মাথার চুল বিক্রি করা জায়েজ নাকি গুনাহ?

মাথার চুল বিক্রি করা জায়েজ নাকি গুনাহ?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মহান আল্লাহ মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার দান। এর মধ্যে চুল অন্যতম। যার চুল পড়ে গেছে - সেই বুঝে চুলের কদর। তাই সবার উচিত মহান আল্লাহর এ অমূল্য নিয়ামতের যথাযথ সম্মান করা।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সাগরে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের উত্তম রিজিক দান করেছি। আমি যাদের সৃষ্টি করেছি, অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭০)

 

মানুষের শরীরের প্রতিটি অংশই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। জীবিত অবস্থায় যেমন শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যথাযথ ব্যবহার করা দায়িত্ব, তেমনি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশগুলোর প্রতিও সম্মানজনক আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা। চুল, নখ কিংবা দাঁতের মতো অঙ্গগুলো মানুষের শরীরের অংশ হওয়ায় সেগুলোর ব্যাপারেও শরিয়ত কিছু শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছে।

 

অনেক সময় চুল কাটতে হয় বা পড়ে যায়। এ পড়ে যাওয়া বা কেটে ফেলা চুল যত্রতত্র ফেলে দেয়া উচিত নয়। এতে এ অঙ্গটির অপব্যবহার হয়। এর মাধ্যমে রোগ-জীবাণু ছড়াতে পারে। বাতাসে উড়ে খাবারে বা পানিতে মিশে যেতে পারে। এর সঙ্গে লেগে থাকা জীবাণু পেটে গিয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।

 

সবার উচিত কেটে ফেলা বা ঝরে যাওয়া চুল যথাযথ সংরক্ষণ করা। ইদানীং অনেকে চুল সংরক্ষণ করে বিক্রি করে। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এ কাজটিও হারাম। এটি ইসলাম সমর্থন করে না।

 

ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, মানুষের শরীরের কোনো অংশই বেচাকেনার পণ্য নয়। মানুষ সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ সৃষ্টি। তাই তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই মানবদেহের অঙ্গের মতো চুল বিক্রিকেও অধিকাংশ আলেম বৈধ মনে করেন না।

 

বর্তমান সময়ে প্রাকৃতিক চুলের তৈরি উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন ও বিভিন্ন প্রসাধনী পণ্যের চাহিদা বাড়ায় অনেকেই অর্থের বিনিময়ে চুল বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু ইসলামি আইনজ্ঞরা বলেছেন, মানুষের চুলকে ব্যবসার উপকরণে পরিণত করা মানব মর্যাদার পরিপন্থী। শরীরের অংশকে ক্রয়-বিক্রয়ের বস্তু বানানো ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

এ ছাড়া অন্যের চুল ব্যবহার করে নিজের চুলের সঙ্গে সংযুক্ত করা বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য মানুষের চুল ব্যবহার করার বিষয়েও ইসলামি শরিয়তে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। কারণ এতে প্রতারণা, প্রকৃত অবস্থা গোপন করা এবং সৃষ্টিগত অবয়বে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তনের আশঙ্কা থাকে।

 

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,

আমি কি পৃথিবী সৃষ্টি করিনি ধারণকারিণীরূপে, জীবিত ও মৃতদের? (সুরা মুরসালাত, আয়াত : ২৫-২৬)

 

তাফসিরে কুরতুবিতে ওপরের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: এ আয়াতের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা এবং মানুষের চুল ও পড়ে যাওয়া অঙ্গ দাফন করার বিধান প্রমাণিত হয়।

 

ইমাম আহমদ (রহ.) কে এক ব্যক্তি কাটা চুল ও নখের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এগুলো কী দাফন করব, নাকি ফেলে দেব?’ তিনি বলেন, ‘দাফন করে ফেলো।’ লোকটি বলল, ‘আপনি এ ব্যাপারে কিছু পেয়েছেন?’ তিনি বলেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এগুলো দাফন করে ফেলতেন।’ (আল মুগনি, ইবনে কুদামা : ১/১১০)

 

ইসলামি পণ্ডিতদের একটি বড় অংশের মতে, কাটা চুল ও নখ মাটিতে দাফন করা মুস্তাহাব বা উত্তম কাজ। কারণ এগুলো মানুষের শরীরের অংশ। যেসব জিনিস একসময় মানুষের দেহের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সম্মানজনক আচরণ করা উচিত।

 

তবে যদি কোনো কারণে দাফন করা সম্ভব না হয়, তাহলে এমন স্থানে ফেলে দেওয়া উচিত যেখানে মানুষের চলাচল কম এবং অপবিত্রতা বা অবমাননার আশঙ্কা নেই। খোলা জায়গায়, ডাস্টবিনের পাশে বা এমন স্থানে চুল ফেলে দেওয়া ঠিক নয়, যেখানে তা পদদলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

অনেক ইসলামি গবেষক উল্লেখ করেছেন, চুল ও নখ যত্রতত্র পড়ে থাকলে তা মানুষের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। পরিচ্ছন্নতার দৃষ্টিকোণ থেকেও এগুলো যথাযথভাবে অপসারণ করা প্রয়োজন। ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাও একজন মুসলমানের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

 

বিশেষ করে সেলুন, বিউটি পার্লার বা নরসুন্দরদের দোকানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চুল জমা হয়। এসব চুল যত্রতত্র না ফেলে যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদভাবে অপসারণ করা উচিত। এতে যেমন পরিবেশ পরিষ্কার থাকে, তেমনি মানবদেহের অংশের প্রতিও সম্মান বজায় থাকে।

 

কিছু সমাজে কাটা চুল নিয়ে নানা কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, কাটা চুল ব্যবহার করে জাদু-টোনা বা ক্ষতিকর কিছু করা সম্ভব। ইসলাম এ ধরনের ভিত্তিহীন বিশ্বাসকে সমর্থন করে না। মুসলমানের বিশ্বাস হওয়া উচিত, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুই মানুষের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। তাই চুলের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিক মর্যাদা রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শরিয়তের শিষ্টাচার অনুসরণ করা।

 

আলেমরা আরও বলেন, কাটা চুল বা নখকে অবহেলা না করে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও অপসারণ করা ইসলামের সৌন্দর্যবোধের অংশ। একজন মুসলমানের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সম্মানবোধ প্রতিফলিত হওয়া উচিত। এমনকি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশগুলোর প্রতিও দায়িত্বশীল আচরণ করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

 

মানবদেহ আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। তাই জীবিত অবস্থায় শরীরের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অংশগুলোর প্রতিও যথাযথ সম্মান দেখানো একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য। এ কারণে কাটা বা ঝরে যাওয়া চুল যত্রতত্র না ফেলে সম্মানজনকভাবে সংরক্ষণ বা মাটিতে দাফন করাকে ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন আলেমরা।

 

সার্বিকভাবে ইসলাম মানুষের মর্যাদা, পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কাটা চুলের বিষয়টিও সেই শিক্ষারই একটি অংশ। তাই চুলকে তুচ্ছ বা মূল্যহীন মনে না করে, এটিকে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত হিসেবে সম্মান করা এবং শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করাই একজন মুসলমানের জন্য উত্তম পথ।


সম্পর্কিত নিউজ