{{ news.section.title }}
সামনাসামনি প্রশংসা কি ক্ষতির কারণ? ইসলাম এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
মানুষের জীবনে প্রশংসা যতটা অনুপ্রেরণার, ঠিক ততটাই তা বিভ্রমের কারণ হতে পারে। প্রশংসার জোয়ারে যখন কেউ ভেসে যায়, তখন তার অজান্তেই অন্তরে দানা বাঁধতে শুরু করে অদৃশ্য এক বিষবৃক্ষ, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করে মানুষের বিবেক আর বাস্তববোধকে।
সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ অন্যের চোখে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে ভালোবাসে। কারো ভালো কাজের প্রশংসা করাকে আমরা সৌজন্যবোধ বা আদব হিসেবেই গণ্য করে থাকি। কিন্তু এই প্রশংসার আড়ালে যদি অতিশয়োক্তি, তোষামোদ কিংবা মিথ্যার লেশমাত্র থাকে, তবে তা প্রশংসাকারী এবং প্রশংসিত ব্যক্তি, উভয়ের জন্যই তা এক মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সচরাচর কাউকে খুশি করতে অকাতরে স্তুতি বাক্য ব্যবহার করি, কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই অতি প্রশংসা কীভাবে একজন মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং তার আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়!
আমাদের সবার প্রিয় বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ এবং প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহর (রহিমাহুল্লাহ) নির্দেশনায় এই সামাজিক ব্যাধির যে ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে, তা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের কাছেও এক বিস্ময়কর সত্য।
যখন প্রশংসা হয়ে ওঠে ধারালো অস্ত্র!
রাসূল ﷺ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের সতর্ক করেছেন যাতে আমরা একে অপরের অতিরিক্ত প্রশংসা না করি। সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় তিনি এমন এক পরিমিতিবোধের শিক্ষা দিয়েছেন যা আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে মানব চরিত্রের এক গূঢ় রহস্য উন্মোচন করেছিল। তিনি শিখিয়েছেন, যদি কারো প্রশংসা করতেই হয়, তবে তা যেন হয় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে,যেমন: "আমি তাকে এমন মনে করি, আর আল্লাহই তার প্রকৃত হিসাব গ্রহণকারী", এই একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে চরম বিনয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের বাহ্যিক রূপ দেখে আমরা যা বিচার করি, তা আসল সত্য নাও হতে পারে। আল্লাহর সামনে কাউকে নির্দোষ বা পবিত্র ঘোষণা করার ধৃষ্টতা যেন আমাদের মধ্যে না আসে, সেই শাসনই এখানে বিদ্যমান।
প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) প্রশংসার এই বিষয়টিকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং মানুষের চারিত্রিক গঠনের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলছেন, মানুষের সামনে সরাসরি তার প্রশংসা করা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
কেন?
কারণ মানুষের মস্তিষ্ক যখন প্রশংসা শোনে, তখন সেখানে ডোপামিন নামক এক ধরণের আনন্দদায়ক হরমোনের নিঃসরণ ঘটে। এই ডোপামিনের নেশা মানুষকে ধীরে ধীরে অহংকারী করে তোলে। সে ভাবতে শুরু করে যে সে অন্যদের চেয়ে আলাদা এবং শ্রেষ্ঠ।
ইবনে তাইমিয়্যাহর মতে, এই অহংকার যখন অন্তরে প্রবেশ করে, তখন মানুষের শেখার বা সংশোধনের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সে নিজেকে নিখুঁত মনে করতে থাকে, যা তাকে আধ্যাত্মিক দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দেয়। একে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'Narcissistic personality' বা আত্মমুগ্ধতার ব্যাধি। যখন কেউ সারাক্ষণ নিজের গুণগান শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সত্য সমালোচনা গ্রহণ করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে।
প্রশংসা করা কি তবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ?
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এখানে এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দিয়েছেন। তিনি বলছেন, যদি প্রশংসা করতেই হয়, তবে তা হতে হবে সত্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী। এখানে তিনটি মূল শর্ত কাজ করে:
১. সত্যনিষ্ঠতা: কোনোভাবেই অতিরঞ্জন বা মিথ্যা যোগ করা যাবে না। তাকে ততটুকুই বলা উচিত যা আসলে তার মধ্যে বিদ্যমান।
২. প্রয়োজন: কেবল তোষামোদের জন্য নয়, বরং উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজনে প্রশংসা করা যেতে পারে।
৩. নিরাপত্তা: এমনভাবে প্রশংসা করা যাবে না যাতে তার দ্বীন বা নৈতিক চরিত্রের ক্ষতি হয়। অর্থাৎ, যার প্রশংসা করা হচ্ছে, তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে সে অজেয় বা চূড়ান্ত সফল।
প্রভাব:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে লাইক, কমেন্ট আর রিয়েকশনের মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত একে অপরের কৃত্রিম প্রশংসা করছি। এটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরণের সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষুধা তৈরি করছে। মানুষ এখন নিজের কাজের চেয়ে অন্যের প্রশংসার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে এক বিশাল ফাঁপা ব্যক্তিত্বের সারি। যারা সামনে প্রশংসা করে, তারা অনেক সময় আড়ালে নিন্দা জানায়, যা সমাজকে কপটতার দিকে নিয়ে যায়।
রাসূল ﷺ-এর শিক্ষা আমাদের এই কৃত্রিমতা থেকে মুক্তি দিয়ে এক স্বচ্ছ ও সৎ সামাজিক কাঠামোর পথ দেখায়।
পরিশেষে বলা যায়, প্রশংসা হচ্ছে আগুনের মতো। এটি যেমন উৎসাহিত করতে পারে, তেমনি একজন মানুষের সারা জীবনের অর্জনকে পুড়িয়ে ছারখারও করে দিতে পারে। নবীজি ﷺ-এর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে, মানুষের আসল বিচারক কেবল মহান আল্লাহ। মানুষের তুচ্ছ প্রশংসা বা নিন্দায় বিচলিত না হয়ে নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকাই হলো প্রকৃত সফলতা।