বাজার থেকে ডিম কিনছেন? মুহূর্তেই বুঝে নিন টাটকা নাকি পচা

বাজার থেকে ডিম কিনছেন? মুহূর্তেই বুঝে নিন টাটকা নাকি পচা
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

ডিম বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর খাবারের অন্যতম। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর কিংবা রাতের খাবার, এমনকি বেকারি ও বিভিন্ন রান্নায়ও ডিমের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকায় প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ডিম দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বাজার থেকে কেনা ডিম কতটা টাটকা, সেটি অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে ডিম দেখতে একেবারেই স্বাভাবিক লাগলেও ভেতরে সেটি পুরোনো কিংবা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

 

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নষ্ট ডিম খাওয়া শুধু খাবারের স্বাদ নষ্ট করে না, এটি খাদ্যবাহিত সংক্রমণ, পেটের সমস্যা, বমি, ডায়রিয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই ডিম কেনা, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের আগে এর সতেজতা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

কেন ডিম দ্রুত নষ্ট হয়

ডিমের খোসা শক্ত হলেও এর ওপর অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে। এই ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলোর মাধ্যমে বাতাস ও আর্দ্রতা ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিমের ভেতরের আর্দ্রতা কমতে থাকে এবং বায়ুথলি বা এয়ার সেল বড় হতে শুরু করে। গরম আবহাওয়ায় এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ঘটে। ফলে ডিমের গুণগত মান কমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সেটি নষ্ট হওয়ার দিকে এগিয়ে যায়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা যত বেশি থাকে, ডিমের ভেতরের রাসায়নিক পরিবর্তন তত দ্রুত ঘটে। এ কারণেই গরমের সময় ডিম সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

 

জলে ভাসানোর পরীক্ষাই কেন সবচেয়ে জনপ্রিয়

ডিম টাটকা কি না তা যাচাই করার সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি হলো ‘ফ্লোট টেস্ট’ বা জলে ভাসানোর পরীক্ষা। একটি গভীর পাত্রে ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি নিয়ে তাতে ডিম ছেড়ে দিলে ডিমের অবস্থান অনেক তথ্য জানিয়ে দেয়। যদি ডিমটি পানির তলায় গিয়ে সম্পূর্ণ আড়াআড়িভাবে শুয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে টাটকা ডিম হিসেবে ধরা হয়।

 

যদি ডিমটি তলায় গিয়ে কিছুটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেটি কিছুদিন পুরোনো হলেও সাধারণত ব্যবহারযোগ্য থাকে। তবে দ্রুত খেয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

আর যদি ডিমটি পানির ওপরে ভেসে ওঠে, তাহলে সেটি ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ এমন ডিমের ভেতরে অনেক বেশি বাতাস জমে গেছে, যা ডিমের পুরোনো বা নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।

 

কেন ভেসে ওঠে পুরোনো ডিম

খাদ্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিমের খোসার ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে ধীরে ধীরে বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে। এর ফলে ডিমের ভেতরের বায়ুথলি ক্রমশ বড় হতে থাকে। টাটকা ডিমের বায়ুথলি ছোট থাকে এবং এর ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেটি সহজে পানির নিচে ডুবে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিমের ওজন তুলনামূলক কমে এবং বাতাসের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তখন ডিম পানিতে ভেসে ওঠে।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন যে ভাসমান ডিম সব সময় শতভাগ নষ্ট হয় না। কিন্তু এমন ডিম ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ভেঙে গন্ধ ও অবস্থা পরীক্ষা করা উচিত।

 

ডিম ভাঙার পর কীভাবে বুঝবেন

ডিমের সতেজতা যাচাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ডিম ভাঙার পর তার গঠন পর্যবেক্ষণ করা। টাটকা ডিমের সাদা অংশ সাধারণত ঘন, আঠালো এবং কুসুমের চারপাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করে। কুসুম থাকে উঁচু, গোলাকার এবং শক্ত।অন্যদিকে পুরোনো ডিমের সাদা অংশ পাতলা হয়ে যায় এবং অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কুসুমও তুলনামূলকভাবে চ্যাপ্টা হয়ে যেতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো ডিমের বয়স সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং ডিম কতটা টাটকা তা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক।

 

দুর্গন্ধই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা

ডিম নষ্ট হয়েছে কি না তা বোঝার সবচেয়ে সহজ এবং নির্ভরযোগ্য উপায় হলো গন্ধ। যদি ডিম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে পচা, সালফার বা তীব্র দুর্গন্ধ বের হয়, তাহলে সেটি কখনোই খাওয়া উচিত নয়। কারণ এটি ডিমের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বা পচন শুরু হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

 

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্গন্ধযুক্ত ডিম অবিলম্বে ফেলে দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

 

ডিমের খোসা দেখেও কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়

ডিম কেনার সময় খোসার অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব ডিমে ফাটল রয়েছে, খোসা অতিরিক্ত ময়লা, আঠালো বা অস্বাভাবিক দেখায়, সেগুলো না কেনাই ভালো। ফাটলযুক্ত ডিমের মাধ্যমে সহজেই জীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। যদি খোসা অস্বাভাবিকভাবে পিচ্ছিল বা আঠালো লাগে, তাহলে সেটি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির ইঙ্গিত হতে পারে।

 

ডিমের রঙ কি মানের পার্থক্য করে

অনেকেই মনে করেন সাদা ডিম ও বাদামি ডিমের মধ্যে পুষ্টিগত পার্থক্য রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিমের রঙ মূলত মুরগির জাতের ওপর নির্ভর করে। সাদা ডিম এবং বাদামি ডিমের পুষ্টিগুণ প্রায় একই। ডিমের রঙ নয়, বরং সতেজতা এবং সংরক্ষণের পদ্ধতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

ডিমের পুষ্টিগুণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ডিমকে ‘প্রকৃতির সম্পূর্ণ খাবার’ বলেও উল্লেখ করা হয়। একটি ডিমে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, ফোলেট, সেলেনিয়াম, কোলিন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্কদের জন্য ডিম একটি অত্যন্ত উপকারী খাদ্য।

 

মস্তিষ্কের বিকাশ, পেশি গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ডিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

গরমকালে কেন বাড়ে ঝুঁকি

উচ্চ তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি দ্রুততর করে। বিশেষ করে গরম এবং আর্দ্র পরিবেশে ডিমের গুণগত মান দ্রুত কমতে পারে। যদি ডিম দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রাখা হয়, তাহলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাজার থেকে কেনার পর দ্রুত ফ্রিজে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে ডিম কেনার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

 

সালমোনেলা সংক্রমণের ঝুঁকি

ডিমের সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি হলো সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া। সালমোনেলা সংক্রমণে ডায়রিয়া, পেটব্যথা, বমি, জ্বর এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, ভালোভাবে সিদ্ধ বা রান্না করা ডিম খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

 

আধা সিদ্ধ ডিম কতটা নিরাপদ

অনেকে হাফ বয়েল বা নরম কুসুমযুক্ত ডিম পছন্দ করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, গর্ভবতী নারী, ছোট শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সিদ্ধ ডিম খাওয়াই নিরাপদ। কারণ অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা ডিমে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে।

 

ডিম সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম সবসময় ফ্রিজে রাখা উচিত। ডিমকে মূল কার্টনের ভেতর সংরক্ষণ করলে বাইরের গন্ধ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনও কম হয়। অনেকেই ফ্রিজের দরজায় ডিম রাখেন। কিন্তু বারবার দরজা খোলা ও বন্ধ করার কারণে তাপমাত্রা ওঠানামা করে। তাই ফ্রিজের ভেতরের স্থির তাপমাত্রার অংশে ডিম রাখা ভালো।

 

ডিম ধুয়ে রাখা উচিত কি না

অনেকে বাজার থেকে এনে সব ডিম ধুয়ে ফ্রিজে রেখে দেন। খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহার করার ঠিক আগে ডিম ধোয়া ভালো। আগে ধুয়ে রাখলে খোসার প্রাকৃতিক সুরক্ষামূলক স্তর নষ্ট হতে পারে এবং জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

 

তাই ব্যবহার করার আগে প্রয়োজন হলে ডিম পরিষ্কার করা সবচেয়ে নিরাপদ।

 

কতদিন পর্যন্ত ডিম ভালো থাকে

ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হলে ডিম সাধারণত কয়েক সপ্তাহ ভালো থাকতে পারে। তবে সময় যত বাড়ে, ডিমের গুণগত মান ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা যতটা সম্ভব টাটকা ডিম ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। জলে ভাসানোর পরীক্ষা, গন্ধ এবং ডিমের গঠন পর্যবেক্ষণ করে ব্যবহারের আগে ডিমের অবস্থা যাচাই করা উচিত।

 

বাজার থেকে ডিম কেনার সময় কী খেয়াল রাখবেন

ডিম কেনার সময় পরিষ্কার ও অক্ষত খোসা রয়েছে কি না তা দেখতে হবে। ফাটলযুক্ত, অতিরিক্ত ময়লাযুক্ত বা অস্বাভাবিক গন্ধযুক্ত ডিম কেনা উচিত নয়। বিশ্বস্ত দোকান বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ডিম কেনা নিরাপদ। গরমের সময় দীর্ঘক্ষণ রোদে রাখা ডিম না কেনাই ভালো।

 

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

পুষ্টিবিদ ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং নিরাপদ একটি খাদ্য। তবে এটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলে ভাসানোর পরীক্ষা, ডিমের গন্ধ, কুসুম ও সাদা অংশের গঠন এবং খোসার অবস্থা দেখে সহজেই ডিমের সতেজতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, টাটকা ডিম শুধু স্বাদেই ভালো নয়, এটি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমায়। তাই গরমের এই সময়ে ডিম কেনা, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য সচেতনতাই আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে খাদ্যবাহিত নানা রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

 

সবশেষে বলা যায়, ডিম প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর সতেজতা নিশ্চিত করা সমান জরুরি। কারণ একটি ভালো ডিম যেমন পুষ্টির ভাণ্ডার, তেমনি নষ্ট ডিম স্বাস্থ্যঝুঁকিরও কারণ হতে পারে। তাই কয়েকটি সহজ কৌশল জানা থাকলে বাজার থেকে টাটকা ডিম বেছে নেওয়া এবং নিরাপদভাবে খাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।


সম্পর্কিত নিউজ