{{ news.section.title }}
শুধু পানি নয়, কিডনির যত্নে ভরসা হতে পারে এই পানীয়গুলোও
মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে কিডনি অন্যতম। শরীরের রক্ত পরিশোধন, অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভিন্ন হরমোন উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গ। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি না পান করা, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাষ্ট্রের National Kidney Foundation (NKF), Mayo Clinic এবং বিভিন্ন নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি সুস্থ রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ধরনের পানীয় কিডনির জন্য সমান উপকারী নয়। কিছু পানীয় কিডনির কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে, আবার কিছু পানীয় দীর্ঘমেয়াদে কিডনির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কিডনির জন্য সবচেয়ে ভালো পানীয় হলো এমন পানীয় যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে, বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না।
লেবু পানি: কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমাতে কার্যকর
কিডনি সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত পানীয়গুলোর মধ্যে একটি হলো লেবু পানি। লেবুতে থাকা সাইট্রেট বা সাইট্রিক অ্যাসিড কিডনিতে ক্যালসিয়াম জমে পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিন এক বা দুই গ্লাস চিনি ছাড়া লেবু পানি পান করলে প্রস্রাবের সাইট্রেটের মাত্রা বাড়ে। ফলে কিডনিতে পাথর তৈরির সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষ করে যাদের আগে কিডনিতে পাথর হয়েছিল, তাদের জন্য লেবু পানি উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত লেবু গ্রহণ পাকস্থলীতে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে, তাই পরিমিত পরিমাণে পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নারকেল পানি: প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইটের উৎস
নারকেল পানি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে পরিচিত। এতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান রয়েছে। গরম আবহাওয়ায় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ইলেক্ট্রোলাইট পুনরুদ্ধারে নারকেল পানি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত পানি গ্রহণে সমস্যা হয় এমন ব্যক্তিদের জন্য নারকেল পানি একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। এটি শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে এবং কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে যাদের কিডনি রোগের কারণে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত নারকেল পানি পান করা উচিত নয়।
জবের পানি: প্রাচীনকাল থেকেই জনপ্রিয়
জব বা বার্লি দিয়ে তৈরি পানি বহু সংস্কৃতিতে কিডনির জন্য উপকারী পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জবে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং খনিজ উপাদান। এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখার পাশাপাশি মূত্রত্যাগের প্রবণতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জবের পানি নিয়মিত পান করলে শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং বিপাকক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। ফলে কিডনির ওপর চাপ কমে।
শসার পানি: প্রাকৃতিক ডিটক্স ড্রিংক
শসায় প্রায় ৯৫ শতাংশ পানি থাকে। এছাড়া এতে রয়েছে ভিটামিন কে, পটাশিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। শসা কেটে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি পান করলে শরীর সতেজ থাকে এবং পানি গ্রহণের পরিমাণও বেড়ে যায়। পুষ্টিবিদদের মতে, পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ কিডনির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। শসার পানি সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করতে পারে।
সাধারণ বিশুদ্ধ পানি: কিডনির সবচেয়ে বড় বন্ধু
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির জন্য সবচেয়ে উপকারী পানীয় এখনো সাধারণ বিশুদ্ধ পানিই। কিডনির প্রধান কাজগুলোর একটি হলো শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া। পর্যাপ্ত পানি না পান করলে এই কাজ ব্যাহত হতে পারে।
National Kidney Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাবের মাধ্যমে ইউরিয়া, টক্সিন এবং অন্যান্য বর্জ্য সহজে বের হয়ে যায়। তবে ঠিক কতটুকু পানি পান করতে হবে, তা বয়স, ওজন, আবহাওয়া, শারীরিক কার্যকলাপ এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
গ্রিন টি: অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ
গ্রিন টি-তে ক্যাটেচিন নামক শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে। কিডনি স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে অতিরিক্ত গ্রিন টি পান না করাই ভালো।
বেরি জাতীয় ফলের স্মুদি
ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি কিংবা ক্র্যানবেরি দিয়ে তৈরি কম চিনিযুক্ত স্মুদি কিডনির জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে ক্র্যানবেরি মূত্রনালির সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এটি সরাসরি কিডনি রোগ প্রতিরোধ করে না, তবে মূত্রনালির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ডালিমের রস
ডালিমে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। গবেষকদের মতে, ডালিমের রস শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং রক্তনালির স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি কিডনির সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কোন পানীয়গুলো কিডনির ক্ষতি করতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কিছু পানীয় নিয়মিত ও অতিরিক্ত পান করলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত কোমল পানীয়, বিশেষ করে চিনি ও ফসফরাসসমৃদ্ধ সফট ড্রিংক দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একইভাবে অতিরিক্ত এনার্জি ড্রিংক, অতিরিক্ত কফি এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ও কিডনির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অতিরিক্ত মিষ্টিযুক্ত পানীয় ও প্রসেসড জুসও কিডনির জন্য ভালো নয়। এসব পানীয় ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়, যা পরবর্তীতে কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।
কিডনি সুস্থ রাখতে আর কী করবেন?
কিডনি ভালো রাখতে শুধু উপকারী পানীয় পান করলেই হবে না। এর সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলা, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা কিডনি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
সতর্কতা
চিকিৎসকরা বলছেন, যাদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD), কিডনি ফেইলিউর, ডায়ালাইসিস চলছে অথবা রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে সব ধরনের পানীয় সমান উপকারী নাও হতে পারে। বিশেষ করে নারকেল পানি, ফলের রস কিংবা কিছু হারবাল ড্রিংক গ্রহণের আগে অবশ্যই নেফ্রোলজিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তরল বা খনিজ গ্রহণ অনেক সময় জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি সুস্থ রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা এবং এমন পানীয় বেছে নেওয়া যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে কিন্তু কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না। লেবু পানি, নারকেল পানি, জবের পানি, শসার পানি, গ্রিন টি ও বিশুদ্ধ পানি-এসব পানীয় সঠিকভাবে গ্রহণ করলে কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।