{{ news.section.title }}
প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ব্যথার ওষুধ খেয়ে কিডনি বিকল, সতর্কতা জরুরি
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া বাংলাদেশে এখন প্রায় দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সামান্য মাথাব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, জ্বর, শরীর ব্যথা কিংবা সর্দি-কাশির মতো সমস্যায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। পাড়ার ফার্মেসিতে গিয়ে সমস্যার কথা বললেই ওষুধ হাতে পাওয়া যায়।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই আপাত সহজ সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল, লিভার অকার্যকর, গ্যাস্ট্রিক জটিলতা, হৃদরোগ এবং ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের মতো ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে।
শরীয়তপুরের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী আরব আলীর জীবন তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। প্রায় এক বছর আগে তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায়। একই সঙ্গে তিনি ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত। বর্তমানে প্রতি মাসে রাজধানীর জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও ইউরোলজি হাসপাতাল এবং বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। চিকিৎসা ও ওষুধ বাবদ মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এই ব্যয় বহন করতে গিয়ে একমাত্র আয়ের উৎস মুদি দোকানটিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে।
গত ১০ জুন জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের সিঁড়িতে বসে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আরব আলী জানান, বহু বছর ধরেই শরীর ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক কিংবা ছোটখাটো শারীরিক সমস্যায় তিনি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেতেন। তার ভাষায়, “অনেক সময় শরীর ব্যথা করত, গ্যাসের সমস্যা দেখা দিলে বাজারে ফার্মেসিতে গিয়ে বললে ওষুধ দিয়ে দিত।”
আরব আলীর মতো অসংখ্য মানুষ দেশে প্রতিদিন প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ কিনে সেবন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের সমস্যা নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সংকট।
উন্নত বিশ্ব যখন নিয়ন্ত্রণে, বাংলাদেশ তখন বিপরীত পথে
বিশ্বের অনেক দেশ ওষুধের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক কিংবা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ অধিকাংশ দেশেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা ভিন্ন।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬২ শতাংশই ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়। অথচ বৈশ্বিক গড় মাত্র ১৫ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও স্বাস্থ্যতথ্য প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় ওষুধ ব্যয়ের হার যুক্তরাজ্যে ৯ শতাংশ, কানাডায় ১০ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় ১৪ শতাংশ। ফ্রান্সে ১৫ শতাংশ, জার্মানি, জাপান ও ইতালিতে ১৭ শতাংশ, স্পেনে ১৮ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০ শতাংশ। এই তুলনামূলক চিত্র স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশে ওষুধনির্ভর চিকিৎসা অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছে গেছে।
কেন বাড়ছে ওষুধের অপব্যবহার?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহজলভ্যতা এবং সচেতনতার অভাবই সবচেয়ে বড় কারণ। দেশের অধিকাংশ ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, ব্যথানাশক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্টেরয়েডও বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক অভ্যাস। অনেকেই মনে করেন, আগে যে ওষুধে উপকার পেয়েছেন, পরবর্তীতেও একই সমস্যায় সেই ওষুধ কাজ করবে। ফলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে সরাসরি ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলেন।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল। অনেক স্থানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তুলনায় ফার্মেসির সংখ্যা বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসার প্রথম ধাপ হিসেবে ফার্মেসিকেই বেছে নেন।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মইনুল খোকন বলেন, “ওষুধ একটা কেমিক্যাল। ফলে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের ভয়াবহতা অনেক বেশি। অনেকে সাধারণ সমস্যায়ও দীর্ঘদিন ধরে মেডিসিন নেয়। অথচ ডায়াবেটিসের মতো রোগ দেখা দিলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ খাওয়া যায়।”
তিনি আরও বলেন, “অপ্রয়োজনীয়ভাবে একটা গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেটও খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত ওষুধের ফলে পেটের অ্যাসিডিটির পিএইচ মেইনটেইন হয় না। এটি পেটের অন্যান্য রোগ ডেকে আনে। কিডনি বিকল ও লিভার অকার্যকরের মতো জটিলতা দেখা দেয়।”
তার মতে, সমস্যা শুধু রোগীর অভ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে জটিলতা, একাধিক রোগের উপস্থিতি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেও ওষুধের ব্যবহার বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, “চিকিৎসা দিতে গিয়ে রোগীর একাধিক রোগের (মাল্টিপল ডিজিজ) জটিলতা থাকলে কিংবা যথাযথ রোগ নির্ণয় করা না গেলে ওষুধের ব্যবহার বেড়ে যায়।”
ডা. খোকন আরও উল্লেখ করেন, ভারতে যেখানে অনেক কার্যকর কম্বিনেশন ওষুধ পাওয়া যায়, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে একই কাজের জন্য একাধিক সিঙ্গেল জেনেরিক ওষুধ দিতে হয়। এতে রোগীর ওষুধের সংখ্যা বাড়ে এবং ডোজ মিস করার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: নতুন বৈশ্বিক হুমকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বহু বছর ধরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। বাংলাদেশে সামান্য সর্দি-কাশি বা জ্বরেও অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় রোগী কয়েকদিন খেয়ে ভালো বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। এতে জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, কারণ প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক তখন আর কাজ করবে না।
দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্য ব্যয়ে বাংলাদেশের অবস্থান
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় আফগানিস্তানে ৮২ ডলার, নেপালে ৬৭ ডলার, ভারতে ৭৪ ডলার, মিয়ানমারে ৭১ ডলার, ভুটানে ১০৪ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ১৫৭ ডলার এবং মালদ্বীপে ১ হাজার ৫৭ ডলার। সেখানে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ৫৮ ডলার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।
রোগের ধরন বদলাচ্ছে, বাড়ছে ওষুধের ব্যবহার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, “আগে যে ধরনের রোগ ছিল, এখন তার ধরন বদলে গেছে। বর্তমানে অসংক্রামক রোগ বেশি, যা ব্যক্তিগত রোগ। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা ও বৈশ্বিক প্রভাবে রোগের ধরন পাল্টে যাওয়ায় রোগী বাড়ছে। ফলে বাজারে নতুন নতুন ওষুধ এসেছে।”
তার মতে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বৃদ্ধির কারণে ওষুধের ব্যবহারও বাড়ছে। তবে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা জরুরি।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় কেন বাড়ছে?
২০১২ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যক্তির নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তখন এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ আরও বেড়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধের ব্যয় নিজের পকেট থেকেই বহন করছেন। ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে জমি বিক্রি করছে, ঋণ নিচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে ফেলছে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। এবারই প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশ অতিক্রম করেছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “ওষুধের ব্যবহার কমাতে হলে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান সরকার সেই পথেই এগোচ্ছে। আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়েছি। তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকেও অপ্রয়োজনে ওষুধের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, ফার্মেসিগুলোর তদারকি বৃদ্ধি, জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সাময়িক আরামের জন্য নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ সেবন অনেক সময় এমন রোগের জন্ম দেয়, যার চিকিৎসা আজীবনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আরব আলীর মতো অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতা সেই সতর্কবার্তাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।