ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ১৬% বাড়তে পারে: বিশ্বব্যাংক

ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ১৬% বাড়তে পারে: বিশ্বব্যাংক
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতার কারণে চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য নতুন করে বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ Commodity Markets Outlook, April 2026 প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য গড়ে ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি, সার এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর দাম বেড়ে যাওয়াই এই চাপের মূল কারণ।

 

বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক পণ্যবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ২০২৬ সালে গড় জ্বালানি মূল্য ২৪ শতাংশ বাড়তে পারে, যা ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন হতে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামগ্রিক পণ্যমূল্য ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে পারে।

 

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাজারে আতঙ্ক

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। হরমুজ দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্য, সার, ধাতু, পরিবহন খরচ এবং উৎপাদন ব্যয়-সবখানেই তার প্রভাব পড়ে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ে, এরপর খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ও ঋণের খরচ আরও বেড়ে যায়।

 

দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

 

তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে খাদ্যেও চাপ পড়ে

জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পেট্রোল পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষিপণ্য উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, আমদানি-রপ্তানি-সবখানেই জ্বালানির ব্যবহার আছে। ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে থাকে।

 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে কৃষিপণ্যের মূল্যসূচক তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় পাম ও সয়াবিন তেলের মতো জৈব জ্বালানির সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে, যা খাদ্যবাজারে চাপ বাড়াতে পারে।

 

সারের দাম বড় উদ্বেগ

চলতি সংকটে সারের দামও বড় আলোচনায় এসেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের বরাতে জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, ইউরিয়ার দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে এবং সার খাতের সামগ্রিক দাম ৩১ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ইউরিয়া সরবরাহের বড় অংশ এবং অ্যামোনিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালির সঙ্গে সম্পর্কিত রুট দিয়ে চলাচল করায় সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে কৃষি খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।

 

বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে সারের দাম বাড়ার প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার, সেচ, ডিজেল, পরিবহন ও আমদানির খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ধান, সবজি, মাছ, পোলট্রি, ডিমসহ খাদ্যপণ্যের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও সারের দাম একসঙ্গে বাড়লে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

ধাতুর বাজারেও অস্থিরতা

বিশ্বব্যাংক বলছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর দামও রেকর্ড উচ্চতায় যেতে পারে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে খনি, পরিশোধন, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে। ফলে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, নির্মাণসামগ্রী ও উৎপাদন খাতের কাঁচামালে চাপ তৈরি হয়। শিল্পোৎপাদন ব্যয় বাড়লে নির্মাণ, অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ভোক্তা পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের পণ্যবাজার পাতায়ও বলা হয়েছে, জ্বালানি ও সারের পাশাপাশি কয়েকটি প্রধান ধাতুর রেকর্ডমূল্য সামগ্রিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধির বড় কারণ।

 

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি বেশি

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে-প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ছে, এরপর খাদ্যের দাম বাড়ছে, তারপর মূল্যস্ফীতি বাড়ছে; এতে সুদের হার ও ঋণের ব্যয় আরও বাড়তে পারে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেশি চাপের মুখে পড়ে, কারণ তাদের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে সামলাতে হয়।

 

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ২০২৬ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ১ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে ৭০ শতাংশ পণ্য আমদানিকারক এবং ৬০ শতাংশের বেশি পণ্য রপ্তানিকারক দেশের প্রবৃদ্ধি আগের ধারণার চেয়ে দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

বাংলাদেশে চাপের নতুন ধাপ

বাংলাদেশে এমনিতেই তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারির ৯ দশমিক ১৩ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কম হলেও এখনো উচ্চ পর্যায়ে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি মার্চে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ ছিল।

 

এর মধ্যেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকার ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলেছে।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি খরচ বাড়ায় বাংলাদেশ খুচরা জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যাঘাত, পরিবহন ও বীমা খরচ বাড়ায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।

 

সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে

জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে পণ্য আনার খরচ বাড়ে। এতে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যে চাপ তৈরি হতে পারে। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষিতে সেচ খরচও বাড়ে। একই সঙ্গে ট্রাক, বাস, লঞ্চ, পণ্যবাহী যান এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।

 

বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। আয় একই থাকলে কিন্তু খাদ্য, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা খরচ বাড়লে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মানুষ পুষ্টিকর খাবার কম খায়, অপ্রয়োজনীয় খরচ কাটে, সঞ্চয় কমে যায় এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

 

সামনে কী হতে পারে

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হলে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘ হলে তেল, গ্যাস, সার, ধাতু ও খাদ্যপণ্যের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সময়ে সতর্ক নীতি দরকার। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, খাদ্য মজুত, সার সরবরাহ, পরিবহন খরচ, বাজার তদারকি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা-সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু জ্বালানির দাম সমন্বয় করলেই হবে না; বাজারে যেন অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে, সেটিও নজরে রাখতে হবে।


সম্পর্কিত নিউজ