কফির সঙ্গে লবণ-ছোট অভ্যাসে বড় প্রভাব, জানুন সত্যটা

কফির সঙ্গে লবণ-ছোট অভ্যাসে বড় প্রভাব, জানুন সত্যটা
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

সকালের এক কাপ কফি বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ দুধ-চিনি দিয়ে কফি পান করেন, কেউ আবার পছন্দ করেন একেবারে ব্ল্যাক কফি। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় নতুন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-কফিতে সামান্য লবণ যোগ করা। অনেকেই দাবি করছেন, এক চিমটি লবণ কফির তিক্ততা কমায়, স্বাদ বাড়ায়, এমনকি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।

কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পুষ্টিবিদদের গবেষণা কী বলছে? কফিতে লবণ মেশানো কি সত্যিই উপকারী, নাকি এটি শুধুই স্বাদের একটি ভিন্ন অভ্যাস?

 

কেন কফিতে লবণ দেওয়া হয়?

খাদ্যবিজ্ঞান অনুযায়ী লবণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি তিক্ত স্বাদকে আংশিকভাবে দমন করতে পারে। কফিতে থাকা কিছু যৌগ তিক্ততা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে অতিরিক্ত রোস্ট করা বা দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করা কফিতে।

 

খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প পরিমাণ লবণ স্বাদের ভারসাম্য তৈরি করে। ফলে কফির তীব্র তিক্ততা কিছুটা কম অনুভূত হয়। অনেক দেশে বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চল, তুরস্ক এবং কিছু মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই কফিতে সামান্য লবণ ব্যবহার করার প্রচলন রয়েছে।

 

তবে লবণ যোগ করার উদ্দেশ্য মূলত স্বাদ পরিবর্তন করা। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিকে স্বাস্থ্যকর পানীয় তৈরির বিশেষ কৌশল হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

 

কফির ভেতরে থাকা উপকারী উপাদান

কফিতে শতাধিক বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ক্যাফেইন। এছাড়া ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কফিতে পাওয়া যায়।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে কফি পান করলে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমতে পারে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। নিয়মিত কিন্তু পরিমিত কফি পান কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কফির স্বাস্থ্য উপকারিতার মূল উৎস কফি নিজেই, লবণ নয়।

 

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে কফির ভূমিকা

গত দুই দশকে কফি ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

 

গবেষণায় গ্লুকোজ ইনটলারেন্স, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কফি পানের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা হয়। যদিও গবেষকরা এটিকে সরাসরি চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে দেখেননি, তবুও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, কফি কখনোই ডায়াবেটিস প্রতিরোধের বিকল্প নয়। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক ব্যায়াম এবং জীবনযাত্রাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

হৃদরোগ ও রক্তচাপ নিয়ে কী বলছে গবেষণা?

দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে কফি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বহু গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

 

হার্ভার্ডের পুষ্টিবিষয়ক গবেষণা বলছে, প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে কফি পান অনেক মানুষের ক্ষেত্রে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় দিনে তিন থেকে পাঁচ কাপ কফির সঙ্গে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।

 

তবে ক্যাফেইন সাময়িকভাবে রক্তচাপ কিছুটা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা ক্যাফেইনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার জন্য রক্তচাপ বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য অধিকাংশ গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

লবণ কি সত্যিই কফিকে স্বাস্থ্যকর করে?

এ প্রশ্নের উত্তর বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের কাছেই স্পষ্ট-না।

 

কফিতে সাধারণত যে পরিমাণ লবণ যোগ করা হয়, তা এতটাই কম যে এটি শরীরে উল্লেখযোগ্য খনিজ সরবরাহ করতে পারে না। অনেকেই মনে করেন লবণ যোগ করলে শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ হয় বা শরীরে পানির ভারসাম্য বাড়ে। এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণ কেবল স্বাদ পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু কফির পুষ্টিগুণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় না।

 

মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে কফির প্রভাব

বহু গবেষণায় কফির সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক খুঁজে দেখা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে পারকিনসন্স রোগ, ডিমেনশিয়া এবং আলঝেইমারের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক থাকতে পারে। ফিনল্যান্ডের একটি গবেষণায় মধ্যবয়সে নিয়মিত কফি পানকারীদের পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে। যদিও গবেষকরা আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

 

ক্যাফেইন মনোযোগ বৃদ্ধি, ক্লান্তি কমানো এবং সাময়িকভাবে মানসিক সতর্কতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে।

 

লিভারের জন্য কি কফি উপকারী?

গবেষণায় কফির সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক সম্পর্কগুলোর একটি পাওয়া গেছে লিভারের সঙ্গে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিস এবং কিছু লিভার রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। কিছু গবেষণায় লিভার এনজাইমের মাত্রাও কম পাওয়া গেছে।

 

কারা লবণযুক্ত কফি এড়িয়ে চলবেন?

যদিও এক চিমটি লবণ অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য বড় কোনো সমস্যা তৈরি করে না, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপের রোগী, হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভোগা মানুষ এবং যাদের সোডিয়াম সীমিত রাখতে বলা হয়েছে, তাদের নিয়মিত লবণযুক্ত কফি পান করা ঠিক নয়।

 

চিকিৎসকরা বলছেন, অনেকেই দিনে কয়েক কাপ কফি পান করেন। প্রতিবার সামান্য লবণ যোগ করলে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

 

যাদের পেটে সমস্যা হয় তাদের কী করা উচিত?

অনেকেই মনে করেন লবণ যোগ করলে কফির অম্লতা কমে এবং পেটের সমস্যা কম হয়। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যারা কফি খাওয়ার পর গ্যাস্ট্রিক, অস্বস্তি বা অম্লতার সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দেন- খালি পেটে কফি না খাওয়া, ক্যাফেইনের পরিমাণ কমানো, কম অ্যাসিডযুক্ত কফি বেছে নেওয়া এবং দৈনিক কফির পরিমাণ সীমিত রাখা।

 

দিনে কত কাপ কফি নিরাপদ?

বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ কাপ কফি সাধারণত নিরাপদ। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের সহনশীলতা ভিন্ন হতে পারে। কারও ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বুক ধড়ফড় করা বা অস্থিরতা দেখা দিলে কফির পরিমাণ কমানো উচিত।

 

গর্ভবতী নারী, কিছু হৃদরোগী এবং বিশেষ ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কফি পান করা উচিত।

 

সবশেষে বলা যায়, কফিতে এক চিমটি লবণ যোগ করা মূলত স্বাদের বিষয়। এটি কফির তিক্ততা কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এর উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকারিতার পক্ষে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। অন্যদিকে পরিমিত পরিমাণে কফি নিজেই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ একটি পানীয়, যা কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

 

তাই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিমিত কফি পান, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং সচেতন জীবনযাপন।


সম্পর্কিত নিউজ