ঢাকা আজ বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষে

ঢাকা আজ বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষে
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকাই উঠে এসেছে শীর্ষে - দিল্লি ও লাহোরকে পেছনে ফেলে। সাধারণত এই দুই শহরই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় ঘুরেফিরে ওপরে থাকে। কিন্তু আজকের চিত্র বলছে, ঢাকার বাতাস আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে (প্রতিবেদন তৈরির সময়) বিশ্বব্যাপী ১২১টি শহরের লাইভ সূচকে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) দেখা গেছে ২৯১ - যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ স্তরে পড়ে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীবাসী একদিনও “নির্মল বায়ু” পাননি - এমন বাস্তবতাও সামনে এসেছে।

দূষণের মাত্রা কেন উদ্বেগজনক

AQI সাধারণভাবে ২০০ ছাড়ালেই বাতাসকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। আর ৩০০ পেরোলেই পরিস্থিতি ‘দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ে যায় - যেখানে শিশু, বয়স্ক, হৃদরোগী-অ্যাজমা রোগীসহ সাধারণ মানুষও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।

আজকের হিসাবে ঢাকার কয়েকটি স্থানে দূষণ আরও তীব্র। চারটি পয়েন্টে মান অস্বাভাবিক খারাপ দেখা গেছে - এর মধ্যে একটি স্থানে সূচক ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে বিরলভাবে উচ্চ।

রাজধানীর যে এলাকাগুলোতে অবস্থা সবচেয়ে খারাপ

আজকের লাইভ সূচক অনুযায়ী ঢাকায় চারটি স্থানে দূষণ ছিল সবচেয়ে বেশি -

  • নিকুঞ্জ (এএসএল সিস্টেমস লিমিটেড সংলগ্ন): ৫৪১
  • দক্ষিণ পল্লবী: ৪২২
  • বেচারাম দেউড়ি: ৪০০
  • ধানমন্ডি: ৩৮০

এমন উচ্চ মাত্রার দূষণ সাধারণত ধুলাবালি, নির্মাণকাজ, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং আবহাওয়ার (বাতাস স্থির থাকা/মেঘাচ্ছন্নতা) মতো কারণ একসঙ্গে সক্রিয় হলে বেড়ে যায়। ঢাকার বাইরে কিছু এলাকায়ও সাম্প্রতিক সময়ে দূষণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে - যা সমস্যাটিকে কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে জাতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।

আইকিউএয়ার কী বলছে

ঢাকার আজকের এই অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান I QAir–এর লাইভ ট্র্যাকিংয়ে। এ ধরনের লাইভ সূচক নগরভিত্তিক বাতাসের মান সম্পর্কে মানুষকে দ্রুত ধারণা দেয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় বারবার সতর্কতা এসেছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে - ২০১৯ সালে দেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং জিডিপিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ শতাংশ হতে পারে। এ ধরনের হিসাব দূষণকে শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের বড় সংকট হিসেবেও চিহ্নিত করে।

উদ্যোগ আছে, ফল কম - কেন?

দূষণ কমাতে বিভিন্ন সরকারের সময়ে নানা কর্মসূচির কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান উন্নতি কম - এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার একটি বড় জায়গা হলো এলাকাভিত্তিক উৎস চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়া।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঢাকার যেসব এলাকায় দূষণ বেশি—সেগুলোতে এলাকাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ জরুরি; কোথাও নির্মাণকাজ, কোথাও শিল্পকারখানা বা নির্দিষ্ট কোনো উৎস দায়ী হতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উদ্যোগ কার্যকরভাবে দেখা যায় না।

নতুন সরকার কী করতে পারে

ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে “ঘোষণা” নয়, কমপক্ষে ৫টি কাজ দ্রুত শুরু করলে বাস্তব পরিবর্তন দেখা যেতে পারে -

হটস্পট ম্যাপিং + সোর্স ট্র্যাকিং
যে এলাকায় AQI বারবার বেশি - সেখানে মোবাইল মনিটরিং ইউনিট ও ডেটা-ভিত্তিক তদন্ত।

নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক
সাইট কভারিং, পানি ছিটানো, ট্রাক ঢেকে চলা, বালু/মাটি খোলা না রাখা - এসব বাস্তবায়নে জরিমানা ও লাইসেন্স ব্যবস্থা।

ব্রিক কিলন ও শিল্প নির্গমন নিয়ন্ত্রণ
মানহীন কিলন/কারখানায় অভিযান নয় - টেকসইভাবে প্রযুক্তি আপগ্রেড, নির্গমন সীমা ও নিয়মিত অডিট।

যানবাহনের ধোঁয়া ও ফিটনেসে কড়াকড়ি
কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী বাস/ট্রাক/পুরোনো যান শনাক্ত ও ধাপে ধাপে রুট-সীমাবদ্ধতা।

জনসচেতনতা + স্বাস্থ্য সতর্কতা ব্যবস্থা
“AQI ২০০+ হলে” স্কুল/আউটডোর অ্যাক্টিভিটি, মাস্ক-পরামর্শ, ঝুঁকিপূর্ণদের সতর্কতা - এসব নিয়ে অফিসিয়াল গাইডলাইন।


সবশেষে, ঢাকার আজকের দূষণচিত্র শুধু একটি দিনের সূচক নয় - এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার স্পষ্ট সতর্কবার্তা। পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে “পরের সপ্তাহে দেখা যাবে” ধরনের সিদ্ধান্ত আর যথেষ্ট নয়। এলাকাভিত্তিক দূষণের উৎস শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা, নিয়মিত মনিটরিং এবং বাস্তব প্রয়োগ - এই তিনটিই এখন সবচেয়ে জরুরি। নইলে ঢাকার বাতাস আরও বেশি ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ স্তরে স্থায়ীভাবে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকবে, আর এর মূল্য দিতে হবে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও দেশের অর্থনীতিকে।


সম্পর্কিত নিউজ