{{ news.section.title }}
চার কুল সূরা কোনগুলো এবং এগুলো পড়ার উপকারিতা কী?
পবিত্র কুরআন মজিদে ১১৪ টি সূরা রয়েছে। প্রতিটি সূরা অনেক মর্যাদাপূর্ণ। কিছু সূরা আছে যেগুলোর ফজিলত আরো অনেক বেশি। এই ফজিলতপূর্ণ সূরার মধ্যে সূরা কাফিরুন, সূরা ইখলাস, সূরা নাস, সূরা ফালাক অন্যতম। এই চারটি সূরাকে একসঙ্গে ৪ কুল বলা হয়।
সূরা কাফিরুন পবিত্র কুরআনের ১০৯ তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৬ এবং রুকু সংখ্যা ১। সূরা ইখলাস পবিত্র কুরআনের ১১২ তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৪ এবং রুকু সংখ্যা ১। সূরা ফালাক পবিত্র কুরআনের ১১৩ তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৫ এবং রুকু সংখ্যা ১। সূরা নাস পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ ১১৪ তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৬ এবং রুকু সংখ্যা ১।
সুরা ইখলাসের ফজিলত
সুরা ইখলাস পবিত্র কোরআনের ১১২তম সুরা। এই সুরায় মহান আল্লাহ তাআলার সত্তা ও একত্ববাদের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। আয়তনের দিক থেকে এটি কোরআনের অন্যতম ছোট সুরা হলেও এর গুরুত্ব ও মর্যাদা অসাধারণ। হাদিসে এ সুরাকে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য বলা হয়েছে।
‘ইখলাস’ শব্দের অর্থ হলো একনিষ্ঠতা, আন্তরিকতা, বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও খাঁটি আনুগত্য। শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে একমাত্র আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস স্থাপন এবং তাঁর ইবাদতে নিজেকে নিবেদিত করাকেই ইখলাস বলা হয়। এই সুরা মুসলমানদের তাওহিদের মূল শিক্ষা প্রদান করে এবং আল্লাহর একত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
সুরা ইখলাস অবতীর্ণ হওয়ার কারণ
অবিশ্বাসীরা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, যার জবাবে এই সুরা নাজিল হয়। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে যে তারা আরও প্রশ্ন করেছিল, আল্লাহ তাআলা কিসের তৈরি-স্বর্ণ-রৌপ্য অথবা অন্য কিছুর? এর জবাবে সুরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।
সুরা ইখলাসের আমলে জান্নাত লাভ
সুরা ইখলাসের ফজিলত অনেক। সুরা ইখলাস যিনি ভালোবাসবেন, তিনি জান্নাতে যাবেন। হাদিসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে আরজ করলেন, আমি এই সুরাকে ভালোবাসি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সুরা ইখলাসের প্রতি ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। (মুসনাদে আহমদ ৩/১৪১)
সুরা ইখলাসের ফজিলত
কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ: হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা সবাই একত্র হয়ে যাও, আমি তোমাদের কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ শোনাব। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা ইখলাস পাঠ করলেন। (মুসলিম, তিরমিজি)
বিপদে-আপদে উপকারী: হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকেল সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করে, তাকে বালা-মুসিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়। (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর আগে কুলহু আল্লাহু আহাদ, কুল আউযু রাব্বিল ফালাক, কুল আউযু বিরাব্বিন নাস পড়ার কথা বলেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন, তখন তিনি তাঁর দুই হাতের তালু একত্র করতেন, তারপর সেখানে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। এরপর দুই হাতের তালু দিয়ে শরীরে যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে দিতেন। এভাবে তিনবার করতেন। (বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিজি)
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত , রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (সূরা) ‘কূল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ সম্পর্কে বলেছেন, “সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রান আছে, নিঃসন্দেহে এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য”।
অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবাগনকে বললেন, ‘তোমরা কি এক রাতে এক তৃতীয়াংশ কুরআন পড়তে অপারগ?’ প্রস্তাবটি তাদের পক্ষে ভারী মনে হল। তাই তারা বলে উঠলেন ‘হে আল্লাহর রাসূল! এ কাজ আমাদের মধ্যে কে করতে পারবে?’ ( অর্থাৎ কেও পারবে না।) তিনি বললেন, “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস সামাদ” (সূরা ইখলাস) কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য”। (অর্থাৎ, এই সূরা পড়লে এক তৃতীয়াংশের কুরআন পড়ার সমান নেকী অর্জিত হয়।) (সহীহুল বুখারি ৫০১৫)
উক্ত সাহাবী (রাঃ) আরো বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি কোন লোককে সূরাটি বারবার পড়তে শুনল। অতঃপর সে সকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিকট এসে তা ব্যক্ত করল। সে সূরাটিকে নগণ্য মনে করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ আছে, নিঃসন্দেহে এই সূরা (ইখলাস) কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান”। [সহীহুল বুখারি ৫০১৫]
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (সূরা) ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ সম্পর্কে বলেছেন, “নিঃসন্দেহে এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য”। [মুসলিম ৮১২]
সুরা ইখলাস: তাওহিদের মূল ভিত্তি
ইসলামের মৌলিক ও সর্বপ্রধান বিশ্বাস হলো তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। সুরা ইখলাসে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্ট ভাষায় এই তাওহিদের শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। এ সুরায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়; তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তিনি কারও থেকে জন্মও নেননি। তাঁর সমকক্ষ বা সমতুল্য কোনো সত্তা নেই।
পবিত্র কোরআনের মূল শিক্ষা তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত-তাওহিদ, আখিরাত এবং রিসালাত। অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, পরকালের প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহপ্রদত্ত ওহির প্রতি বিশ্বাস। ইসলামের অন্যান্য সব আকিদা ও বিশ্বাস এই তিনটি ভিত্তির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বলতে তাঁর সকল নাম, গুণাবলি ও কর্মের প্রতি বিশ্বাসকে বোঝায়। একইভাবে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যে কবরের জীবন, কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি বিশ্বাসও অন্তর্ভুক্ত। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ঈমানের একটি বড় অংশই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর সেই বিশ্বাসের সারমর্মই অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে সুরা ইখলাসে।
তাই একজন মুসলমান যদি সুরা ইখলাসের শিক্ষা ও তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেন, তবে তিনি দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সুরা ইখলাস তিনবার তিলাওয়াত করলে সম্পূর্ণ এক খতম কোরআন তিলাওয়াতের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করা যায়।
সুরা ইখলাসে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে এক রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে, এক যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে আমির বা নেতা নিযুক্ত করে দেন, তিনি নামাজে ইমামতিকালে সুরা ফাতিহা ও অন্য সুরা শেষে প্রতি রাকাতেই সুরা ইখলাস পাঠ করতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে লোকেরা এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি তাঁকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন, নেতা উত্তর দেন যে এই সুরায় আল্লাহর পরিচয় পাই, তাই এই সুরাকে ভালোবাসি। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসেন।
হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তিনটি কাজ ইমানের সঙ্গে করতে পারবে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করতে পারবে। (১) যে হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে। (২) যে ব্যক্তি গোপন ঋণ পরিশোধ করবে। (৩) এবং যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে (তাফসিরে কাসির)।
সূরা ইখলাস এর আরবি উচ্চারণ :
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ – اللَّهُ الصَّمَدُ – لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ – وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
উচ্চারণ : কুল হুআল্লাহু আহাদ। আল্লাহুচ্চামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ।’
অর্থ : (হে রাসুল! আপনি) বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। আর তার সমতুল্য কেউ নেই।’
সুরা নাস পাঠের ফজিলত
কোরআনের ১১৪তম ও সর্বশেষ সুরার নাম সুরা নাস। এই সুরা মদিনায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ৬, রুকু ১।
শানে নুযুল
সূরা ফালাক ও সূরা নাস একসঙ্গে নাজিল হয়েছিল এবং এ দুই সূরার নাজিল হওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর লাবীদ ইবনে আসাম নামক এক ব্যক্তি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর জাদু করেছিল। এর ফলে তিনি কিছু শারীরিক ও মানসিক কষ্ট অনুভব করেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদুকরের পরিচয় এবং জাদুর স্থান সম্পর্কে অবহিত করেন। জানা যায়, একটি চিরুনি ও কিছু চুলের সাহায্যে জাদু করা হয়েছিল এবং সেগুলো একটি কূপের তলদেশে পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাজিল করেন। এ দুটি সূরায় মানুষের জন্য সকল প্রকার অশুভ শক্তি, হিংসা, কুমন্ত্রণা ও অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। তাই এ সূরাদ্বয়কে ‘মু‘আওয়িযাতাইন’ বা আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা বলা হয়।
নাস পাঠের ফজিলত
হাদীস শরীফৈ প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তা পড়ার গুরুত্ব এসেছে। এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা সূরা ইখলাস ও এই দুই সূরা পড়বে সে সকল বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। (জামে তিরমিজি, হাদীস : ২৯০৩; সুনানে আবু দাউদ,হাদীস : ১৫২৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৯২৬৬; সুনানে নাসাঈ ২/১৫৪; তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৯১৭)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রাতে যখন ঘুমাতে যেতেন, তখন নিজের উভয় হাত এক সঙ্গে মিলাতেন। তারপর উভয় হাতে ফুঁক দিতেন এবং সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়তেন। তারপর দেহের যতটুকু অংশ সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন। তিনি মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশ থেকে শুরু করতেন। তিনি এরূপ তিনবার করতেন। -(সহি বুখারি ৫০১৭, সুনানে আবু দাউদ : ৫০৫৮, জামে তিরমিজি, হাদিস নং-৩৪০২)
হজরত উকবা ইবনে আমের জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার ওপর কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে, যা আমি এর মতো অনুরূপ দেখিনি। কুল আয়ুজু বি রাব্বিল ফালাক ও কুল আয়ুজু বি রাব্বিন নাস। -(জামে তিরমিজি, হাদিস নং-২৯০২)
সূরা নাস এর আরবি উচ্চারণ
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ – مَلِكِ النَّاسِ – إِلَهِ النَّاسِ – مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ – الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ – مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ
উচ্চারণ : কুল আউজু বিরাব্বিন নাস; মালিকিন্ নাস; ইলাহিন্ নাস। মিন্ শররিল ওয়াস্ওয়াসিল খান্নাস; আল্লাজি ইউওয়াসয়িসু ফি ছুদুরিন নাস। মিনাল ঝিন্নাতি ওয়ান নাস।
অর্থ : বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের পালনকর্তার কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের মাবুদের কাছে। তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।
সুরা ফালাক পাঠের ফজিলত
পবিত্র কোরআন শরিফের ১১৩তম সুরা হলো সুরা ফালাক। এর গুরুত্ব ও ফজিলত অন্যান্য সুরা থেকে বেশি। তাই এ সুরাটি অর্থসহ মুখস্থ করে রাখা ভালো।
সুরা ফালাকের ফজিলত
সুরা ফালাক মানুষের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিরাপত্তার দোয়া। যেকোনো বিপদ-আপদ, অকল্যাণ, হিংসা, কুমন্ত্রণা ও অশুভ শক্তির অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার জন্য এই সুরা এবং এর পরবর্তী সূরা নাস তিলাওয়াত করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও বিভিন্ন বিপদ, অসুস্থতা ও কষ্টের সময় এ দুই সূরা নিয়মিত পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিতেন।
হাদিসে বর্ণিত আছে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর জাদু করা হয়েছিল, তখন সেই জাদুর সঙ্গে সম্পর্কিত গিঁটগুলো খোলার সময় সূরা ফালাক ও সূরা নাসের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়। আল্লাহর ইচ্ছায় প্রতিটি আয়াত পাঠের সঙ্গে সঙ্গে গিঁটগুলো খুলে যায় এবং তিনি সুস্থতা লাভ করেন। এ কারণে সূরা ফালাককে অনিষ্ট, হিংসা, জাদু ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূরা হিসেবে গণ্য করা হয়। নিয়মিত এই সূরা তিলাওয়াত করলে মহান আল্লাহর রহমতে বিভিন্ন অকল্যাণ ও বিপদ থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
সুরা ফালাকের আমল
হজরত উকবা বিন আমির (রা.) বলেন, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’
হজরত উকবা বিন আমির (রা.) বর্ণনা করেন, 'একবার রসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, ‘উকবা বিন আমির, আমি কি তোমাকে এমন কয়েকটি সুরা শেখাব, যেগুলোর মতো সুরা তাওরাত, জবুর, ইঞ্জিল, এমনকি কোরআনেও আর নাজিল হয়নি? প্রতি রাতেই তুমি এই সুরাগুলো অবশ্যই পড়বে। সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক আর সুরা নাস।’
সূরা ফালাক এর আরবি উচ্চারণ :
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ – مِن شَرِّ مَا خَلَقَ – وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ – وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ – وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
উচ্চারণ : কুল আউজু বিরাব্বিল ফালাক্ব; মিন শাররি মা খালাক্ব; ওয়া মিন শাররি গাসিক্বিন ইজা ওয়াক্বাব; ওয়া মিন শাররিন নাফ্ফাছাতি ফিল উক্বাদ; ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইজা হাসাদ।
অর্থ : বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে। অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে
সুরা কাফিরুন পাঠের ফজিলত
পবিত্র কোরআনের ১০৯ নম্বর সুরা হলো কাফিরুন। মক্কায় নাজিল হওয়া এই সুরাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন সুরা কাফিরুন পাঠ :
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সুরা কাফিরুন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি সুন্নত নামাজে এটি পড়তেন।
বাইতুল্লাহর তাওয়াফ শেষ করার পরের নামাজেও তিনি এটা পড়তেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের সুন্নত নামাজে সুরা কাফিরুন ও সুরা ইখলাস পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৬৩, আবু দাউদ, হাদিস : ১২৪৬)
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের সুন্নত দুই রাকাতে এবং মাগরিবের সুন্নত দুই রাকাতে সুরা কাফিরুন ও সুরা ইখলাস পাঠ করতেন। (মুসনাদে আহমাদ : ২/২৪)
সুরা কাফিরুনের ফজিলত : সুরা কাফিরুন কুরআনের ছোট্ট একটি সুরা। সুরাটি মাত্র ছয়টি আয়াত নিয়ে গঠিত। তিলাওয়াত করতে এক মিনিটেরও কম সময় লাগে, কিন্তু এর ফজিলত ও সওয়াব অত্যন্ত মহান। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইজা জুলজিলাত সুরা যে ব্যক্তি পাঠ করবে, অর্ধেক কোরআনের সমান তার সওয়াব হবে। ক্বুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন যে ব্যক্তি পাঠ করবে, তার কোরআনের এক-চতুর্থাংশ পাঠের সমান সওয়াব হবে। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯৩)
সুরা কাফিরুন ও নিরাপত্তা
সুরা কাফিরুন ঈমান ও আকিদার নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। এই সুরায় মুসলমানদের শিরক, কুফর ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন মুমিন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, তিনি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং কোনো অবস্থাতেই বাতিল বিশ্বাস বা উপাসনার সঙ্গে আপস করবেন না। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঘুমানোর আগে সুরা কাফিরুন তিলাওয়াত করলে তা শিরক থেকে মুক্তি ও ঈমানের সুরক্ষার কারণ হয়। তাই আত্মিক নিরাপত্তা ও বিশুদ্ধ তাওহিদের ওপর অটল থাকার জন্য এই সুরা নিয়মিত তিলাওয়াত করা অত্যন্ত উপকারী।
শরিয়তসম্মত ‘রুকইয়া’ (নিরাপত্তা কবজ) করার বিধান আছে। আর রুকইয়ার জন্য নির্ধারিত আয়াতের অন্যতম হলো সুরা কাফিরুন। রাতে ঘুমানোর আগে এই সুরা পাঠ করার কথা আছে। ফারওয়া বিন নওফল (রহ.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একবার নবীজি (সা.) তাঁকে বলেন, তুমি শোয়ার সময় সুরা কাফিরুন তিলাওয়াত করবে। কেননা এই সুরা শিরক থেকে মুক্তি দানকারী। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৭১, মুস্তাদরাকে হাকেম : ২/৫৩৮)
সূরা কাফিরুন আরবি উচ্চারণ :
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ – لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ – وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ – وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدتُّمْ – وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ – لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ -.
উচ্চারণ : কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরুন। লাআ বুদু মা তা’আবুদুন। ওয়ালা আনতুম আবিদুনা মা-আ’বুদ। ওয়ালা আনা আবিদুম মা-আবাত্তুম। ওয়ালা আনতুম আবিদুনা মা আ’বুদ। লাকুম দি-নুকুম ওয়ালিয়া দ্বিন।
অর্থ : বলুন, ‘হে কাফিররা! আমি তার ‘ইবাদাত করি না যার ‘ইবাদাত তোমরা করো। এবং তোমরাও তাঁর ‘ইবাদাতকারী নও যাঁর ‘ইবাদাত আমি করি। এবং আমি ‘ইবাদাতকারী নই তার যার ‘ইবাদাত তোমরা করে আসছ। তোমরা এবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি। তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে।