{{ news.section.title }}
আল কুরআনে মোট কতটি সূরা ও আয়াত রয়েছে এবং এর সাধারণ বিভাজন কী?
পবিত্র আল কুরআন মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বশেষ আসমানি কিতাব। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি মহান আল্লাহর বাণী, যা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়। কুরআন শুধু ইবাদতের গ্রন্থ নয়; এটি মানবজীবনের জন্য হিদায়াত, নৈতিকতা, আইন, আখলাক, ইতিহাস, শিক্ষা ও পরকালীন সফলতার দিকনির্দেশনাও দেয়।
সর্বসম্মতভাবে পবিত্র আল কুরআনে ১১৪টি সূরা রয়েছে। এটি নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। তবে আয়াতের সংখ্যা নিয়ে গণনা-পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। বহুল স্বীকৃত এক গণনায় কুরআনে ৬,২৩৬টি আয়াত রয়েছে। সাধারণ মানুষের মুখে ৬৬৬৬ আয়াত সংখ্যাটিও প্রায়ই শোনা যায়, কিন্তু এটি মানক বা সর্বসম্মত গণনা নয়। বিভিন্ন কিরাআত, বিরামচিহ্ন, আয়াত সমাপ্তির পদ্ধতি ও ‘বিসমিল্লাহ’ গণনার ভিন্নতার কারণে আয়াতের মোট সংখ্যা কিছুটা ওঠানামা করতে পারে।
কুরআনের সাধারণ বিভাজন
১. সূরা
কুরআনের সবচেয়ে পরিচিত বিভাজন হলো সূরা। পুরো কুরআন ১১৪টি সূরায় বিন্যস্ত। কিছু সূরা দীর্ঘ, যেমন সূরা আল-বাকারাহ; আবার কিছু সূরা খুবই সংক্ষিপ্ত, যেমন সূরা আল-কাওসার। প্রতিটি সূরার বিষয়বস্তু, ভাষা, শৈলী ও অবতীর্ণ প্রেক্ষাপট আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
২. আয়াত
প্রতিটি সূরা আবার বিভিন্ন আয়াত বা বাক্যে বিভক্ত। আয়াত হলো কুরআনের মৌলিক পাঠ-একক। বহুল ব্যবহৃত গণনায় কুরআনে ৬,২৩৬টি আয়াত রয়েছে। কিছু গণনায় ‘বিসমিল্লাহ’ আলাদা আয়াত হিসেবে ধরা হয়, কিছু গণনায় ধরা হয় না-এ কারণেও মোট সংখ্যা ভিন্ন দেখা যায়।
৩. পারা বা জুয
কুরআন সহজে তিলাওয়াত ও খতম করার সুবিধার্থে ৩০টি জুয বা পারা-তে বিভক্ত। রমজানে দৈনিক এক পারা করে তিলাওয়াতের প্রচলন মুসলিম সমাজে খুবই পরিচিত। এই বিভাজন মূলত পাঠ-সহজতার জন্য, বিষয়বস্তুর পূর্ণতা ধরে রাখার জন্য নয়।
৪. হিযব ও রুব আল-হিযব
পুরো কুরআনকে আরও সূক্ষ্মভাবে ৬০টি হিযব-এ ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি হিযব আবার চার ভাগে বিভক্ত, যাকে বলা হয় রুব আল-হিযব। সে হিসাবে কুরআনে মোট ২৪০টি রুব আল-হিযব রয়েছে। নিয়মিত তিলাওয়াত, হিফজ ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এই বিভাজন খুব উপকারী।
৫. রুকু
দক্ষিণ এশিয়ার মুদ্রিত কুরআনে বহুল ব্যবহৃত আরেকটি বিভাজন হলো রুকু। এটি সাধারণত অর্থ ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে গঠিত অনুচ্ছেদসদৃশ অংশ। রুকুর সংখ্যা সব সংস্করণে এক নয়; বিভিন্ন মুদ্রণ ও ঐতিহ্যে ৫৪০ বা ৫৫৮-উভয় সংখ্যাই পাওয়া যায়। তাই এখানে একটি সংখ্যাকে একমাত্র চূড়ান্ত বলে দাবি না করে ব্যাখ্যাসহ বলা বেশি সঠিক।
৬. মঞ্জিল
এক সপ্তাহে কুরআন খতম করার সুবিধার্থে কুরআনকে ৭টি মঞ্জিল-এ বিভক্ত করা হয়েছে। যারা নিয়মিত তিলাওয়াত করেন, তাদের জন্য এটি একটি পরিচিত ও কার্যকর পদ্ধতি।
মাক্কী ও মাদানী সূরা কী
কুরআনের সূরাগুলোকে অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রধানত মাক্কী ও মাদানী-এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
মাক্কী সূরা হলো যেগুলো হিজরতের আগে অবতীর্ণ হয়েছে, আর মাদানী সূরা হলো হিজরতের পরে অবতীর্ণ সূরা। প্রচলিত হিসাবে ৮৬টি মাক্কী ও ২৮টি মাদানী সূরার কথা বলা হয়। তবে কিছু আলেমের গণনায় সামান্য মতভেদ রয়েছে, কারণ কিছু সূরার কয়েকটি আয়াতের অবতীর্ণ স্থান ও সময় নিয়ে ভিন্নমত আছে।
মাক্কী ও মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য
সাধারণভাবে মাক্কী সূরাগুলোতে তাওহিদ, আখিরাত, নবুয়ত, জান্নাত-জাহান্নাম, নৈতিকতা ও মানবচিন্তার মৌলিক প্রশ্নগুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলোর ভাষা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী।
অন্যদিকে মাদানী সূরাগুলোতে সমাজব্যবস্থা, পরিবার, আইন, জিহাদ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, মুনাফিকদের চরিত্র, এবং মুসলিম সমাজ গঠনের বিভিন্ন দিক বেশি আলোচিত হয়েছে।
কেন এই বিভাজনগুলো গুরুত্বপূর্ণ
কুরআনের এই বিভাজনগুলো শুধু গণনার জন্য নয়; বরং তিলাওয়াত, হিফজ, তাফসির, শিক্ষা ও গবেষণার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুয বা পারা দৈনিক পাঠ সহজ করে, হিযব ও রুব পাঠকে আরও ছোট ধাপে ভাগ করে, রুকু অর্থবোধক বিরতির সুযোগ দেয়, আর মাক্কী-মাদানী বিভাজন আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করে।এ কারণে কুরআন বুঝতে চাইলে শুধু সূরা ও আয়াতের সংখ্যা জানাই যথেষ্ট নয়; এর গঠন, নাজিলের সময়কাল, বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস এবং তিলাওয়াতের রীতি সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার।
পবিত্র আল কুরআন শুধু ১১৪টি সূরা ও কয়েক হাজার আয়াতের সমষ্টি নয়; এটি মুসলিম জীবনের পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা। এর সুশৃঙ্খল বিভাজন তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও অনুধাবনকে সহজ করে। তাই কুরআনের কাঠামোগত তথ্য জানার পাশাপাশি এর শিক্ষা, বার্তা ও জীবনঘনিষ্ঠ দিকগুলো বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।