{{ news.section.title }}
হঠাৎ প্রেশার লো হলে কী করবেন?
প্রেসার কমে গেলে (লো ব্লাড প্রেসার) তাৎক্ষণিকভাবে রোগীকে শুইয়ে দিয়ে পা কিছুটা উঁচু করে রাখুন। এরপর দ্রুত এক গ্লাস খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি অথবা সামান্য লবণ-চিনির শরবত পান করান। এতে রক্তচাপ দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে
লো প্রেশার বা নিম্ন রক্তচাপ (রক্তচাপ ৯০/৬০ মি.মি. পারদ-এর নিচে নামলে) হলে তাৎক্ষণিক রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে খাবার স্যালাইন বা লবণ-পানি পান করা সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া উপায়। তবে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রেশার মেপে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
প্রেসার লো হলে লক্ষণ
লো প্রেশার বা নিম্ন রক্তচাপের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ মাথা ঘোরা বা মাথা হালকা লাগা। রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে, বিশেষ করে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে লক্ষণগুলো দেখা দেয়।
লো প্রেশার হলে সাধারণত নিচে উল্লেখিত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
১. প্রধান ও সাধারণ লক্ষণসমূহ
মাথা ঘোরা: বসা বা শোয়া থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে ওঠা (Orthostatic Hypotension) মায়ো ক্লিনিকের তথ্যমতে।
অতিরিক্ত ক্লান্তি: শরীরে কোনো শক্তি না পাওয়া এবং তীব্র অবসাদ বোধ করা।
চোখে ঝাপসা দেখা: চারপাশ অন্ধকার বা ধোঁয়াশাটে মনে হওয়া।
বমি বমি ভাব: পেটে অস্বস্তি হওয়া এবং বমি করার ইচ্ছা জাগা।
২. শারীরিক ও মানসিক অন্যান্য লক্ষণ
মনোযোগের অভাব: কোনো কাজে মন দিতে না পারা বা মাথা খাটাতে কষ্ট হওয়া।
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: রক্তচাপ খুব বেশি নেমে গেলে রোগী সাময়িকভাবে জ্ঞান হারাতে পারে (Syncope)।
অতিরিক্ত তৃষ্ণা: শরীর পানিশূন্য বা ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়লে তীব্র পানি পিপাসা লাগে।
হাত-পা ঠান্ডা হওয়া: ত্বক ফ্যাকাশে দেখায় এবং হাত ও পায়ের তালু ঠান্ডা বা স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়।
৩. মারাত্মক বা জরুরি লক্ষণ (Shock-এর লক্ষণ)
রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে গেলে জীবন সংশয় হতে পারে। এই অবস্থাকে 'শক' বলা হয়, যার লক্ষণগুলো হলো:
দ্রুত এবং অগভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া।
নাড়ির স্পন্দন (Pulse) অত্যন্ত দুর্বল কিন্তু খুব দ্রুত হওয়া।
বিভ্রান্তি বা চারপাশের পরিস্থিতি বুঝতে না পারা (বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে)।
লো প্রেশার হলে দ্রুত প্রেশার বাড়াতে এবং সুস্থ বোধ করতে নিচে উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন:
১. তাৎক্ষণিক করণীয় (ফার্স্ট এইড)
শুয়ে পড়া বা বসা: মাথা ঘুরলে বা দুর্বল লাগলে দ্রুত ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে শুয়ে বা বসে পড়ুন। শোয়ার সময় পায়ের নিচে ১টি বা ২টি বালিশ দিয়ে পা সামান্য উঁচুতে রাখুন, এতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়বে।
ধীরে অবস্থান বদলানো: বসা বা শোয়া থেকে হঠাৎ ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াবেন না। বিছানা থেকে ওঠার সময় প্রথমে কিছুক্ষণ বসে থাকুন, তারপর আস্তে আস্তে দাঁড়ান।
২. দ্রুত রক্তচাপ বাড়ানোর খাবার ও পানীয়
খাবার স্যালাইন (ওরস্যালাইন): শরীরে পানিশূন্যতা বা সোডিয়ামের ঘাটতি দূর করতে আধা লিটার পানিতে ১ প্যাকেট ওরস্যালাইন গুলিয়ে খান।
লবণ-পানি বা শরবত: ঘরে স্যালাইন না থাকলে এক গ্লাস পানিতে ১/২ চা চামচ লবণ ও চিনি মিশিয়ে লেবুর শরবত বানিয়ে খেতে পারেন।
কফি বা চা: ক্যাফেইনযুক্ত কফি বা কড়া চা সাময়িকভাবে দ্রুত রক্তচাপ বাড়াতে খুব সাহায্য করে।
ডিম ও পুষ্টিকর খাবার: একটি ডিম (হাঁস বা মুরগির) সেদ্ধ করে সামান্য লবণ মাখিয়ে খান। এছাড়া কিশমিশ ভেজানো পানি, ডাবের পানি, বা এক গ্লাস দুধও রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে কার্যকর।
৩. জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন
পর্যাপ্ত পানি পান: দৈনিক অন্তত ২ থেকে ২.৫ লিটার পানি বা তরল খাবার (যেমন স্যুপ, ফলের রস) পান করুন।
স্বল্প পরিমাণে বারবার খাওয়া: একবারে বেশি না খেয়ে সারাদিনে অল্প অল্প করে বারবার (Small and frequent meals) খাবার গ্রহণ করুন।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকা: একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।
প্রেসার লো হলে কি কি সমস্যা হয়
লো প্রেশার বা নিম্ন রক্তচাপের কারণে মূলত শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে (যেমন- মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড ও কিডনি) পর্যাপ্ত রক্ত এবং অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে তাৎক্ষণিক শারীরিক অস্বস্তি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে।
রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে যে ধরনের সমস্যা বা ক্ষতি হতে পারে, তা নিচে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হলো:
১. তাৎক্ষণিক দুর্ঘটনা ও শারীরিক আঘাত
পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া: মাথা ঘোরার কারণে বা হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে (Fainting) মেঝেতে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট বা হাড় ভাঙার মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এটি লো প্রেশারের সবচেয়ে বড় এবং সাধারণ ঝুঁকি।
কাজে ব্যাঘাত ও ব্রেন ফগ: তীব্র দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং মনোযোগের অভাবের কারণে পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জরুরি কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
২. গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি (Organ Damage)
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস: দীর্ঘদিন মস্তিষ্কে কম রক্ত সরবরাহ হলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, সিদ্ধান্তহীনতা এবং মাথা খাটাতে না পারার মতো দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যা হতে পারে।
কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট: কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে গেলে তা শরীর থেকে ঠিকমতো বর্জ্য নিষ্কাশন করতে পারে না। এর ফলে প্রস্রাব কমে যাওয়া বা হঠাৎ কিডনি বিকল (Acute Kidney Injury) হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. হৃদপিণ্ডের সমস্যা
হার্ট ফেইলিওর: রক্তচাপ কমে গেলে হৃদপিণ্ড তার ক্ষতিপূরণ করতে সাধারণের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং জোরে রক্ত পাম্প করার চেষ্টা করে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন চলতে থাকলে হার্টের পেশি দুর্বল হয়ে স্থায়ী ড্যামেজ বা হার্ট ফেইলিওর হতে পারে।
বুক ধড়ফড়ানি (Palpitations): নাড়ির স্পন্দন বা পালস রেট অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়ে বুকে অস্বস্তি তৈরি হয়।
৪. বিপজ্জনক পরিস্থিতি: মেডিকেল শক (Shock)
রক্তচাপ যদি হঠাৎ তীব্রভাবে কমে যায় (যেমন- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মারাত্মক ইনফেকশন বা অ্যালার্জির কারণে), তবে শরীর 'শক'-এর স্তরে চলে যেতে পারে। এটি একটি জরুরি অবস্থা যার কারণে:
শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে (Multi-organ failure)।
রোগী কোমায় চলে যেতে পারে বা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
পরামর্শ: যদি প্রেশার লো হওয়ার কারণে প্রায়ই মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা হয়, তবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের মাধ্যমে এর আসল কারণ (যেমন- রক্তস্বল্পতা, হরমোনের সমস্যা বা ডিহাইড্রেশন) নির্ণয় করা জরুরি।
কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?
নিম্ন রক্তচাপের সাথে যদি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে ঘরোয়া চিকিৎসার ভরসায় না থেকে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন:
রোগী সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে গেলে
তীব্র বুক ধড়ফড় বা বুক ব্যথা হলে
শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে
শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা বা ফ্যাকাশে হয়ে গেলে
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা বা অনবরত বমি হওয়া