বর্ষায় কোন ফলগুলো খেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি?

বর্ষায় কোন ফলগুলো খেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি?
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

বর্ষাকাল মানেই প্রকৃতির নতুন রূপ, স্বস্তির বৃষ্টি আর পছন্দের নানা খাবারের আয়োজন। তবে এই মৌসুম যতটা আনন্দের, স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে ততটাই সংবেদনশীল। বিশেষ করে খাবার ও সবজি ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতাও ডেকে আনতে পারে ডায়রিয়া, ফুড পয়জনিং, পেটের সংক্রমণ, টাইফয়েড কিংবা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি, জমে থাকা পানি, মাটির আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও বিভিন্ন ক্ষতিকর অণুজীব দ্রুত বংশবিস্তার করে। এর প্রভাব পড়ে বাজারের সবজি, ফলমূল ও খাবারের ওপর। ফলে সারা বছর নিরাপদ হিসেবে পরিচিত কিছু সবজিও বর্ষাকালে বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

খাদ্য নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও স্বাস্থ্য নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বর্ষাকালে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে অপরিষ্কার সবজি, কাঁচা সালাদ, দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা খাদ্য মানুষের পরিপাকতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

কেন বর্ষায় বাড়ে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি

বর্ষার সময় বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে যায়। এই আর্দ্র পরিবেশ ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণুর বৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি, জলাবদ্ধতা এবং মাটির আর্দ্রতা বাড়ার কারণে কৃষিজমিতেও বিভিন্ন জীবাণু ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে মানুষের হজমশক্তিও তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে যেসব খাবার সহজে হজম হয় না কিংবা যেগুলোতে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, সেগুলো শরীরে দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

পাতাযুক্ত সবজি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

পালং শাক, লাল শাক, মেথি শাক, লেটুস, পুঁইশাক কিংবা অন্যান্য পাতাযুক্ত সবজি বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি সতর্কতার সঙ্গে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বৃষ্টির কারণে মাটি থেকে বিভিন্ন জীবাণু, কাদা এবং ক্ষুদ্র পোকামাকড় সহজেই এসব পাতার সঙ্গে লেগে থাকে। অনেক সময় পাতার ভাঁজের মধ্যে ক্ষতিকর অণুজীব জমে থাকে, যা সাধারণভাবে ধুলেও পুরোপুরি দূর হয় না।

 

অনেকেই সালাদ হিসেবে কাঁচা লেটুস বা শাকজাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন। কিন্তু বর্ষাকালে কাঁচা অবস্থায় এসব খাবার গ্রহণ করলে পেটের সংক্রমণ ও খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করে খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

 

ফুলকপি ও ব্রোকলির ভাঁজে লুকিয়ে থাকতে পারে জীবাণু

ফুলকপি ও ব্রোকলির জটিল গঠন এবং ছোট ছোট ভাঁজের মধ্যে সহজেই পানি, ময়লা, পোকামাকড় এবং জীবাণু আটকে যায়। বর্ষাকালে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সবজির ভেতরের অংশে অনেক সময় ছোট পোকা বা ডিম থেকে যেতে পারে, যা সাধারণ ধোয়ার মাধ্যমে পুরোপুরি দূর করা কঠিন। রান্নার আগে লবণ বা ভিনেগার মিশ্রিত পানিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

 

অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা ফুলকপি বা ব্রোকলি পেটের সমস্যা, গ্যাস ও অস্বস্তির কারণও হতে পারে।

 

বেগুনে বাড়ে পোকামাকড়ের আক্রমণ

বর্ষাকালে বেগুনে পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক বেশি দেখা যায়। অনেক সময় বাইরে থেকে ভালো দেখালেও ভেতরে পোকা বা পচন থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, বেগুন কেনার সময় অতিরিক্ত নরম, দাগযুক্ত বা ছিদ্রযুক্ত বেগুন এড়িয়ে চলতে হবে। রান্নার আগে কেটে ভেতরের অংশ পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।

 

বেগুন দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ না করে দ্রুত রান্না করে খাওয়াই ভালো।

 

বাঁধাকপির পাতার ভেতরেও থাকতে পারে ঝুঁকি

বাঁধাকপির পাতা একটির ওপর আরেকটি স্তরে সাজানো থাকে। ফলে ভেতরে সহজেই ময়লা, ছোট পোকা কিংবা জীবাণু লুকিয়ে থাকতে পারে। বর্ষাকালে আর্দ্র পরিবেশে এসব জীবাণু আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই বাইরের কয়েকটি পাতা ফেলে দিয়ে ভেতরের অংশ আলাদা করে ধোয়ার পর রান্না করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

 

মাশরুমে ছত্রাকের ঝুঁকি বেশি

মাশরুম এমনিতেই আর্দ্র পরিবেশে জন্মায়। বর্ষাকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এটি দ্রুত নষ্ট হতে পারে। ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে মাশরুমে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। তাই বাজার থেকে কেনার সময় সতেজ মাশরুম বেছে নিতে হবে এবং দীর্ঘদিন ফ্রিজে সংরক্ষণ না করে দ্রুত রান্না করে খেয়ে ফেলতে হবে।

 

মূলজাতীয় সবজিতেও প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা

গাজর, মূলা, বিট, শালগমসহ বিভিন্ন মূলজাতীয় সবজি মাটির নিচে জন্মায়। বর্ষাকালে মাটির আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় এসব সবজির গায়ে মাটি ও জীবাণুর পরিমাণও বেশি থাকতে পারে। এসব সবজি রান্নার আগে ব্রাশ বা হাত দিয়ে ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে খোসা ছাড়িয়ে রান্না করাও নিরাপদ হতে পারে।

 

ধনেপাতা ও পুদিনাপাতা কাঁচা খাওয়ার আগে সতর্কতা

ধনেপাতা, পুদিনাপাতা বা অন্যান্য সুগন্ধি পাতা অনেকেই সরাসরি কাঁচা খেয়ে থাকেন। তবে বর্ষাকালে এসব পাতায় পরজীবী, ব্যাকটেরিয়া বা মাটির জীবাণু থাকার ঝুঁকি বাড়ে। পরিষ্কার পানিতে কয়েকবার ধোয়ার পর প্রয়োজনে লবণ পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে ব্যবহার করলে ঝুঁকি কমে।

 

শুধু সবজি নয়, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতাও জরুরি

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে শুধু ভালো সবজি কিনলেই হবে না, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতাও নিশ্চিত করতে হবে। অপরিষ্কার ফ্রিজ, ভেজা রান্নাঘর, অপরিষ্কার কাটিং বোর্ড কিংবা নোংরা বাসনপত্র থেকেও জীবাণু ছড়াতে পারে। রান্নার আগে ও পরে হাত ধোয়া, রান্নাঘর শুকনো রাখা এবং বাসনপত্র পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ফ্রিজে দীর্ঘদিন রাখা সবজি কতটা নিরাপদ

অনেকেই একসঙ্গে বেশি সবজি কিনে দীর্ঘদিন ফ্রিজে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু বর্ষাকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ফ্রিজে রাখা সবজিও দ্রুত নষ্ট হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প অল্প করে তাজা সবজি কেনা ভালো। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত সবজি ব্যবহার না করে দ্রুত রান্না করে খাওয়াই নিরাপদ। ফ্রিজও নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।

 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী খাবেন

বর্ষাকালে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ খাবার এড়িয়ে চললেই হবে না, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী রাখতে হবে। আদা, রসুন, হলুদ, তুলসী, লেবু, ডাল, গরম স্যুপ, খিচুড়ি এবং সহজপাচ্য খাবার এ সময় উপকারী হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

রাস্তার কাটা ফল ও কাঁচা সালাদে বাড়তি ঝুঁকি

বর্ষাকালে রাস্তার পাশে বিক্রি হওয়া কাটা ফল, কাঁচা সালাদ কিংবা দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রাখা খাবার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। বৃষ্টির পানি, মাছি, ধুলাবালি এবং অপরিষ্কার পানি এসব খাবারে জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

পুষ্টিবিদদের মতে, বর্ষাকালে শাকসবজি খাওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং কোন সবজি কীভাবে পরিষ্কার করতে হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং কতটা ভালোভাবে রান্না করতে হবে-সেই বিষয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

সবুজ শাক, ফুলকপি, ব্রোকলি, বেগুন, বাঁধাকপি কিংবা মাশরুম-সবই পুষ্টিকর খাবার। তবে বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়ায় এসব সবজি জীবাণু ও ছত্রাকের সংস্পর্শে দ্রুত দূষিত হতে পারে। তাই সঠিক উপায়ে ধোয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার, পর্যাপ্ত তাপে রান্না এবং পরিষ্কার পরিবেশে খাবার প্রস্তুত করার অভ্যাসই বর্ষাকালে সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কী খাচ্ছেন তার পাশাপাশি কীভাবে খাচ্ছেন, কোথা থেকে কিনছেন এবং কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রস্তুত করছেন-এই তিনটি বিষয়ই বর্ষাকালে সুস্থ থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


সম্পর্কিত নিউজ