যেসব খাবার খেলে বাড়বে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা

যেসব খাবার খেলে বাড়বে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে ‘ইমিউনিটি’ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শব্দটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে শুধু করোনা নয়, ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু, বিভিন্ন ভাইরাসজনিত সংক্রমণ কিংবা সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই রোগের জটিলতা কম হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কোনো একটি খাবার, একটি ভিটামিন বা একটি ওষুধের ওপর নির্ভর করে না। এটি শরীরের অত্যন্ত জটিল একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে মস্তিষ্ক, অস্থিমজ্জা, রক্ত, লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম, অন্ত্র, ত্বক এবং বিভিন্ন অঙ্গ একসঙ্গে কাজ করে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা রাতারাতি বেড়ে যায়-এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

 

বর্তমানে চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমিউনিটি বাড়ানোর নামে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ বলছেন শুধু লেবু খেলেই রোগ হবে না, কেউ আবার নির্দিষ্ট ভেষজ উপাদানকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু Mayo Clinic, Harvard T.H. Chan School of Public Health এবং Johns Hopkins Medicine-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সুস্থতা।

 

বাংলাদেশেও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, ঘুমের অনিয়ম এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু থেকে বয়স্ক-সব বয়সী মানুষেরই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের দিকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম আসলে কী, কীভাবে কাজ করে

ইমিউন সিস্টেম হলো শরীরের এমন একটি জৈব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পরজীবী এবং শরীরের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। একই সঙ্গে এটি শরীরের অস্বাভাবিক বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ শনাক্ত করতেও ভূমিকা রাখে।

 

National Institutes of Health (NIH)-এর তথ্য অনুযায়ী, শরীরে কোনো জীবাণু প্রবেশ করলে প্রথমেই সক্রিয় হয় জন্মগত বা Innate Immune System। এটি শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর। ত্বক, নাকের শ্লেষ্মা, পাকস্থলীর অ্যাসিড, চোখের পানি এবং কিছু বিশেষ শ্বেত রক্তকণিকা এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ।

 

যদি জীবাণু এই প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে, তখন সক্রিয় হয় Adaptive Immune System বা অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা। এতে টি-সেল (T Cells), বি-সেল (B Cells) এবং অ্যান্টিবডি একসঙ্গে কাজ করে জীবাণুকে শনাক্ত করে ধ্বংস করে এবং ভবিষ্যতের জন্য সেই জীবাণুর স্মৃতিও সংরক্ষণ করে। এই কারণেই একবার কিছু সংক্রমণ হলে বা টিকা নেওয়ার পর শরীর ভবিষ্যতে একই জীবাণুর বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমিউন সিস্টেমকে একটি সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এখানে কোটি কোটি কোষ প্রতিনিয়ত শরীরকে পর্যবেক্ষণ করছে। কোথাও কোনো ক্ষতিকর জীবাণু প্রবেশ করলে তারা দ্রুত সংকেত পাঠায় এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ শুরু করে।

 

জন্মগত ও অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য কোথায়

চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়-জন্মগত (Innate Immunity) এবং অর্জিত (Adaptive Immunity)।

 

জন্মগত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা জন্ম থেকেই আমাদের শরীরে থাকে। এটি খুব দ্রুত কাজ শুরু করে এবং সব ধরনের জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ত্বক, শ্বাসনালির শ্লেষ্মা, পাকস্থলীর অ্যাসিড, জ্বর এবং প্রদাহ-এসবই জন্মগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ।

 

অন্যদিকে অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কিছুটা সময় নিয়ে কাজ শুরু করে। তবে এটি নির্দিষ্ট জীবাণুকে চিনে রাখতে পারে এবং ভবিষ্যতে একই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। টিকাদানের মূল ভিত্তিও এই অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা।

 

চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ থাকতে এই দুটি ব্যবস্থারই সঠিকভাবে কাজ করা জরুরি। কোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে শরীর সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণের শিকার হতে পারে।

 

কেন দুর্বল হয়ে যায় শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। শুধু বয়স বা রোগ নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনও এর ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

 

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাব, ফল ও শাকসবজি কম খাওয়া, অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত (Ultra-processed) খাবার নিয়মিত খাওয়া শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

 

একইভাবে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে।

 

Harvard Medical School-এর গবেষকদের মতে, ইমিউনিটি কোনো সুইচের মতো নয় যে ইচ্ছামতো চালু বা বন্ধ করা যাবে। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। তাই এটিকে অস্বাভাবিকভাবে ‘বাড়ানোর’ পরিবর্তে সুস্থ ও কার্যকর রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

শুধু ভিটামিন খেলেই কি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়?

বাজারে এখন অসংখ্য ভিটামিন, মিনারেল এবং ‘ইমিউনিটি বুস্টার’ নামে বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করেন, এগুলো খেলেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবতা এতটা সহজ নয়।

 

যদি কারও শরীরে নির্দিষ্ট কোনো ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ উপকারী হতে পারে। যেমন ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, আয়রন বা জিংকের ঘাটতি পূরণ করা প্রয়োজন হতে পারে।

 

কিন্তু শরীরে ঘাটতি না থাকলে অযথা অতিরিক্ত ভিটামিন খাওয়ার বিশেষ উপকার পাওয়া যায়-এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং অতিরিক্ত ভিটামিন এ, ডি বা কিছু মিনারেল শরীরের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপ্লিমেন্ট কখনোই সুষম খাদ্যের বিকল্প নয়। শরীরের অধিকাংশ পুষ্টি উপাদান প্রাকৃতিক খাবার থেকেই গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর।

 

সুষম খাদ্য কেন ইমিউনিটির সবচেয়ে বড় ভিত্তি

Academy of Nutrition and Dietetics-এর তথ্য অনুযায়ী, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিটি কোষ সঠিকভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি প্রয়োজন।

 

এই কারণেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শর্করা, আমিষ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, শাকসবজি, ফল এবং পর্যাপ্ত আঁশ রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো একটি খাদ্য উপাদান বাদ দিলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, ভাত, রুটি বা অন্যান্য শর্করা শরীরকে শক্তি দেয়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ডাল থেকে পাওয়া প্রোটিন রোগপ্রতিরোধ কোষ তৈরিতে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যকর চর্বি বিভিন্ন ভিটামিন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর ফল ও শাকসবজি শরীরকে ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে।

 

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সুষম খাদ্য মানে বেশি খাওয়া নয়; বরং শরীরের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের পুষ্টি সঠিক অনুপাতে গ্রহণ করা।

 

ওজনের সঙ্গে ইমিউনিটির সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ

অনেকেই শুধু অপুষ্টিকে সমস্যা মনে করেন। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূলতার কারণে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমাত্রার প্রদাহ (Chronic Low-grade Inflammation) তৈরি হয়। এর ফলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।

 

আবার অতিরিক্ত কম ওজন বা অপুষ্টিতেও শরীর পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন না পাওয়ায় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

চিকিৎসকদের মতে, তাই শুধু বেশি বা কম খাওয়া নয়, নিজের বয়স, উচ্চতা, ওজন এবং শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


সুষম খাদ্য কেন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি

শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করার জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি খাদ্যাভ্যাস, যেখানে শরীরের প্রয়োজনীয় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান সঠিক অনুপাতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একে সুষম খাদ্য বা Balanced Diet বলে থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং Academy of Nutrition and Dietetics-এর মতে, সুষম খাদ্যই সুস্থ ইমিউন সিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

 

চিকিৎসকদের মতে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কোটি কোটি কোষ প্রতিদিন নতুন করে তৈরি হয়, পুরোনো কোষের পরিবর্তে নতুন কোষ আসে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রচুর শক্তি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়। যদি শরীর পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং শক্তি না পায়, তাহলে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেকেই শুধু ফল খাওয়াকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্য মনে করেন, আবার কেউ শুধু প্রোটিনের দিকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো একটি খাদ্য উপাদান একা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে পারে না। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ এবং প্রতিরক্ষা কোষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন হয়।

 

তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শর্করা, আমিষ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, আঁশ, ভিটামিন, মিনারেল এবং পর্যাপ্ত পানি রাখা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে এই ভারসাম্যই শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

 

শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট কেন প্রয়োজন, এটি কি শুধু ওজন বাড়ায়?

অনেকেই মনে করেন কার্বোহাইড্রেট মানেই ওজন বাড়ানোর খাবার। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, এটি একটি ভুল ধারণা। কার্বোহাইড্রেট শরীরের প্রধান শক্তির উৎস এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও সঠিকভাবে কাজ করার জন্য এই শক্তির ওপর নির্ভর করে।

 

ভাত, রুটি, ওটস, লাল চাল, আলু, ভুট্টা, বিভিন্ন পূর্ণ শস্য এবং কিছু ফল থেকে শরীর প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট পায়। এগুলো শরীরে গ্লুকোজে পরিণত হয়ে কোষকে শক্তি জোগায়।

 

যদি দীর্ঘদিন প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম কার্বোহাইড্রেট খাওয়া হয়, তাহলে শরীর শক্তির ঘাটতিতে পড়ে এবং প্রোটিন ভাঙতে শুরু করে। এতে পেশির পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

 

তবে চিকিৎসকদের মতে, পরিশোধিত ময়দা, অতিরিক্ত মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে পূর্ণ শস্যজাত খাবার বেশি খাওয়াই স্বাস্থ্যকর।

 

প্রোটিন কেন রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি

রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কোষ, অ্যান্টিবডি এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রোটিন তৈরির জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। National Institutes of Health (NIH)-এর তথ্য অনুযায়ী, শরীরে সংক্রমণ হলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত নতুন কোষ তৈরি করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রোটিনের ভূমিকা অপরিহার্য।

 

মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, দুধ, দই, ডাল, ছোলা, মসুর, সয়াবিন এবং বিভিন্ন ডালজাতীয় খাবার ভালো মানের প্রোটিনের উৎস। যারা নিরামিষভোজী, তারাও ডাল, সয়াবিন, বাদাম এবং বিভিন্ন বীজ থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন পেতে পারেন।

 

চিকিৎসকদের মতে, অনেক মানুষ ওজন কমানোর জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রোটিন কমিয়ে দেন। আবার কেউ অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করেন। দুটি অবস্থাই উপযুক্ত নয়। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণই সবচেয়ে নিরাপদ।

 

তবে কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রোটিন ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তাদের খাদ্যতালিকা অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

 

স্বাস্থ্যকর চর্বি কি সত্যিই ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে?

চর্বি বা ফ্যাটের নাম শুনলেই অনেকে ভয় পান। কিন্তু সব ধরনের চর্বি শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং স্বাস্থ্যকর চর্বি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, হরমোন উৎপাদন এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

অলিভ অয়েল, সামুদ্রিক মাছ, তেলযুক্ত মাছ, বাদাম, কাঠবাদাম, আখরোট, তিসি বীজ, চিয়া সিড এবং বিভিন্ন বীজে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি শরীরের জন্য উপকারী।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্বাস্থ্যকর চর্বি প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে এবং কোষের ঝিল্লিকে সুস্থ রাখে। এর ফলে রোগপ্রতিরোধ কোষও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে।

 

অন্যদিকে ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, স্থূলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ভাজাপোড়া ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

ভিটামিন ‘সি’ কেন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কথা উঠলেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ভিটামিন ‘সি’। এর কারণও রয়েছে। Mayo Clinic এবং NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, ভিটামিন ‘সি’ শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

 

এই ভিটামিন শরীরকে ক্ষতিকর ফ্রি-র‌্যাডিকেলের প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয় এবং ক্ষত দ্রুত সারাতেও ভূমিকা রাখে। তবে এটি কোনো সংক্রমণ প্রতিরোধের জাদুকরি উপাদান নয়।

 

পেয়ারা, আমলকী, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, লেবু, কাঁচামরিচ, সজনে পাতা, ব্রোকলি, ক্যাপসিকাম, টমেটো এবং বিভিন্ন সবুজ শাক ভিটামিন ‘সি’-এর ভালো উৎস।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন ‘সি’ পানিতে দ্রবণীয় হওয়ায় দীর্ঘ সময় রান্না করলে এর কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই ফল তাজা অবস্থায় খাওয়া এবং শাকসবজি অতিরিক্ত সিদ্ধ না করাই ভালো।

 

ভিটামিন ‘ডি’ শুধু হাড় নয়, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ

একসময় ভিটামিন ‘ডি’কে শুধু হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে গবেষণায় দেখা গেছে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অনেক কোষেই ভিটামিন ‘ডি’-এর রিসেপ্টর রয়েছে। WHO এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘ডি’ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে অতিরিক্ত ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণেরও ঝুঁকি রয়েছে।

 

সূর্যের আলো শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরিতে সাহায্য করে। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ, মাছের তেল, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ কিছু খাবার থেকেও এটি পাওয়া যায়।

 

চিকিৎসকদের মতে, কারও শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি আছে কি না, তা পরীক্ষা ছাড়া বোঝা যায় না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

 

ভিটামিন ‘এ’, ‘ই’, ‘বি৬’, ‘বি১২’ ও ফোলেটের ভূমিকা

রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা শুধু ভিটামিন ‘সি’ বা ‘ডি’-এর ওপর নির্ভর করে না। আরও অনেক ভিটামিন একসঙ্গে কাজ করে। ভিটামিন ‘এ’ ত্বক এবং শ্বাসতন্ত্রের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাজর, মিষ্টিকুমড়া, কলিজা, ডিম এবং সবুজ শাক থেকে এটি পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘ই’ একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। বাদাম, সূর্যমুখীর বীজ, বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেল এবং পালং শাকে এটি রয়েছে।

 

ভিটামিন ‘বি৬’, ‘বি১২’ এবং ফোলেট নতুন রক্তকণিকা ও রোগপ্রতিরোধ কোষ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাছ, ডিম, মাংস, দুধ, ডাল, সবুজ শাক এবং বিভিন্ন পূর্ণ শস্যে এসব ভিটামিন পাওয়া যায়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভিটামিনের ঘাটতি দীর্ঘদিন থাকলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

 

জিংক, সেলেনিয়াম, আয়রন ও ম্যাগনেশিয়াম কেন প্রয়োজন

ভিটামিনের পাশাপাশি কিছু খনিজ উপাদানও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিংক নতুন রোগপ্রতিরোধ কোষ তৈরি এবং ক্ষত সারাতে ভূমিকা রাখে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল এবং মিষ্টিকুমড়ার বিচি জিংকের ভালো উৎস।সেলেনিয়াম শরীরকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। মাছ, ডিম এবং কিছু বাদামে এটি পাওয়া যায়।

 

আয়রনের অভাবে শুধু রক্তশূন্যতাই নয়, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে ম্যাগনেশিয়াম শরীরের শত শত জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় এবং পেশি ও স্নায়ুর পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজেও ভূমিকা রাখে।

 

চিকিৎসকদের মতে, এসব খনিজের ঘাটতি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হতে পারে। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ নিরাপদ নয়।

 

মৌসুমি ফল ও রঙিন শাকসবজি কেন প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত

পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের ফল ও শাকসবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার কারণ হলো প্রতিটি রঙে ভিন্ন ধরনের ভিটামিন, মিনারেল এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে।

 

সবুজ শাক, লাল টমেটো, কমলা গাজর, বেগুনি ফল, হলুদ কুমড়া-প্রতিটি খাবার শরীরে ভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। এগুলো কোষকে সুরক্ষা দিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, বিদেশি ফলের চেয়ে স্থানীয় মৌসুমি ফলও সমান উপকারী। পেয়ারা, আমলকী, পেঁপে, কলা, আনারস, লিচু, আম, জাম, তরমুজ এবং দেশীয় বিভিন্ন ফল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।

 

অন্ত্রের স্বাস্থ্য (Gut Microbiome) কেন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত

বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হওয়া বিষয়গুলোর একটি হলো গাট মাইক্রোবায়োম (Gut Microbiome)। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন সংখ্যক উপকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য অণুজীব বসবাস করে, যাদের অধিকাংশই শরীরের জন্য উপকারী। National Institutes of Health (NIH), Harvard Medical School এবং Cleveland Clinic-এর গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রায় ৭০ শতাংশ কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে অন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

অন্ত্রের এই উপকারী অণুজীবগুলো শুধু খাবার হজমেই সাহায্য করে না, বরং ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (Short-chain Fatty Acids) তৈরি করে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রোগপ্রতিরোধ কোষকে সঠিকভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত পাঠায়। ফলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে ইমিউন সিস্টেমও তুলনামূলকভাবে ভালো কাজ করতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, পর্যাপ্ত আঁশ না খাওয়া এবং দীর্ঘদিন মানসিক চাপের কারণে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর ফলে হজমের সমস্যা ছাড়াও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস প্রয়োজন। নিয়মিত শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল এবং প্রাকৃতিকভাবে ফারমেন্টেড খাবার খাওয়ার মাধ্যমে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সক্রিয় রাখা সম্ভব।

 

প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক-দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?

অনেকেই প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিককে একই বিষয় মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ দুটি ভিন্ন ধারণা।

 

প্রোবায়োটিক হলো জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে প্রিবায়োটিক হলো এমন ধরনের খাদ্যআঁশ, যা এই উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাবার হিসেবে কাজ করে এবং তাদের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

 

বিশ্ব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সংস্থা এবং Academy of Nutrition and Dietetics-এর মতে, শুধু প্রোবায়োটিক গ্রহণ করলেই হবে না; প্রিবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবারও প্রয়োজন, যাতে উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

 

রসুন, পেঁয়াজ, কলা, ওটস, বিভিন্ন পূর্ণ শস্য, ডাল এবং কিছু সবজিতে প্রাকৃতিকভাবে প্রিবায়োটিক উপাদান থাকে। অন্যদিকে দই এবং কিছু ফারমেন্টেড খাবারে প্রোবায়োটিক পাওয়া যায়।

 

চিকিৎসকদের মতে, বাজারে পাওয়া সব প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। নির্দিষ্ট রোগ বা অবস্থার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো ব্যবহার করা উচিত।

 

দই কি সত্যিই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে?

দইকে অনেকেই সুপারফুড হিসেবে বিবেচনা করেন। যদিও চিকিৎসকদের মতে, একে অলৌকিক খাবার বলা যাবে না, তবে এটি একটি পুষ্টিকর খাদ্য, যা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

 

প্রাকৃতিক দইয়ে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন বি১২ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও রয়েছে।

 

তবে সব ধরনের দই এক রকম নয়। অনেক ফ্লেভারযুক্ত বা বাজারজাত মিষ্টি দইয়ে অতিরিক্ত চিনি থাকে, যা নিয়মিত বেশি পরিমাণে খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। চিকিৎসকদের মতে, চিনি ছাড়া বা কম চিনিযুক্ত টকদই তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প।

 

যাদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা (Lactose Intolerance) রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কোন ধরনের দই উপযুক্ত হবে, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।

 

ওমেগা–৩ কীভাবে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখার ক্ষেত্রে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়েও ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। American Heart Association (AHA) এবং NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, ওমেগা–৩ শরীরের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ (Chronic Inflammation) নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

প্রদাহ সব সময় খারাপ নয়। সংক্রমণের সময় এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক প্রদাহ থাকলে তা হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

 

সামুদ্রিক চর্বিযুক্ত মাছ, যেমন-স্যালমন, সারডিন, ম্যাকারেল এবং টুনায় ওমেগা–৩ বেশি থাকে। এছাড়া তিসি বীজ, চিয়া সিড এবং আখরোটেও কিছু পরিমাণ ওমেগা–৩ পাওয়া যায়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমেগা–৩ সাপ্লিমেন্ট সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। যাদের প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক উপযুক্ত মাত্রা নির্ধারণ করবেন।

 

আদা, রসুন, হলুদ ও কালোজিরা-বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলছে?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আদা, রসুন, হলুদ এবং কালোজিরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যকর উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব নিয়ে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাও হয়েছে।

 

রসুনে থাকা Allicin, হলুদের Curcumin, আদার Gingerol এবং কালোজিরার Thymoquinone-এর মতো কিছু প্রাকৃতিক যৌগ ল্যাবরেটরি গবেষণায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে।

 

তবে Mayo Clinic এবং NIH-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপাদান স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, কিন্তু এগুলো কোনো রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। শুধুমাত্র রসুন, আদা বা কালোজিরা খেয়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়-এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে নেই।

 

চিকিৎসকদের মতে, এসব প্রাকৃতিক মসলা পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত খাবারের সঙ্গে ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো। অতিরিক্ত বা ভেষজ সাপ্লিমেন্ট আকারে গ্রহণের আগে বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, রক্তপাতের ঝুঁকি আছে এমন ব্যক্তি বা নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

গ্রিন টি কি ইমিউনিটি বাড়ায়?

গ্রিন টি নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা চলছে। এতে থাকা Catechin এবং EGCG (Epigallocatechin Gallate) নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিন টি কোনো ওষুধ নয় এবং এটি সংক্রমণ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হতে পারে।

 

দিনে এক থেকে দুই কাপ চিনি ছাড়া গ্রিন টি অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে অতিরিক্ত গ্রিন টি পান করলে ক্যাফেইনের কারণে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা বা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেটের অস্বস্তি হতে পারে।

 

বিশেষ করে গর্ভবতী নারী এবং যারা নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করেন, তারা নিয়মিত বেশি পরিমাণে গ্রিন টি পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

 

পর্যাপ্ত পানি কেন রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য

মানবদেহের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই পানি। তাই শরীরে পানির ভারসাম্য ঠিক না থাকলে প্রায় সব অঙ্গের কার্যক্রমই ব্যাহত হতে পারে।

 

পর্যাপ্ত পানি রক্ত সঞ্চালন, পুষ্টি পরিবহন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কিডনির কার্যক্রম এবং কোষের স্বাভাবিক কাজ বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া মুখ, নাক এবং শ্বাসতন্ত্রের শ্লেষ্মা ঝিল্লিকে আর্দ্র রাখতেও পানি গুরুত্বপূর্ণ, যা জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষা স্তরের অংশ।

 

চিকিৎসকদের মতে, অনেকেই শুধু তৃষ্ণা লাগলে পানি পান করেন। কিন্তু বিশেষ করে গরমের সময় নিয়মিত অল্প অল্প করে পানি পান করা ভালো। ফল, শাকসবজি এবং অন্যান্য তরল থেকেও শরীর কিছু পানি পেয়ে থাকে।

 

তবে অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়কে বিশুদ্ধ পানির বিকল্প ভাবা উচিত নয়।

 

অতিরিক্ত চিনি ও আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার কেন ইমিউনিটির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে

বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত চিনি এবং আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার নিয়মিত খেলে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমাত্রার প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্স ফ্যাট এবং বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান থাকে, কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল ও আঁশের পরিমাণ কম থাকে। ফলে শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোমল পানীয়, চিপস, প্রসেসড মাংস, অতিরিক্ত মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি এবং ফাস্টফুড নিয়মিত বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব অবস্থাও পরোক্ষভাবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে।

 

তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, এসব খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব না হলেও যতটা সম্ভব সীমিত রাখা উচিত এবং তার পরিবর্তে প্রাকৃতিক ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়া উচিত।

 

রঙিন খাবার কেন প্রতিদিনের প্লেটে থাকা উচিত

 

পুষ্টিবিদরা প্রায়ই বলেন, আপনার খাবারের প্লেট যত রঙিন হবে, তত বেশি বৈচিত্র্যময় পুষ্টি পাবেন। এর কারণ হলো বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজিতে ভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইটোকেমিক্যাল এবং ভিটামিন থাকে।

 

গাজরের কমলা রঙে বিটা-ক্যারোটিন, টমেটোতে লাইকোপেন, পালং শাকে লুটেইন, বেগুনি ফল ও সবজিতে অ্যান্থোসায়ানিন এবং বিভিন্ন ফলের ভিটামিন ‘সি’-এসব উপাদান শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না খেয়ে বিভিন্ন রঙের মৌসুমি ফল ও শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীর নানা ধরনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পায়।

 

নিয়মিত ব্যায়াম কীভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে

শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাষ্ট্রের Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এবং American College of Sports Medicine (ACSM)-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ব্যায়াম শুধু হৃদ্‌যন্ত্র বা পেশির জন্যই নয়, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝারি মাত্রার নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। এর ফলে শ্বেত রক্তকণিকা, টি-সেল, ন্যাচারাল কিলার (NK) সেল এবং অন্যান্য রোগপ্রতিরোধ কোষ শরীরের বিভিন্ন অংশে দ্রুত পৌঁছাতে পারে। এতে সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা উন্নত হতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, হালকা দৌড়, যোগব্যায়াম অথবা ঘরের সাধারণ কাজও শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। WHO-এর সুপারিশ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অথবা ৭৫ মিনিট উচ্চমাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত কঠোর ব্যায়াম বা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় ভারী শারীরিক অনুশীলন করলে সাময়িকভাবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়তে পারে। তাই ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

 

পর্যাপ্ত ঘুম কেন রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য

অনেকেই স্বাস্থ্যকর খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়ামও করেন, কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্বকে তেমন গুরুত্ব দেন না। অথচ Mayo Clinic, NIH এবং Sleep Foundation-এর গবেষণা অনুযায়ী, ঘুমের সময়ই শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেরামত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও নিজেকে পুনর্গঠন করে।

 

ঘুমের সময় শরীরে বিভিন্ন ধরনের সাইটোকাইন (Cytokines) নামের প্রোটিন তৈরি হয়, যা সংক্রমণ এবং প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই প্রতিরক্ষামূলক উপাদানের উৎপাদন কমে যেতে পারে।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন প্রতিদিন ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান, তারা সাধারণ সর্দি-কাশি বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণে তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে টিকা নেওয়ার পর শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির প্রক্রিয়াতেও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। শিশু, কিশোর এবং বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের জৈবঘড়িকে (Circadian Rhythm) সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

 

মানসিক চাপ কীভাবে নীরবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে

মানসিক চাপ শুধু মনের ওপর নয়, পুরো শরীরের ওপরই প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে শরীরে কর্টিসল (Cortisol) নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। Cleveland Clinic এবং Harvard Medical School-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা কর্মক্ষেত্রের চাপের কারণে অনেকের ঘুম কমে যায়, খাদ্যাভ্যাস বদলে যায় এবং শারীরিক কার্যক্রমও কমে যায়। এসব বিষয় একসঙ্গে ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করতে পারে।

 

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিদের শরীরে প্রদাহজনিত কিছু রাসায়নিকের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে সংক্রমণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত হাঁটা, ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শখের কাজ করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

 

ধূমপান ও অ্যালকোহল কীভাবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষতি করে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে ধূমপান শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্ষতি করে এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে।

 

সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা হাজারো রাসায়নিক পদার্থ শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়। এতে ফুসফুস জীবাণুর বিরুদ্ধে কম কার্যকর হয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

 

অন্যদিকে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যও নষ্ট করতে পারে। ফলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া এবং অ্যালকোহল পরিহার বা সীমিত রাখা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সুস্থ রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

 

বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত দূষণও কেন ইমিউনিটির শত্রু

বর্তমানে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, পরিবেশও মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করলে শ্বাসতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে।

 

সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM2.5), যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার দূষণ এবং বিষাক্ত গ্যাস ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস এবং বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত দূষণের দিনে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, মাস্ক ব্যবহার করা এবং ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করা উপকারী হতে পারে।

 

স্থূলতা কেন শুধু ওজনের সমস্যা নয়

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন স্থূলতাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত অবস্থা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। অতিরিক্ত চর্বি শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ বাড়িয়ে রাখে।

 

এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ফলে শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে ব্যর্থ হতে পারে। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ এবং ফ্যাটি লিভারের মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।

 

চিকিৎসকদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সুস্থ রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের জন্য কেন বিশেষ পুষ্টি দরকার

জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার চাহিদা এক রকম নয়। শিশুদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি। তাই তাদের জন্য পুষ্টিকর খাবার, টিকাদান এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা কিছুটা কমে যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Immunosenescence বলা হয়। তাই তাদের পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি।

 

গর্ভবতী নারীদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় স্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন ঘটে। তাই তাদের জন্য সুষম খাদ্য, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিনটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সাপ্লিমেন্ট নিজে থেকে না নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।

 

কখন সাপ্লিমেন্ট দরকার, কখন শুধু খাবারই যথেষ্ট

বর্তমানে বাজারে অসংখ্য মাল্টিভিটামিন ও ইমিউনিটি বুস্টার বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সব মানুষের জন্য এগুলো প্রয়োজন হয় না।

 

চিকিৎসকদের মতে, যদি পরীক্ষায় কোনো নির্দিষ্ট ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি ধরা পড়ে, অথবা বিশেষ কোনো শারীরিক অবস্থা থাকে, তখন চিকিৎসক সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। যেমন-ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতা বা গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট চাহিদা।

 

তবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে শুধু বেশি ভিটামিন খেলেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে-এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অতিরিক্ত ভিটামিন এ, ডি, আয়রন বা জিংক দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, "Food First" বা খাবার থেকেই পুষ্টি গ্রহণ-এটাই হওয়া উচিত প্রথম লক্ষ্য। সাপ্লিমেন্ট হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে।

 

টিকাদানও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ

অনেকেই মনে করেন, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি শুধু খাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, টিকাদানও সুস্থ ইমিউন সিস্টেম গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

 

টিকা শরীরকে নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে নিরাপদভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শেখায়। এর ফলে ভবিষ্যতে সেই জীবাণুর সংক্রমণ হলে শরীর দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে।

 

WHO এবং CDC-এর মতে, শিশুদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সব টিকা সময়মতো সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদেরও নির্দিষ্ট টিকা নেওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে মানুষের আগ্রহ যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে নানা ধরনের ভুল ধারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের কারণে অনেকেই এমন কিছু বিশ্বাস করেন, যার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সত্যের মিল নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাষ্ট্রের National Institutes of Health (NIH), Mayo Clinic এবং Harvard Medical School-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইমিউনিটি নিয়ে ভুল তথ্য অনেক সময় মানুষের ক্ষতির কারণও হতে পারে।

 

সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো-একটি নির্দিষ্ট খাবার বা ভেষজ উপাদান খেলেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে যায়। বাস্তবে এমন কোনো খাবার নেই, যা একাই শরীরকে সব ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। বরং দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক সুস্থতার সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

 

আরেকটি ভুল ধারণা হলো, বেশি ভিটামিন খেলেই বেশি উপকার হবে। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে ঘাটতি না থাকলে অতিরিক্ত ভিটামিন বা মিনারেল গ্রহণের বিশেষ উপকার নেই। বরং অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’, আয়রন বা জিংক দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে বিষক্রিয়া বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। এটিকে অস্বাভাবিকভাবে ‘উত্তেজিত’ বা ‘বাড়িয়ে’ তোলার চেয়ে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

'সুপারফুড' বলে কি সত্যিই কিছু আছে?

বর্তমানে বাজারে অনেক খাবারকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে প্রচার করা হয়। যেমন-চিয়া সিড, কালোজিরা, গ্রিন টি, বেরিজাতীয় ফল, আদা, রসুন, হলুদ বা অন্যান্য ভেষজ উপাদান। এগুলোর অনেকগুলোরই পুষ্টিগুণ রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

 

তবে Academy of Nutrition and Dietetics এবং Harvard School of Public Health বলছে, ‘Superfood’ শব্দটি মূলত একটি বিপণন (Marketing) শব্দ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো স্বীকৃত পরিভাষা নয়।

 

অর্থাৎ কোনো একটি খাবারকে এককভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর অলৌকিক উপায় বলা যাবে না। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, মাছ, বাদাম, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন-সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন একই ‘সুপারফুড’ খাওয়ার চেয়ে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনেক বেশি উপকারী।

 

অ্যান্টিবায়োটিক কি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়?

বাংলাদেশসহ অনেক দেশে এখনও অনেকেই মনে করেন, সামান্য সর্দি-কাশি বা জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খেলে দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা।

 

অ্যান্টিবায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে। ভাইরাসজনিত সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অনেক ধরনের জ্বরের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।

 

বরং প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে শরীরের অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়, যেখানে ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় ওষুধ আর কার্যকর নাও হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।

 

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে প্রতিদিনের জীবনে কী কী অভ্যাস গড়ে তুলবেন

চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য কোনো জটিল নিয়মের প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি উপকার করে।

 

প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ বা দই, পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয় ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত রাখতে হবে।

 

একই সঙ্গে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করতে হবে। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা এবং অ্যালকোহল পরিহার বা সীমিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

চিকিৎসকদের মতে, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়াও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরোক্ষভাবে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

 

শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে অভিভাবকদের কী করা উচিত

শিশুদের ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলমান থাকে। তাই জন্মের পর থেকেই সঠিক পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য সর্বোত্তম খাবার। এতে থাকা অ্যান্টিবডি ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক উপাদান শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

 

ছয় মাস পর বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার শুরু করা, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সব টিকা সময়মতো সম্পন্ন করা এবং শিশুকে নিয়মিত বাইরে খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

 

অভিভাবকদের উচিত শিশুদের অপ্রয়োজনীয় জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কমিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করা।

 

বয়স্কদের ক্ষেত্রে কেন বাড়তি সচেতনতা প্রয়োজন

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ইমিউনোসেনেসেন্স (Immunosenescence) বলা হয়।

 

এই কারণে বয়স্করা সাধারণ সংক্রমণেও তুলনামূলকভাবে বেশি অসুস্থ হতে পারেন। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য অসুস্থতাও তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়াও তাদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

 

চিকিৎসকদের চূড়ান্ত পরামর্শ: ইমিউনিটি বাড়ানোর শর্টকাট নেই

WHO, CDC, NIH, Harvard Medical School, Mayo Clinic, Cleveland Clinic এবং NHS-সব প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়-রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কোনো শর্টকাট নেই।

 

কোনো একটি ভিটামিন, একটি ফল, একটি ভেষজ উপাদান বা একটি সাপ্লিমেন্ট একাই শরীরকে সব ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সুস্থ ইমিউন সিস্টেমের মূল ভিত্তি।

 

চিকিৎসকদের মতে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী রাখতে শরীরের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

তারা আরও বলেন, ইমিউনিটি ভালো থাকলেও মানুষ অসুস্থ হতে পারেন। তবে সুস্থ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণের তীব্রতা ও জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

 

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এমন একটি জটিল জৈব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা প্রতিদিন আমাদের অজান্তেই অসংখ্য ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে। এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে কোনো অলৌকিক উপায় নেই; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।

 

সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ ফল-সবজি, স্বাস্থ্যকর চর্বি, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রোবায়োটিক ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান বর্জন এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান-এসবের সমন্বয়ই একটি কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে নষ্টও হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে আরও প্রস্তুত করে। তাই কোনো শর্টকাটের পেছনে না ছুটে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে অভ্যাসে পরিণত করাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।


সম্পর্কিত নিউজ