{{ news.section.title }}
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘাড়ে ব্যথা-কেন হয় জানেন?
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘাড়ে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া বা ঘাড় ঘোরাতে অস্বস্তি-এমন সমস্যার মুখোমুখি হন অনেক মানুষ। অনেকের ক্ষেত্রে এটি সাময়িক হলেও কারও কারও জন্য এটি নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। দিনের শুরুতেই ঘাড়ে ব্যথা থাকলে অফিসের কাজ, গাড়ি চালানো, পড়াশোনা কিংবা দৈনন্দিন সাধারণ কাজও বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাড়ব্যথার কারণ শুধু ভুলভাবে ঘুমানো নয়। ঘুমের ভঙ্গি, বালিশের ধরন, মানসিক চাপ, দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহার, মেরুদণ্ডের সমস্যা, এমনকি পানিশূন্যতা বা ঘুমের মানও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘুমানোর ভঙ্গি: সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি
ঘাড়ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো। যারা উপুড় হয়ে ঘুমান, তাদের ঘাড় সাধারণত দীর্ঘ সময় একদিকে ঘোরানো অবস্থায় থাকে। এতে ঘাড়ের পেশি, লিগামেন্ট এবং জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যথা বা শক্তভাব অনুভূত হতে পারে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা চিৎ হয়ে অথবা পাশ ফিরে ঘুমানোর পরামর্শ দেন। এই অবস্থায় ঘাড় ও মেরুদণ্ড তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক অবস্থানে থাকে এবং পেশিতে অপ্রয়োজনীয় চাপ কম পড়ে।
বালিশের উচ্চতা ও ধরন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকেই মনে করেন বেশি বালিশ মানেই বেশি আরাম। বাস্তবে বিষয়টি উল্টোও হতে পারে। খুব বেশি উঁচু বালিশ ব্যবহার করলে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে যায়, ফলে ঘাড়ের স্বাভাবিক বক্রতা নষ্ট হয়। আবার অত্যন্ত নিচু বালিশ মাথাকে পর্যাপ্ত সমর্থন দিতে পারে না। চিকিৎসকদের মতে, এমন বালিশ ব্যবহার করা উচিত যা ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক বজায় রাখে এবং মাথাকে সমানভাবে সমর্থন দেয়। মেমোরি ফোম বা অর্থোপেডিক বালিশ অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ঘাড়ব্যথায় ভুগছেন।
পুরনো বা নষ্ট হয়ে যাওয়া ম্যাট্রেসও হতে পারে কারণ
শুধু বালিশ নয়, বিছানা বা ম্যাট্রেসের অবস্থাও ঘাড়ের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। খুব বেশি নরম বা বসে যাওয়া ম্যাট্রেস মেরুদণ্ডকে সঠিক সমর্থন দিতে পারে না। ফলে পুরো শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ঘাড়ের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ৭ থেকে ১০ বছর ব্যবহারের পর ম্যাট্রেস পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।
মোবাইল ফোন ও ‘টেক্সট নেক’ সমস্যা
বর্তমান সময়ে ঘাড়ব্যথার একটি বড় কারণ হলো দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে অনেক সময় "টেক্সট নেক" বলা হয়। মানুষ যখন ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের মাথার ওজন প্রায় ৪ থেকে ৫ কেজি। কিন্তু মাথা ৪৫-৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত নিচু করলে ঘাড়ের ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে মোবাইল ব্যবহার করলে ঘাড়ের পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সকালে ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙতে পারে।
কম্পিউটারে কাজের ভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ
অফিসকর্মী, ফ্রিল্যান্সার এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘাড়ব্যথার হার বেশি দেখা যায়। কম্পিউটার স্ক্রিন যদি চোখের সমতলে না থাকে বা দীর্ঘ সময় ঝুঁকে বসে কাজ করা হয়, তাহলে ঘাড়ের পেশিতে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হয়। ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা প্রতি ৩০-৪৫ মিনিট পরপর বিরতি নেওয়া এবং ঘাড় ও কাঁধের হালকা স্ট্রেচিং করার পরামর্শ দেন।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগও ঘাড়ব্যথার কারণ হতে পারে
অনেকেই জানেন না, মানসিক চাপ বা স্ট্রেস ঘাড়ব্যথার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। চাপ, উদ্বেগ বা মানসিক অস্থিরতার সময় শরীরের পেশিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে এই টান বেশি দেখা যায়।
ফলে ঘুমানোর সময়ও পেশি পুরোপুরি শিথিল হতে পারে না এবং সকালে ব্যথা অনুভূত হয়।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কী হয়?
ঘুমের সময় শরীর নিজেকে পুনর্গঠন ও মেরামত করে। অনিদ্রা, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণে শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এতে ব্যথার প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুমের মান খারাপ, তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ঘাড় ও পিঠব্যথার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
পানিশূন্যতা ও পেশির সমস্যা
পর্যাপ্ত পানি না পান করলেও পেশি ও জয়েন্টের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। মানবদেহের ডিস্ক ও জয়েন্টগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য পানি প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় পানিশূন্য অবস্থায় থাকলে পেশিতে শক্তভাব এবং ব্যথা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দেন।
মেরুদণ্ডের জটিল রোগের লক্ষণও হতে পারে
কিছু ক্ষেত্রে ঘাড়ব্যথা শুধু পেশির সমস্যা নয়, বরং বড় কোনো শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে-
- সার্ভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস
- হার্নিয়েটেড ডিস্ক
- সার্ভাইক্যাল ডিস্ক ডিজিজ
- স্পাইনাল স্টেনোসিস
- স্নায়ু চাপে পড়া (Pinched Nerve)
এসব সমস্যার ক্ষেত্রে শুধু ঘাড়ব্যথা নয়, কাঁধ, হাত বা আঙুলেও ব্যথা, ঝিনঝিনি, অসাড়তা বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
ঘাড়ব্যথা কমাতে ঘরোয়া কিছু কার্যকর উপায়
সকালের ঘাড়ব্যথা কমানোর জন্য কিছু সহজ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। ঘুম থেকে উঠে হালকা স্ট্রেচিং করা উপকারী হতে পারে। কাঁধ ধীরে ধীরে ঘোরানো, ঘাড় আস্তে আস্তে ডানে-বামে নাড়ানো এবং হালকা ব্যায়াম পেশিকে শিথিল করতে সাহায্য করে। গরম সেঁকও অনেক ক্ষেত্রে উপকারী। গরম পানির ব্যাগ বা উষ্ণ তোয়ালে ঘাড়ে কয়েক মিনিট ধরে রাখলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং ব্যথা কমতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
সাধারণ ঘাড়ব্যথা কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যেমন-
- ব্যথা দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে
- হাত বা কাঁধে ব্যথা ছড়িয়ে পড়লে
- হাত-পায়ে অসাড়তা বা ঝিনঝিনি অনুভূত হলে
- মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানোর সমস্যা হলে
- জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে গেলে
- দুর্ঘটনা বা আঘাতের পর ব্যথা শুরু হলে
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো সমাধান
চিকিৎসকদের মতে, সকালে ঘাড়ব্যথা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। সঠিক ভঙ্গিতে বসা, দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার না করা, উপযুক্ত বালিশ নির্বাচন, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঘাড়ব্যথার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
অনেক সময় সমস্যাটি ছোট মনে হলেও দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তা মেরুদণ্ড ও স্নায়বিক জটিলতার দিকে যেতে পারে। তাই ঘন ঘন ঘাড়ব্যথা হলে শুধু ব্যথানাশক খেয়ে বসে না থেকে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সিদ্ধান্ত।