বিশ্বকাপে তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে দিল জাপান, দাপটের জয়

বিশ্বকাপে তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে দিল জাপান, দাপটের জয়
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের সাম্প্রতিক উত্থান যে কোনোভাবেই কাকতালীয় নয়, তা আবারও প্রমাণ করল জাপান। শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল, দুর্দান্ত গতি, নিখুঁত পাসিং আর আক্রমণাত্মক মানসিকতার সমন্বয়ে তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে এশিয়ার অন্যতম সেরা দলটি। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলেই রেখেছিল হাজিমে মোরিয়াসুর শিষ্যরা।

প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে জাপান। ম্যাচের মাত্র চতুর্থ মিনিটেই গোলের দেখা পেয়ে যায় তারা। মিডফিল্ড থেকে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলে বক্সের ভেতরে বল পান দাইচি কামাদা। সুযোগ পেয়েই ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এত দ্রুত গোল পাওয়ায় আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায় জাপানি ফুটবলারদের।

 

প্রথম গোলের পরও রক্ষণাত্মক হওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি জাপান। বরং তিউনিসিয়ার ওপর আরও চাপ বাড়াতে থাকে তারা। উইং ব্যবহার করে একের পর এক আক্রমণ চালানো হয়। বিশেষ করে জুনিয়া ইতো ও কাওরু মিতোমার গতি সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আফ্রিকান প্রতিনিধিদের।

 

তিউনিসিয়া মাঝেমধ্যে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করলেও জাপানের সংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে সেগুলো কার্যকর হয়ে ওঠেনি। অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে বলের দখল ও ম্যাচের গতি দুইটিই জাপানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

 

ম্যাচের ৩১ মিনিটে আসে দ্বিতীয় গোল। ডান প্রান্ত থেকে আসা একটি নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত ফিনিশিং করেন আয়াসে উয়েদা। তিউনিসিয়ার গোলরক্ষক বলের গতিপথ বুঝলেও তা ঠেকানোর কোনো সুযোগ পাননি। এই গোলের মাধ্যমে জাপান প্রথমার্ধেই ম্যাচের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

 

বিরতিতে যাওয়ার আগে তিউনিসিয়া কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল। তবে জাপানের ডিফেন্স লাইন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। গোলরক্ষক জায়ন সুজুকিও প্রয়োজনীয় মুহূর্তগুলোতে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স উপহার দেন।

 

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে জাপান। দুই গোলে এগিয়ে থাকার পরও তারা প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ দেয়নি। বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে তুলতে থাকে। ৬৯ মিনিটে সেই চাপেরই ফল আসে।

 

দ্রুতগতির একটি আক্রমণে বল পেয়ে যান জুনিয়া ইতো। বক্সের ভেতরে ঢুকে শক্তিশালী শটে তিউনিসিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর গ্যালারিতে থাকা জাপানি সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্টেডিয়ামে।

 

তৃতীয় গোলের পর তিউনিসিয়া কিছু পরিবর্তন এনে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। জাপান মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি। বরং ম্যাচের শেষ ভাগেও সমান তালে আক্রমণ চালিয়ে গেছে।

 

ম্যাচের ৮৩ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন আয়াসে উয়েদা। সতীর্থের নিখুঁত পাস পেয়ে তিনি ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল জালে পাঠান। এই গোলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত জোড়া গোল পূর্ণ করার পাশাপাশি দলের ৪-০ গোলের বড় জয়ও নিশ্চিত করেন তিনি।

 

পরিসংখ্যানও ম্যাচে জাপানের আধিপত্যের গল্পই বলছে। বলের দখল, সফল পাস, অন-টার্গেট শট এবং আক্রমণ-সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল সামুরাই ব্লুরা। পুরো ম্যাচে তিউনিসিয়া উল্লেখযোগ্য কোনো গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। জাপানের রক্ষণভাগ এতটাই সংগঠিত ছিল যে আফ্রিকান দলটির ফরোয়ার্ডরা প্রায় পুরো ম্যাচেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।

 

বিশ্বকাপের সাম্প্রতিক আসরগুলোতে জাপান ধারাবাহিকভাবে নিজেদের উন্নতির প্রমাণ দিয়ে আসছে। জার্মানি, স্পেনের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিদের হারানোর পর এখন তারা আর শুধু ‘ডার্ক হর্স’ নয়, বরং নকআউট পর্বে অনেক দূর যাওয়ার সক্ষমতা রাখে-এমন বিশ্বাস ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে।

 

তিউনিসিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচে জাপানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলগত সমন্বয়। কোনো একক তারকার ওপর নির্ভর না করে পুরো দল মিলে আক্রমণ ও রক্ষণে অংশ নিয়েছে। মাঝমাঠে এন্দো, কামাদা ও মোরিতার সমন্বয় যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো, তেমনি সামনে উয়েদা ও ইতো প্রতিপক্ষ রক্ষণকে বারবার সমস্যায় ফেলেছেন।

 

অন্যদিকে তিউনিসিয়ার জন্য এই হার বড় ধাক্কা। গোলশূন্য থাকার পাশাপাশি চার গোল হজম করায় গোল ব্যবধানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোতে তাদের সামনে এখন কঠিন সমীকরণ অপেক্ষা করছে।

 

এই জয়ের মাধ্যমে জাপান শুধু গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্টই অর্জন করেনি, বরং পুরো বিশ্বকাপের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছেও শক্ত বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। আক্রমণ, রক্ষণ, গতি ও কৌশলের নিখুঁত মিশ্রণে তারা দেখিয়ে দিয়েছে-এবারের আসরে তাদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

 

চার গোলের দাপুটে জয়, ক্লিন শিট এবং দুর্দান্ত দলগত পারফরম্যান্স-সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ মিশনের জন্য এর চেয়ে ভালো শুরু খুব কমই কল্পনা করতে পারত জাপান। এখন তাদের লক্ষ্য এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করা এবং আরও একবার বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়া।


সম্পর্কিত নিউজ