এমন ব্যবসায়ের যার ক্ষয় নেই। এ জন্য যে আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দিবেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরও বেশী দিবেন। তিনিতো ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। (সুরা ফাতির: ২৯,৩০)

 

কুরআন পাঠ  করা ও আল্লাহর পথে ভাল ভাল কাজ করা এই গুলো হচ্ছে লাভজনক ব্যবসা, এই ব্যবসা দুনিয়ার ব্যবসা হতে বহুগুণে উত্তম। এই ব্যবসার কোন ক্ষতি নাই। শুধু লাভ আর লাভ। এই ব্যবসায় আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে। নবী সাহাবী ও মুমিন বান্দারা শুধু এই ব্যবসার সন্ধানে ছিলেন। তারা এই ব্যবসার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়েছেন। আল্লাহ বলেন, হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যা তোমাদের রক্ষা করবে যন্ত্রদায়ক শাস্তি হতে? (সুরা আস সাফ: ১০)

 

আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন কুরআন পাঠকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত মিষ্টি কমলার ন্যায়, যার ঘ্রাণও উত্তম স্বাদও উত্তম। যে মুমিন কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত খেজরের ন্যায়, যার কোন ঘ্রাণ নেই তবে এর স্বাদ আছে। আর যে মুনাফিক কুরআন পাঠ করে তার দৃষ্টান্ত রায়হান ফুলের ন্যায় যার ঘ্রাণ আছে তবে স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন পাঠ করে না তার দৃষ্টান্ত হানযালা মাকাল ফলের ন্যায়, যার সুঘ্রাণও নেই, স্বাদও তিক্ত। (বুখারি: ৫৪২৭)

 

আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কতক লোক আল্লাহর পরিবার-পরিজন। সাহাবায়ে কেরাম জিঞ্জেস করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা কারা? তিনি বললেন কুরআন তিলাওয়াতকারীরাই আল্লাহর পরিবার পরিজন এবং তার বিশেষ বান্দা। (ইবনে মাজাহ: ২১৫)

 

প্রতি হরফ ১০ নেকি লাভ। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে সে একটি নেকি লাভ করবে। আর প্রতিটি নেকিকেই ১০ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। আমি বলি না যে, আলিফ লাম মীম মিলে একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, এবং মীম আরেকটি হরফ। (তিরমিজি: ২৯১০)

 

কুরআন পাঠকারীদের কে সুপারিশ করবে। জুবায়েদ (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন কুরআন এমন সুপারিশ কারী যার সুপারিশ (তেলাওয়াত কারীর পক্ষে) কবুল করা হবে। এমন বিতর্ক কারী যার বিতর্ক (তেলাওয়াত কারীর পক্ষে) গ্রহণ করা হবে।


পরিশেষে বলা যায়, ‘শব্দে শব্দে কুরআন’ পাঠ কেবল একটি পড়ার কৌশল নয়, বরং এটি ঐশী বাণীর গভীরে ডুব দেওয়ার একটি অনন্য চাবিকাঠি। অন্ধ অনুকরণ বা যান্ত্রিক তিলাওয়াতের প্রাচীর ভেঙে এটি মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর কালামের মূল স্রোতধারার সাথে যুক্ত করছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে পারিবারিক পরিমণ্ডলে এই অর্থপূর্ণ কুরআন চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে, তা বর্তমান প্রজন্মের নৈতিক ও আত্মিক সংকটের একটি স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।


সম্পর্কিত নিউজ